• শুক্রবার, ১২ এপ্রিল ২০২৪, ০৫:২৮ অপরাহ্ন
সর্বশেষ
স্বাস্থ্যসেবায় অভূতপূর্ব অর্জন বাংলাদেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করেছে: রাষ্ট্রপতি শান্তি আলোচনায় কেএনএফকে বিশ্বাস করেছিলাম, তারা ষড়যন্ত্র করেছে: সেনাপ্রধান বন কর্মকর্তার খুনিদের সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিতে কাজ করছে মন্ত্রণালয়: পরিবেশমন্ত্রী পুরান ঢাকার রাসায়নিক গুদাম: ১৪ বছর ধরে সরানোর অপেক্ষা ভাসানটেক বস্তিতে ফায়ার হাইড্রেন্ট স্থাপন করা হবে : মেয়র আতিক রুমা উপজেলা সোনালী ব্যাংকের অপহৃত ম্যানেজার উদ্ধারের পর পরিবার কাছে হস্তান্তর সন্ত্রাসী দল কর্মকান্ড পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বান্দরবানে চলছে জমজমাট নাইট মিনিবার স্বাধীনতা কাপ ফুটবল টুর্নামেন্ট-২৪ সরকারের বাস্তবমুখী পদক্ষেপে শিশু ও মাতৃমৃত্যুর হার কমেছে: প্রধানমন্ত্রী বান্দরবানে সোনালী ব্যাংকে লুটের ঘটনা খতিয়ে দেখা হচ্ছে

ডিএনএ প্রতিবেদন আদালতে ধর্ষণের স্বীকারোক্তির পরও সন্তানের জৈবিক পিতা নিয়ে প্রশ্ন

Reporter Name / ৫৮ Time View
Update : বৃহস্পতিবার, ৪ আগস্ট, ২০২২

নিজস্ব প্রতিবেদক :
কুমিল্লার একটি মামলায় ধর্ষণের শিকার কিশোরীকে (১৬) ধর্ষণের কথা আদালতে স্বীকার করেন অভিযুক্ত এক তরুণ (২১)। সেই অনুযায়ী জেলও খাটছেন তিনি। বিচারিক আদালতে চলছে মামলা। সেখানে জামিন চেয়ে ব্যর্থ হয়ে হাইকোর্টে জামিন আবেদন করেন অভিযুক্ত তরুণ। সেখানে শর্ত জুড়ে দেওয়া হয় জামিনের জন্য ধর্ষণের শিকার কিশোরীকে প্রয়োজনে বিয়ে করবেন তিনি।

২০২১ সালের ১২ ডিসেম্বর হাইকোর্টের বিচারপতি মো. রেজাউল হক ও বিচারপতি মো. বদরুজ্জামানের সমন্বয়ে গঠিত বেঞ্চ এ বিষয়ে রুল জারিসহ আদেশ দেন।

এরই আলাকে ওই তরুণের তদবিরকারকরা ধর্ষণের শিকার কিশোরীর সঙ্গে বিয়ের শর্তে ওই তরুণের জামিন নিতেও রাজি হন। কিন্তু এরপর আবার বেঁকে বসেন ধর্ষণে অভিযুক্ত তরুণ। তরুণীর গর্ভের সন্তানকে তিনি নিজের বলে মেনে নিতে রাজি হননি। আর বিয়েও হয়নি তাদের। এদিকে ধর্ষণের শিকার কিশোরী এক পুত্রসন্তানের জন্ম দেয়।

কিন্তু সন্তানের পিতৃপরিচয় নিশ্চিত হওয়ার জন্য ধর্ষণে অভিযুক্ত তরুণের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে করা হয় ডিএনএ টেস্ট।

ডিএনএ টেস্টের প্রতিবেদন আদালতে জমা দিয়েছে সিআইডি। সেখানে নিশ্চিতভাবে প্রমাণিত হয় যে ধর্ষণের দায় স্বীকারকারী ওই তরুণ ধর্ষণের শিকার কিশোরীর পুত্রসন্তানের জৈবিক পিতা নন। এখন প্রশ্ন হচ্ছে সেই শিশুর জৈবিক পিতা কে?

