• রবিবার, ১৪ জুলাই ২০২৪, ০৪:৫২ পূর্বাহ্ন
  • ই-পেপার
সর্বশেষ
যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়নে কমলেও নতুন বাজারে পোশাক রপ্তানি বাড়ছে স্বাধীনতাবিরোধীরা কোটা সংস্কার আন্দোলনের নামে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত: আইনমন্ত্রী বেনজীরের স্ত্রীর ঘের থেকে মাছ চুরির ঘটনায় গ্রেপ্তার ৩ সচেতনতার অভাবে অনেক মানুষ বিভিন্ন দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত: প্রধান বিচারপতি আইনশৃঙ্খলা লঙ্ঘনের কর্মকা- বরদাশত করা হবে না: ডিএমপি কমিশনার মিয়ানমারের শতাধিক সেনা-সীমান্তরক্ষী ফের পালিয়ে এলো বাংলাদেশে গোয়েন্দা পুলিশ পরিচয়ে ডাকাতি, গ্রেপ্তার ৫ ঢাকায় ছয় ঘণ্টায় রেকর্ড ১৩০ মিলিমিটার বৃষ্টি, জলাবদ্ধতা নবম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা প্রণয়নে জাপানের সহায়তা চাওয়া হয়েছে: পরিকল্পনামন্ত্রী বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ককে নতুন উচ্চতায় নিতে চায় চীন: পররাষ্ট্রমন্ত্রী

তিস্তা’র অব্যাহত ভাঙ্গনে নিরালম্ব কুড়িগ্রামবাসী

Reporter Name / ৪১৭ Time View
Update : রবিবার, ২৬ সেপ্টেম্বর, ২০২১

নিজস্ব প্রতিবেদক :
তিস্তা নদীকে বলা হয় পাগলি বা পাগলা নদী। নদীটি কখন কী আচরণ করে, বলা কঠিন। দুই পাড় উজাড় করে তিস্তা নদী ক্রমাগত প্রস্থে বাড়ছে। ২ কিলোমিটারের নদী এখন ১০ থেকে ১২ কিলোমিটারে পরিণত হয়েছে। তিস্তার ভাঙন রোধে আজ পর্যন্ত সরকার কোনো দিন কোনো বড় পদক্ষেপ গ্রহণ করেনি। এমনকি যাঁরা ভাঙনের শিকার, তাঁদের পাশেও সরকার নেই। ২৩৪ বছরের ইতিহাসে এ নদীর পরিচর্যা করারও তেমন কোনো ইতিহাস জানা যায় না।
পাগলি তিস্তার চিরাচরিত ভাঙ্গনের পাশাপাশি ধরলা, ব্রহ্মপুত্র ও দুধকুমর নদীর অব্যাহত ভাঙনের শিকার হয়ে এবার বসতভিটা হারিয়েছেন কুড়িগ্রামের কয়েক হাজার পরিবার। এ সকল নদীর ভাঙন রোধে স্থায়ী সমাধানসহ ৬ দফা দাবিতে ঢাকাস্থ কুড়িগ্রামবাসীর আয়োজনে শনিবার সকালে জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে এক মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়।
মানববন্ধনে বক্তারা বলেন, কুড়িগ্রামের তিস্তা নদীর অব্যাহত ভাঙনে এই এলাকায় এখন পর্যন্ত স্কুল, মসজিদ-মন্দিরসহ হাজার হাজার ঘরবাড়ি, রাস্তা ও আবাদি জমি নদীতে বিলীন হয়ে সর্বস্ব হারিয়েছেন প্রায় দুই হাজার পরিবার। এসব পরিবারের অধিকাংশই আশ্রয় নিয়েছেন রাস্তা ও অন্যের জমিতে। তারা বলেন, গত দুই বছরে কুড়িগ্রাম জেলার এ সংখ্যা প্রায় ৪০ হাজার। শুধু রাজারহাটেই চলতি মৌসুমে প্রায় ১ হাজার ঘরবাড়ি নদীতে বিলীন হয়ে গেছে।
