• শনিবার, ২০ জুলাই ২০২৪, ০৯:০০ অপরাহ্ন
  • ই-পেপার
সর্বশেষ
সর্বোচ্চ আদালতকে পাশ কাটিয়ে সরকার কিছুই করবে না: আইনমন্ত্রী নাইজেরিয়ান চক্রের মাধ্যমে চট্টগ্রামে কোকেন পাচার কোটা সংস্কার আন্দোলনকারীদের অপেক্ষা করতে বললেন ব্যারিস্টার সুমন পদ্মা সেতুর সুরক্ষায় নদী শাসনে ব্যয় বাড়ছে পিএসসির উপ-পরিচালক জাহাঙ্গীরসহ ৬ জনের রিমান্ড শুনানি পিছিয়েছে শৃঙ্খলা ভঙ্গের চেষ্টা করলে কঠোর ব্যবস্থা: ডিএমপি কমিশনার রপ্তানিতে বাংলাদেশ ব্যবহার করছে না রেল ট্রানজিট রাজাকারের পক্ষে স্লোগান সরকারবিরোধী নয়, রাষ্ট্রবিরোধী: পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. ইউনূসসহ ১৪ জনের মামলায় সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু হয়নি বঙ্গোপসাগরের জীববৈচিত্র্য নিয়ে প্রামাণ্যচিত্র-আলোকচিত্র প্রদর্শনী

শুধু আদালত অবমাননাই নয়, অপরাধও করেছেন: খুলনা বারের সভাপতিকে হাইকোর্ট

Reporter Name / ৭৬ Time View
Update : মঙ্গলবার, ২২ নভেম্বর, ২০২২

নিজস্ব প্রতিবেদক :
খুলনা ল্যান্ড সার্ভে ট্রাইব্যুনালের সাবেক বিচারক (বর্তমানে চাঁপাইনবাবগঞ্জের অতিরিক্ত জেলা জজ) নির্মলেন্দু দাশের সঙ্গে অসদাচরণের মাধ্যমে আদালত অবমাননা করেছেন বলে খুলনা জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি সাইফুল ইসলামসহ তিন আইনজীবীর বিরুদ্ধে অভিযোগে আনা হয়। তাদের তলব করেছিলেন হাইকোর্ট। হাইকোর্টের দেওয়া আদেশে খুলনা বারের সভাপতিসহ তিনজন হাইকোর্টে উপস্থিত হয়েছিলেন। এ বিষয়ে শুনানি হয়েছে তাদের উপস্থিতিতে। আদালতে নিঃশর্ত ক্ষমা প্রার্থনা করেছেন অভিযুক্ত তিনজন। তবে শুনানিতে খুলনা জেলা বারের সভাপতিকে উদ্দেশ করে হাইকোর্ট বলেছেন, আপনি যে আচরণ করেছেন কোনো সভ্য মানুষ বিচারকের সঙ্গে এ ধরনের আচরণ করতে পারে না। আর মানুষ কতটা নিচু হলে বিচারকের সঙ্গে এ ধরনের ভাষা ব্যবহার করতে পারে। বারের সভাপতিকে উদ্দেশ করে আদালত বলেন, আপনি শুধু আইনজীবীদের কলঙ্ক না, খুলনাবাসীর কলঙ্ক। আপনাদের সঙ্গে আদালত বা বিচারকের কোনো সমস্যা হলে, তারচেয়ে বড় কোর্টে প্রতিকার চাইতে যেতে পারতেন। যাওয়ার সুযোগ ছিল। আলাদা কোরাম ছিল। সেগুলো না করে আপনারা নিজেরা ক্যাডারের মতো আচরণ করলেন আদালতের সঙ্গে। আপনারা শুধু আদালত অবমাননাই নয়, আপনারা অপরাধও করেছেন। এসময় তিন আইনজীবী নিঃশর্ত ক্ষমা প্রার্থনা করে বলেন, বিচারকের সঙ্গে এরকম ঘটনা আর কোনোদিন ঘটাবেন না। গত ১ নভেম্বর ওই তিন আইনজীবীকে তলব করে আদেশ দিয়েছিলেন আদালত। ২২ নভেম্বর তাদের হাজির হয়ে ব্যাখ্যা দিতে বলা হয়েছিল। সভাপতি ছাড়া অন্য দুই আইনজীবী হলেন, শেখ নাজমুল হোসেন ও শেখ আশরাফ আলী পাপ্পু। আদালত অবমাননার অভিযোগের শুনানির একপর্যায়ে আদালত আরও বলেন, খুলনায় ভালো মানুষ আছে, আবার এরশাদ শিকদারও ছিল। আপনারা (আইনজীবী) খুলনা বারের সম্মান নষ্ট করে দিয়েছেন। আজ মঙ্গলবার হাইকোর্টের বিচারপতি জে বি এম হাসান ও বিচারপতি রাজিক আল জলিলের সমন্বয়ে গঠিত বেঞ্চ এসব মন্তব্য করেন। শুনানির শুরুতে বার সভাপতিসহ তিন আইনজীবীর পক্ষে নিঃশর্ত ক্ষমা প্রার্থনা করেন সুপ্রিম