নিজস্ব প্রতিবেদক :
দেশের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে জেলা প্রশাসকদের সজাগ থাকার নির্দেশ দিয়েছেন প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস। আজ রোববার প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ের শাপলা হলে তিন দিনব্যাপী জেলা প্রশাসক (ডিসি) সম্মেলনে তিনি এ নির্দেশ দেন। একইসঙ্গে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের বাজারদর নিয়ন্ত্রণে রাখতে মাঠ পর্যায়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশও দেন তিনি। বক্তব্যের আগে সকাল সাড়ে ১০টার দিকে প্রধান উপদেষ্টা সম্মেলনের উদ্বোধন করেন। প্রধান উপদেষ্টা বলেন, পাসপোর্ট তো আমার নাগরিক অধিকার। আমি চোর না ডাকাত সেটা পুলিশ আলাদাভাবে বিচার করবে। আমাকে যে জন্ম সনদ দিয়েছেন সেটা তো কোনো পুলিশ ভেরিফিকেশন নিয়ে করেননি। আমাকে এনআইডি দিয়েছেন সেটাও কোনো পুলিশ ভেরিফিকেশন নিয়ে করেননি, নাগরিক হিসেবে পেয়েছি। তিনি আরো বলেন, আমরা আইন করে দিয়েছি, কিন্তু গ্রামে-গঞ্জে পৌঁছেনি, অথচ আমরা এখানে সিদ্ধান্ত নিয়ে বসে আছি। এই যে দূরত্ব এটা যেন না থাকে। এগুলোর কোনো কারণ নেই, বিনা কারণে মানুষ হয়রানির শিকার হচ্ছে। হয়রানি করাটাই যেন আমাদের ধর্ম। সরকার মানেই মানুষকে হয়রানি করা, এটাকে উল্টে দিতে হবে। সরকার ভিন্ন জিনিস। আপনার অধিকার পৌঁছে দেওয়াই আমাদের কাজ। সরকার পরিচালনাকে খেলার দলের সঙ্গে তুলনা করে তিনি বলেন, “বাংলাদেশে যা কিছু করণীয়, সেই করণীয়র দায়িত্বে আমরা সবাই আছি; এমনভাবে চিন্তা করুন, আমরা একটা খেলার- ক্রিকেট বা ফুটবল খেলার খেলোয়াড়। “আমাদের আজকে এই খেলোয়াড়দের সমাবেশ। প্রস্তুতি নেওয়া যে- আমাদের স্ট্র্যাটেজি কী হবে, অবজেকটিভ কী হবে, আমাদের কার কী করণীয়- এসব ঠিক করা।” সরকারপ্রধান বলেন, “আমরা টিম হলাম কি না যদি এটা বাংলাদেশ সরকার হয়ে থাকে, বাংলাদেশ সরকারকে একটা টিম হতে হবে। এটা টিম ওয়ার্ক। এটা এমন না যে- আমি আমার মতো করলাম, ও ওর মতো করলো- ওইটা হয় না, কোনো কাজেই হয় না। টিম গঠনের জন্য যখন একত্রিত হয়- তখন টিমের চিন্তা, করণীয় সেগুলো নিয়ে আলোচনা হয়। কার কী আছে, তোমার কারণে আমারটা নষ্ট হচ্ছে। “কাজেই খেলা হলো একটা সামগ্রিক জিনিস। একজনের ভুল কাজে পুরো টিম তার সাফল্য থেকে বঞ্চিত হয়। কাজেই আমরা কেউ যেন এমন কোনো ভুল কাজ না করি- যাতে করে পুরো টিমের সাফল্য ব্যাহত হয়; আমাদের গন্তব্যে পৌঁছানো ব্যাহত হয়। এটা নিয়েই আমাদের আলোচনা- আমরা কী করছি।” গত ৫ অগাস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের দুই দিন বাদে শান্তিতে নোবেলজয়ী মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার যাত্রা করে। রাষ্ট্রের বিভিন্ন কাঠামোর সংস্কার শেষে চলতি বছর নাগাদ সংসদ নির্বাচন আয়োজন করতে চায় এই সরকার। ইউনূস বলেন, “সরকার গঠনের পর থেকে ছয় মাস চলে গেল। এটা আমাদের প্রথম পর্ব। আয়োজন করার জন্য যে সময় লাগে; অনেক ভুল-ভ্রান্তি হয়েছে এই আয়োজনের সময়। এখন সেগুলো ঠিকঠাক করে আমরা পুরো খেলার জন্য প্রস্তুত। সেই প্রস্তুতিটা আমাদের হলো কি না, না