গত ২৬ জুলাই হাইকোর্টে ডিএনএ টেস্টের ফলাফল তুলে ধরে ওই তরুণের পক্ষে জামিন আবেদন করা হয়। হাইকোর্ট শিশুর পিতৃপরিচয় সম্পর্কে নিশ্চিত হতে ওই কিশোরীর সঙ্গে কথা বলতে সংশ্লিষ্ট আদালতের ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেলকে (মৌখিক) নির্দেশ দেন।

বৃহস্পতিবার (৪ আগস্ট) এ বিষয়ে আদেশের জন্য দিন ধার্য করেছিলেন হাইকোর্ট। কিন্তু নির্ধারিত দিনে এ মামলার শুনানি হয়নি। আগামী রোববার (৭ আগস্ট) শুনানি হতে পারে বলে উচ্চ আদালত সূত্রে জানা গেছে।

আদালত সূত্রে জানা গেছে, সেই সন্তান জন্মের পরে এ ঘটনায় অভিযুক্ত তরুণ ধর্ষণের বিষয়টি স্বীকার করে কুমিল্লার সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন। পরবর্তীসময়ে ওই যুবক কিশোরীকে বিয়ের ইচ্ছা পোষণ করে হাইকোর্টে জামিন আবেদন করলে, আদালত জামিন প্রশ্নে রুল জারির পাশাপাশি কুমিল্লা জেল কর্তৃপক্ষকে কারাগারে বিয়ের ব্যবস্থা করতে নির্দেশ দেন। পরে কিশোরীর অসংলগ্ন কথাবার্তা ও তার পরিবারের লোকজনের সঙ্গে মতপার্থক্য দেখা দিলে তরুণ বিয়ে করতে অস্বীকৃতি জানান। ফলে ওই কিশোরীর সঙ্গে সেই তরুণের বিয়ে হয়নি।

এরপর কিশোরীর গর্ভজাত সন্তানের পিতৃত্ব অস্বীকার করে ডিএনএ টেস্টের আবেদন করেন ওই তরুণ। আদালত আবেদন মঞ্জুর করে সিআইডির ফরেনসিক বিভাগকে ডিএনএ টেস্ট করে রিপোর্ট দাখিলের নির্দেশ দেন। পরবর্তীসময়ে আদালতে দাখিল করা সিআইডির ডিএনএ টেস্টের রিপোর্টে দেখা যায়, তরুণের সঙ্গে শিশুটির ডিএনএ টেস্টের ফলাফলে মিল নেই।

এরপর গত ২৬ জুলাই হাইকোর্টে ডিএনএ টেস্টের ফলাফল তুলে ধরে যুবকের পক্ষে জামিন আবেদন করা হয়। হাইকোর্ট শিশুর পির্তৃপরিচয় সম্পর্কে নিশ্চিত হতে ওই কিশোরীর সঙ্গে কথা বলতে সংশ্লিষ্ট আদালতের ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেলকে (মৌখিক) নির্দেশ দেন।

গত ২৮ জুলাই হাইকোর্টের বিচারপতি মো. রেজাউল হক ও বিচারপতি মোহাম্মদ আলীর সমন্বয়ে গঠিত বেঞ্চ এ আদেশ দেন। আদালতে ওই তরুণের পক্ষে শুনানি করেন আইনজীবী অ্যাডভোকেট মো. একরামুল হক বাকি ও রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল সাইফুদ্দিন খালেদ।

সেই আদেশের বিষয়টি নিশ্চিত করে সংশ্লিষ্ট কোর্টের রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল সাইফুদ্দিন খালেদ বলেন, ‘কুমিল্লার দেবিদ্বার উপজেলার বিনাইপাড় গ্রামের এক যুবকের বিরুদ্ধে এক কিশোরীকে ধর্ষণের অভিযোগ ওঠে। ওই ঘটনার পর কিশোরী গর্ভবতী হয়ে পড়ে এবং পরবর্তীসময়ে একটি পুত্রসন্তানের জন্ম দেয়। পরে তারা দুজনই আদালতে নিজেদের মধ্যে শারীরিক সম্পর্কের কথা স্বীকার করে জবানবন্দি দিয়েছে।