কোর্ট বারের সভাপতি মো. মোমতাজ উদ্দিন ফকির। এসময় আদালত সুপ্রিম কোর্ট বার সভাপতিকে প্রশ্ন করে বলেন, কোনো সভ্য লোক কি বিচারকের সঙ্গে এ ধরনের আচরণ করতে পারে? তিনি কি বার সভাপতি হয়ে আদালতে দাপট দেখাচ্ছেন? আপনারা কেন এসব মানুষের পক্ষ নিয়ে আদালতে আসেন? আপনারা ডিফেন্ড করতে আসলে আমরা বিব্রত হই। বার কাউন্সিল চরের লোকদের সনদ দিয়ে আইনজীবী বানাচ্ছে। মানুষ কতটা নিচু হলে এ ধরনের বিচারকের সঙ্গে এ ধরনের ভাষা ব্যবহার করতে পারে। খুলনা বার সভাপতিকে আদালত বলেন, আপনি শুধু আইনজীবী সমাজের কলঙ্ক না, আপনি খুলনার কলঙ্ক। আপনি কি নিজেকে খুলনার মহানায়ক মনে করেন? তখন খুলনা বার সভাপতি আদালতে বলেন, আমার ভুল হয়ে গেছে। আমি নিঃশর্ত ক্ষমা চাচ্ছি, আমাকে মাফ করে দেন। এসময় তার পক্ষের আইনজীবী অ্যাডভোকেট সাঈদ আহমেদ রাজা বলেন, আমরা লজ্জিত তাদের পক্ষ থেকে ক্ষমা চাইছি। তিনি বলেন, এটা সত্য, অভিযোগ পড়তে লজ্জা লাগে। রেপ ভিকটিমের জবানবন্দির মতো মনে হয়। আদালত বলেন, আইনজীবীরা যদি আদালতের সঙ্গে এমন আচরণ করেন তাহলে আদালত, বার কিছুই থাকবে না। তারা ক্রিমিন্যাল অফেন্স করেছে। এসময় তিন আইনজীবীর পক্ষ থেকে আইনজীবীরা বলেন, এবারের মতো ক্ষমা করে দেন। আর কখনো এমন হবে না। তখন আদালত বলেন, যারা আদালত অবমাননা করে, বিচারকের সঙ্গে খারাপ আচরণ করে আপনারা তাদের পক্ষে নিয়ে আসবেন না। তাদের আশ্রয় দেবেন না। আপনারা তাদের পক্ষে দাঁড়ালে ভুল ম্যাসেজ যায়। সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবীরা আবারও বলেন, এবারের মতো ক্ষমা করে দেন। আমরা দায়িত্ব নিয়ে বলছি আর কখনো এমন ভুল হবে না। তখন আদালত বলেন, আপনারা ভুল করেননি। অপরাধ করেছেন। এসময় আদালত খুলনার আরেক আইনজীবী অ্যাডভোকেট শেখ আশরাফ আলী পাপ্পুকে ডায়াসের কাছে ডাকেন। তাকে আদালত বলেন, আপনি এর আগে কী করতেন ? তখন তিনি বলেন, ব্যবসা করতাম। আদালত বলেন, আপনার আচরণ আইনজীবীর মতো না। বিচারকের সঙ্গে খারাপ আচরণের ক্ষেত্রেও আপনি মেইন রোল প্লে করেছেন। আপনাদের মতো ব্যবসায়ীরা এসে আইন পেশাকে নষ্ট করে দিচ্ছেন। খুলনার আরেক আইনজীবী শেখ নাজমুল হোসেনকেও ভর্ৎসনা করেন হাইকোর্ট। এর আগে গত ১ নভেম্বর হাইকোর্টের সংশ্লিষ্ট বেঞ্চ স্বঃপ্রণোদিত হয়ে আদালত অবমাননার রুলসহ এ আদেশ দেন। ওইদিন আদালতে রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন অ্যাটর্নি জেনারেল এ এম আমিন উদ্দিন ও ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল তুষার কান্তি রায়। গত ২২ সেপ্টেম্বর বিচারক নির্মলেন্দু দাশের সঙ্গে অসদাচরণের ঘটনায় খুলনা জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি সাইফুল ইসলামসহ তিন আইনজীবীর বিরুদ্ধে নালিশ জানিয়ে প্রধান বিচারপতিকে চিঠি দেওয়া হয়। প্রধান বিচারপতি বরাবর চিঠিটি উপস্থাপন করেন রেজিস্ট্রার জেনারেল। গত ২৫ অক্টোবর প্রধান বিচারপতি বিষয়টি বিচারপতি জে বি এম হাসানের নেতৃত্বাধীন বেঞ্চে উপস্থাপন করতে বলেন। সে অনুসারে নির্দিষ্ট বেঞ্চে অভিযোগ উপস্থাপন হলে আদালত ১ নভেম্বর রুল জারি করে তিন আইনজীবীতে তলব করেন। রেজিস্ট্রার