মানববন্ধনে উপস্থিত ছিলেন কুড়িগ্রামের খ্যাতিমান ব্যক্তিত্ব মেজর জেনারেল (অব.) আমসা আমিন, বীর মুক্তিযোদ্ধা ও মেজর (অব.) আবদুস সালাম, সাহিত্যিক ও সাংবাদিক রেজানুর রহমান, পরিবেশবিদ ও নদী গবেষক শেখ রোকন, তিস্তা নদী রক্ষা কমিটির সভাপতি ও বাপার নির্বাহী সদস্য ফরিদুল ইসলাম ফরিদ, কুড়িগ্রাম সমিতি, ঢাকার মহাসচিব সাইদুল আবেদীন ডলার, শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রবিষয়ক উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মো. ফরহাদ হোসেন, রংপুর বিভাগ সাংবাদিক সমিতি (আরডিজেএ) ঢাকায় সভাপতি মোকছেদুর রহমান মাকসুদ, সাধারণ সম্পাদক মিজানুর রহমান, শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক পরিষদ (সিসাপ)-এর সাধারণ সম্পাদক প্রফুল্ল কুমার রায় এবং কুড়িগ্রাম স্টুডেন্টস ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশন ইন ঢাকা (কেএসডব্লিউএডি)-এর সাধারণ সম্পাদক আবু সাঈদ ইসিয়াম।
কুড়িগ্রামের করুণ দশাঃ কুড়িগ্রাম জেলার রাজারহাট উপজেলার গতিয়াশাম নামক স্থানে নদীর প্রায় এক কিলোমিটার আগেই কাদামাটির ওপর গড়ে উঠেছে নতুন অনেক ঘর। বসতভিটা হারিয়ে এভাবেই কাদামাটির ওপর ঘর তৈরি করেই দিনাতিপাত করতে হচ্ছে তাদের। তাদের ভাষ্য, ‘সোগ নদীত ভাসি গেইচে। কোন্টে থাকমো?’
তিস্তার রুদ্ররোষের শিকার কুড়িগ্রামের এই নিরালম্ব মানুষগুলোর অশ্রুসিক্ত চোখের দিকে তাকানো যায় না। এই কষ্ট যদি আমাদের জনপ্রতিনিধি কিংবা সরকারের কর্তারা উপলব্ধি করতেন, তাহলে তাঁরা কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতেন। যাঁদের হাতে সমাধান, তাঁরা থাকেন শীতাতপনিয়ন্ত্রিত বাড়িগাড়িতে। নদীতীরবর্তী বাস্তবতা থেকে যোজন যোজন কিলোমিটার দূরে।
গতিয়াশামের প্রায় দেড় হাজার বাড়ি চলতি বর্ষায় নদীগর্ভে বিলীন। আরও কত এলাকা এবার নদীগর্ভে বিলীন হবে তা অনুমান করা যাচ্ছে না। গতিয়াশামের ওপর দিয়ে এখন তিস্তা প্রবাহিত হচ্ছে। সরকারের পক্ষে যেন খবর নেওয়ার কেউ নেই। স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, ‘নদী তো এমনিতেই ভাঙে, তার ওপর গত বছর মেশিন দিয়ে এক জায়গা থাকি অনেক বালু তুলছে। সেই জন্যে বেশি ভাঙছে নাকি কে জানে।’
এ বছর রংপুর অঞ্চলে বৃষ্টি তুলনামূলক কম ছিল। উজানের পানিও আসে কয়েক দিন পরপর। পানি কম হলেও ভাঙন কম নেই, বরং কিছুটা বেশি। প্রতিবছর কতগুলো বাড়ি ভাঙে, কত আবাদি জমি নদীতে যায়, কোনো পরিসংখ্যান নেই। অনুমান করা যায়, ৪০ থেকে ৫০ হাজার বাড়ি বছরে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। লাখো গাছ ভেসে যায় নদীতে। বলতে গেলে ক্ষতির অর্থমূল্য শত শত কোটি টাকা।
বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক এবং নদী রক্ষাবিষয়ক সংগঠন রিভারাইন পিপলের পরিচালক তুহিন ওয়াদুদের মতে, ‘তিস্তার ভাঙন রোধে সরকারের কার্যকর কোনো পদেক্ষপ নেই। অনেক সময় স্থানীয় বাসিন্দারা চাঁদা তুলে ভাঙন ঠেকাতে কাজ করে থাকেন। যেমন এ বছরেই রংপুরের গঙ্গাচড়া উপজেলার বিনবিনিয়ার চরে স্থানীয় লোকজন প্রায় ১০ লাখ টাকা চাঁদা তুলে একটি বাঁধ নির্মাণ করেছিলেন। বর্ষার প্রথম বৃষ্টি আর উজানের ঢলেই সেটি ভেসে গেছে। সরকার প্রতিবছর বন্যার মৌসুমে পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) মাধ্যমে বালুর বস্তা ফেলার মতো সান্ত¡নামূলক কর্মসূচি গ্রহণ করে থাকে। এতে কখনোই ভাঙন বন্ধ করা সম্ভব নয়। তিস্তার এক স্থানে ভাঙন বন্ধ হলে আরেক স্থানে ভাঙে। আপাতদৃষ্টে মনে হতে পারে, বস্তায় উপকার হয়েছে। বাস্তবে শুধু টাকাই নষ্ট। ভাঙন যা হওয়ার তা-ই হয়।‘
তিনি আরও জানান, এ বছর বর্ষার শুরুতেই খবর পাচ্ছিলাম, তিস্তার বিভিন্ন পয়েন্টে ভাঙন তীব্র আকার ধারণ করেছে। তিস্তা বাঁচাও, নদী বাঁচাও সংগ্রাম পরিষদের সভাপতি নজরুল ইসলাম হক্কানী, সাধারণ সম্পাদক সফিয়ার রহমানসহ কয়েকজন কুড়িগ্রামের চিলমারী উপজেলায় গিয়েছিলাম। ওই স্থানে অপর প্রান্তে গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ উপজেলা। সুন্দরগঞ্জের খানিকটা এলাকা পড়েছে প্রায় আট কিলোমিটার প্রস্থ তিস্তার বাঁ দিকে চিলমারী প্রান্তে কাশিমবাজারে। কাশিমবাজারে তখন তীব্র ভাঙন। যেহেতু গাইবান্ধার অংশে ভাঙছে, তাই কুড়িগ্রাম কিংবা লাগোয়া উলিপুর-চিলমারী উপজেলা প্রশাসন ও জনপ্রতিনিধি তখন পর্যন্ত তাদের কোনো সহায়তা দেয়নি। আমরা যখন গিয়েছিলাম, তত দিন পর্যন্ত সেখানে তাঁদের কেউ পরিদর্শনেও যাননি। নদী রক্ষার দায়িত্ব মূলত কারঃ ছোট-বড় মিলে দেশে নদীর সংখ্যা দুই সহ¯্রাধিক। অথচ নদী দেখভাল করার জন্য নির্দিষ্ট কোনো মন্ত্রণালয় নেই। নদীর অংশবিশেষের সঙ্গে অনেকগুলো মন্ত্রণালয় যুক্ত। নদী রক্ষায় মন্ত্রণালগুলোর কার্যকর সমন্বিত উদ্যোগ দেখা যায় না। নদীর সামগ্রিক কাজের তদারকির জন্য একক কোনো মন্ত্রণালয় নেই, যার মাধ্যমে সমন্বয়পূর্বক নদীর সার্বিক ব্যবস্থাপনার কাজ করা হবে।
তিস্তার পানিবণ্টন চুক্তি নিয়ে উত্তরের মানুষ বিশেষ করে কুড়িগ্রামের মানুষের হতাশা এখন চরমে। কৃষকই শুধু নয়, পানির অভাবে প্রকৃতি ও জীব বৈচিত্রের ওপর যে প্রভাব পড়েছে তা থেকে অঞ্চলটিকে রক্ষায় দ্রুত পদক্ষেপের দাবি উঠেছে সবমহলে। সমস্যা সমাধানে চীনের প্রস্তাবিত আট হাজার কোটি টাকার তিস্তার সমন্বিত মহাপরিকল্পনাকে সমাধান মনে করেন পানি উন্নয়ন বোর্ড।
গত বর্ষায় ৫ দফার বন্যায় বিপন্ন জনপদে বোরো আবাদ করে ঘুরে দাঁড়াবার যখন আপ্রাণ চেষ্টা চালাচ্ছে কৃষক, তখন তিস্তা নদীতে পানি প্রবাহ শূন্যের কোঠায়। মরা তিস্তায় ধু ধু চরের তপ্ত বালিতে শুধু কৃষক নয় ক্ষুব্ধ জেলে ও মাঝিরাও।
তারা বলেন, খরার সময় পানি দেয় না, কিন্তু বন্যার সময় রাতারাতি পানি ছেড়ে দেয়। পানি না থাকলে চাষ হবে কি করে। মানুষ বাঁচবে কিভাবে।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category