তবে ওই যুবকের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে শিশুর ডিএনএ টেস্ট করা হয়। ডিএনএ টেস্টের ফলাফলে দেখা যায়, ওই ধর্ষণের অভিযোগে গ্রেফতার তরুণের সঙ্গে ওই শিশুর ডিএনএ মিলছে না। এখন ওই কিশোরীর সঙ্গে আমাকে কথা বলতে বলেছেন আদালত। আমি মামলার তদন্ত কর্মকর্তার মাধ্যমে ওই কিশোরীকে ডেকে বিষয়টি বিস্তারিত জেনে আদালতকে জানাব।’

এ বিষয়ে অভিযুক্ত তরুণের পক্ষের আইনজীবী মো. একরামুল হক বাকি বলেন, ‘ধর্ষণের অভিযোগ যার বিরুদ্ধে সেই যুবক দরিদ্র ঘরের ছেলে, পেশায় ফল বিক্রেতা। ছেলেটি পুলিশ হেফাজতে ছিল। সেখান থেকে আদালতে পাঠানো হলে ধর্ষণের কথা স্বীকার করে ওই যুবক আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি (ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায়) দেয়। আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবাববন্দিতে ওই যুবক দু’বার ধর্ষণের কথা স্বীকার করলেও কিশোরী মেয়েটি নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের ২২ ধারায় একবার ধর্ষিত হওয়া কথা আদালতকে জানিয়েছে।

এ বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদে মেয়েটি অসংলগ্ন কথাবার্তা বলেছে। এ কারণে অভিযুক্ত তরুণ কিশোরীকে প্রথমে বিয়ে করতে রাজি হলেও পরে বিয়েতে অস্বীকৃতি জানায়। তিনি বলেন, ওই সন্তান আমার না। পাশাপাশি নবজাতক শিশুর পিতৃপরিচয় নির্ধারণে ডিএনএ টেস্টের আবেদন করেন বিচারিক আদালতে। এরপর আদালতের নির্দেশে ডিএনএ টেস্ট করা হয়। টেস্টের ফলাফলে দেখা যায়, ওই যুবক শিশুটির জৈবিক পিতা নন।

ধর্ষণের অভিযোগে আসা এমন মামলা নিয়ে মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড পিস ফর বাংলাদেশের (এইচপিবিআর) চেয়ারম্যান ও সিনিয়র আইনজীবী অ্যাডভোকেট মনজিল মোরসেদ বলেন, আমাদের দেশে ধর্ষণের ঘটনায় যতো মামলা হচ্ছে এ বিষয়ে সাবেক আইনমন্ত্রীসহ আরও অনেকে বহুবার বলেছেন, এসবের বেশির ভাগই বানোয়াট মামলা। অর্থাৎ হয়রানির জন্য করা হয় ধর্ষণের মামলা। বিভিন্ন অজুহাত আছে, কেউ বলে যে আমার সাথে ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে কিন্তু তার কোনো প্রমাণ নেই। তারপরও মামলাটি করার কারণে কিন্তু তার হ্যারাসমেন্ট হয়ে গেলো।

এরকম মামলা হয়। আবার কেউ যদি মিথ্যা মামলা করে তার প্রতিকারও আছে। সেটা হলো কেউ যদি এরকম মিথ্যা মামলা করে তার বিরুদ্ধে আইনেই ব্যবস্থা গ্রহণের কথা বলা আছে। আইন অনুযায়ী তার বিরুদ্ধে মামলা হবে। এই স্থানে তদন্তকারী কর্মকর্তার একটি দায়দায়িত্ব আছে খুঁজে বের করার। আবার অনেক সময় যখন ধর্ষণের মিথ্যা মামলা হয়, সেই জায়গাগুলোয় আদালতেরও দেখার বিষয় আছে।

মামলার বিবরণে জানা যায়, কুমিল্লার দেবিদ্বার উপজেলার বিনাইপাড় গ্রামের ২০২১ সালের ২ জুলাই রাত আনুমানিক ১১টার দিকে ১৬ বছর বয়সী কিশোরী একই বাড়ির পাশাপাশি ঘরে অভিযুক্ত যুবকের সন্তানসম্ভবা বোনকে দেখভাল করার জন্য রাতযাপন করেন। সেই সুযোগে ওই যুবক কৌশলে বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে কিশোরীকে ধর্ষণ করেন। পরবর্তীসময়ে বিষয়টি না জানানোর জন্য ভয়ভীতি ও হুমকির কারণে সে কাউকে কিছু জানায়নি। এর পরবর্তীসময়ও সেই কিশোরীকে তার ইচ্ছার বিরুদ্ধে জোরপূর্বক ধর্ষণ করে ওই যুবক।