জেনারেলের নথিতে বলা হয়, খুলনা ল্যান্ড সার্ভে ট্রাইব্যুনালের সাবেক বিচারক (বর্তমানে চাঁপাইনবাবগঞ্জের অতিরিক্ত জেলা জজ) নির্মলেন্দু দাশ এক পত্রের মাধ্যমে জানিয়েছেন যে, গত ২২ সেপ্টেম্বর একটি মামলার রায়ের জন্য দিন ঠিক করা ছিল। তবে বাদীপক্ষের আইনজীবী শেখ আশরাফ আলী পাপ্পু মামলাটি রায় হতে প্রত্যাহার করে যুক্তিতর্ক শুনানির জন্য সময় আবেদন করেন। তিনি মৌখিকভাবে ‘এই মোকদ্দমায় বারের সভাপতি সাহেব আবার জেরা করবেন, আমরা একটা সময়ের দরখাস্ত দেবো’ উল্লেখ করে এজলাস ত্যাগ করেন। পরে অন্য মামলার সাক্ষ্যগ্রহণ চলাকালে খুলনা জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি সাইফুল ইসলাম শেখ আশরাফ আলী পাপ্পু, শেখ নাজমুল হোসেনসহ একাধিক আইনজীবীকে সঙ্গে নিয়ে আদালত কক্ষে প্রবেশ করেন এবং বিচারকের সামনে দাঁড়িয়ে গুঞ্জন করতে থাকেন। তখন বিচারক বলেন, ‘আপনারা বসেন’। কিন্তু তারা সে কথায় কর্ণপাত না করে নিজেদের মতো গুঞ্জন করতে থাকেন। এর মাঝে খুলনা বারের সাধারণ সম্পাদক জেরারত অ্যাডভোকেট পিযুষ কান্তি দত্তকে (অন্য একটি মামলায় পিযুষ কান্তি সাক্ষীকে জেরা করছিলেন) জোরের সঙ্গে বলেন, ‘জেরা শেষ করেন’। পিযুষ কান্তির জেরা শেষ হলে বার সভাপতি সাইফুল ইসলাম কৈফিয়ত তলবের সুরে আদালতকে বলেন, ‘আমরা একটা মোকদ্দমায় উভয়পক্ষ সময়ের দরখাস্ত করেছিলাম, আপনি সেই দরখাস্ত নামঞ্জুর করেছেন। এরপর জিপি সাহেব হাতে লেখা দরখাস্ত দিয়েছেন। তারপর সাক্ষী হয়েছে। পরে আমরা সময়ের দরখাস্ত দিলে নেওয়া হয়নি। কেন নেওয়া হয়নি এবং সময়ের দরখাস্ত কেন নামঞ্জুর করলেন, আমাকে বলতে হবে। তখন বিচারক নির্মলেন্দু দাশ বলেন, সভাপতি সাহেব আপনি এভাবে আমার কাছে জানতে চাইতে পারেন? জবাবে উনি বলেন, কীভাবে পারি? কোনভাবে জানবো, বলেন? বিচারক বলেন, আপনি আমার কাছে সময়ের আবেদন করছেন। আমি নামঞ্জুর করছি। আদেশে কারণ দেখে নেবেন। কিন্তু আপনি আমার কাছে এখন কৈফিয়ত তলব করলে তো হবে না। তখন তিনি (উক্ত আইনজীবী) বলেন, কৈফিয়ত চাচ্ছি তো। কারণ আপনি যখন টাকা নিয়ে, ঘুষ নিয়ে অবৈধভাবে সিদ্ধান্ত দেন, সেটার তো জবাব আমরা চাই না। এক পর্যায়ে বিচারককে উদ্দেশ্য করে বার সভাপতি বলেন, আমরা কোর্ট বয়কট করবো। আমরা মিডিয়ার সামনে প্রমাণ করবো আপনি দুর্নীতিবাজ। আপনার বিরুদ্ধে যা যা করা দরকার আমরা করবো। আপনার যা করার আছে, আপনি করেন…। নথিতে আরও বলা হয়, আইনজীবী নাজমুল হোসেনও অশ্রাব্য ভাষায় একটি গালি দেন। অ্যাডভোকেট পাপ্পুও গালাগালি করেন। সভাপতির সঙ্গে থাকা অন্য আইনজীবীরাও অকথ্য ভাষা ব্যবহার করেন এবং গালাগালি করেন। তারপর তিনিসহ তার সঙ্গে আসা অন্য আইনজীবীদের নিয়ে বের হয়ে যান। পাবলিককেও বের করে নিয়ে যান। বের হওয়ার সময় আদালতের দরজায় ধমধম করে বাড়ি দিয়ে যান। নথিতে বলা হয়, একটি বিচারিক বিষয়ে বারের সভাপতি তার সঙ্গীদের নিয়ে যে আচরণ করেছেন তাতে একজন বিচারক হিসেবে তিনি হতাশ, অপমানিত হয়েছেন এবং বিচার বিভাগের মর্যাদার ওপর তারা আঘাত হেনেছেন ও চরমভাবে আদালত অবমাননা করেছেন।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category