তারপর কিশোরী অসুস্থ হয়ে পড়লে বিষয়টি তার পরিবারকে জানায়। তখন দেখা যায় কিশোরী তিন মাসের অন্তঃসত্ত্বা। এরপর কিশোরীর মা বাদী হয়ে ২০২১ সালের ৪ অক্টোবর দেবিদ্বার থানায় মামলা করেন। মামলায় একমাত্র আসামি করা হয় ওই যুবককে। মামলা করার পর দিবাগত ভোর রাতেই অভিযুক্ত যুবককে গ্রেফতার করা হয়। এরপর ১৬৪ ধারায় কুমিল্লার সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে ধর্ষণের কথা স্বীকার করে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি পেশ করে ওই যুবক।

১৬৪ ধারায় জবানবন্দিতে যুবক বলেন, ‘কিশোরীর (প্রকৃত নাম উহ্য রাখা হয়েছে) মা আমাদের প্রতিবেশী। তাকে খালা ডাকি। তার মেয়ের নাম…। আমার বোনের বাচ্চা হয়েছে। এরপর আমার বোনের বাচ্চার দেখাশোনার জন্য আমাদের বাড়িতে ওই কিশোরী মাঝে মধ্যে এসে থাকতো। চার-পাঁচ মাস আগে ওই কিশোরী রাত ১১টার দিকে আমার ঘরে আসে। আমি নিচে বিছানা পেতে শুয়েছিলাম। ওইদিন রাতে কিশোরীর সম্মতিক্রমেই তার সঙ্গে আমার শারীরিক সম্পর্ক হয়। আমার ছোট বোনও একই ঘরে ঘুমাচ্ছিল। সে কিছু টের পায়নি। এরপর আবার আরেক দিন রাতে তার সাথে শারীরিক সম্পর্ক হয়। এ দুবারই। আর হয়নি। এখন কিশোরীর মা মামলা করেছেন, টাকা চাচ্ছেন। এত টাকা দেওয়ার সামর্থ্য আমার নাই।’

ওইদিন একই আদালতে বিকেল সোয়া ৪টায় নারী ও শিশু নির্যাতন দমনের আইনের ২২ ধারায় জবানবন্দি দেয় ওই কিশোরী। কিশোরী তার জবানবন্দিতে বলে, ‘যুবকের (প্রকৃত নাম উহ্য রাখা হলো) বোনের বাচ্চা হওয়ায় আমি তার দেখাশোনার জন্য তাদের বাড়িতে থাকতাম। তাদের দুইটা ঘর। একটা ঘরে যুবকের বোন ও বোনজামাই থাকতো। আরেকটা ঘরে যুবকের আরেক বোনের সাথে আমি খাটে ঘুমাতাম। যুবক ওই ঘরেই মাটিতে ঘুমাতো। চার-পাঁচ মাস আগে যুবকের বোন আর আমি ঘুমিয়েছিলাম। একপর্যায়ে ওই যুবক আমার মুখ চেপে ধরে জোর করে খারাপ কাজ করে। একবারই করে। আর করে নাই। আমাকে বলে কাউকে বললে মেরে ফেলবে। মেরে নদীতে ভাসিয়ে দেবে। তাই কাউকে কিছু বলি নাই।’

ওই মামলার তদন্ত কর্মকর্তা (আইও) বার বার সময় নিলেও এখনো প্রতিবেদন দাখিল করেননি। এ বিষয়ে তদন্ত কর্মকর্তা পুলিশের উপপরিদর্শক (এসআই) মো. নাজমুল হাসান বলেন, ‘এখনো মামলার তদন্ত রিপোর্ট দাখিল করা হয়নি। অভিযুক্ত যুবক কিশোরীকে বিয়ে করার আগ্রহ প্রকাশ করেছিল। কিশোরী ও তার পরিবার বিয়েতে রাজি হলেও পরবর্তীসময়ে সে বিয়ে আর হয়নি। কিশোরীর গর্ভ থেকে ভূমিষ্ঠ শিশু বর্তমানে কিশোরীর কাছেই আছে।’


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category