হলে কী কী ঘাটতি আছে, সেগুলো ঠিক করা। “এটা যদি কোনো কোম্পানির এক্সিকিউটিভ ডিরেক্টরদের কোনো বৈঠক হতো, তাতে যারা শরিক হচ্ছে- তারা কী বলতো নিশ্চয় ম্যানেজিং ডিরেক্টরের প্রশংসায় সময় নষ্ট করতো না। তারা বলতো, ‘এই কাজ দিয়েছেন আমাকে, আমি এই কাজ করেছি, আমার এই সাফল্য হয়েছে, আমি আরও এই কাজের জন্য প্রস্তুত’। “আমি দুইভাবে দেখালাম- একটা হলো মাঠের খেলার খেলোয়াড়, আর ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের ফিল্ড অফিসারদের বক্তব্য। এই সরকারের যারা খেলোয়াড় আছে, তাদের এই ভূমিকা ওই দুই গোষ্ঠীর মধ্যে কোনটার মতো হতে হবে আমরা কী করছি, কী করা দরকার, কোথায় আমরা আটকে যাচ্ছি- সেগুলো নিয়ে আলোচনা।” বক্তব্যে এ পর্যায়ে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, “আমাকে প্রধান অতিথি বলায় একটু কষ্ট পেলাম- যেন আমাকে বাইরে রাখা হলো। এই খেলার মাঠ থেকে হওয়া উচিত ছিল তো আমাকে খেলার ক্যাপ্টেন, কিন্তু আমাকে করলো অতিথি! আমি অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখতে চাই না, আমি ক্যাপ্টেন হিসেবে বক্তব্য রাখতে চাই- আমাদের করণীয় কী। “কাজ কি আমাদের একেবারে হাতেগোনা মাপা জিনিস এটা নিত্যনৈমিত্তিক, নতুন কিছু আসে তা না; একই জিনিস বারেবারে আসছে, বিভিন্ন ভঙ্গিতে আসছে। সেগুলো আমরা কে কীভাবে করছি, কী হলে আরও ভালো হতো, কোঅর্ডিনেশনটা কীভাবে হলে ভালো হতো, ক্যাপ্টেনের সিগনালটা কীভাবে ফিল্ডে গেলে ভালো হতো- এসব নিয়েই আলোচনা।”
আইনশৃঙ্খলায় জোর
৫ অগাস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের দিনই হামলা চালানো হয় থানাসহ পুলিশের বিভিন্ন স্থাপনায়। লুটপাট-ভাংচুর করে আগুন দেওয়া হয়। হামলা হওয়া থানাগুলোতে ধ্বংস হয়ে যায় মামলার নথি, আলামতসহ গুরুত্বপূর্ণ প্রায় সবকিছু। এরপর দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির চরম অবনতি ঘটে। মুহাম্মদ ইউনূস বলেন, “আমরা যেহেতু এমন পরিস্থিতিতে এসেছি, শান্তিশৃঙ্খলা বজায় রাখা মস্ত বড় ইস্যু হয়ে গেল। এতে আমরা কে কী পরিমাণে অগ্রসর হলাম, কী করণীয়- এটা এক নম্বর বিবেচ্য বিষয়। আইনশৃঙ্খলায় আমরা যেন বিফল না হই, কারণ এতে আমাদের সমস্ত অর্জন সফলভাবে অর্জিত হতে বা বিফলতায় পর্যবসিত হতে পারে। “সেটাই নিয়ে এই সম্মেলনে আলোচনা হোক। ফিরে যাবার পর যেন এটা বোঝাবুঝির মধ্যে কোনো গলদ না থাকে। পরস্পরের যোগাযোগ আনন্দদায়ক এবং সফল হোক। আমাদের এই অন্তর্বর্তীকালীন সময়ে যেটুকু তোমাদের মাধ্যমে করতে পারব, তোমাদের কারণে আমরাও যেন স্মরণীয় হতে পারি- ‘উনাদের সময় ডিসি সাহেব এই কাজগুলো আমাদের করে দিয়ে গেছে’।” প্রধান উপদেষ্টা বলেন, “এখানে কী কী বিষয় অন্তর্ভুক্ত, সেগুলো সবার খুব ভালো করেই জানা আছে। পুলিশ প্রশাসনের কাজ কী, সিভিল প্রশাসনের কাজ কী, কো-অর্ডিনেশনের কাজ কীÑসবাই জানে। কিন্তু যদি বলি, ‘ওর কারণে আমারটা হয় না’, এটা বলে আমরা কিন্তু পার পাব না। “যেহেতু জেলার দায়িত্ব সামগ্রিকভাবে একজনের ওপরে, তার সঙ্গে কো-অর্ডিনেশন করে সবকিছু করতে হয়। কাজেই সে কো-অর্ডিনেশনের কী সমস্যা, নাকি পৃথকভাবে হবেÑসেগুলো পরিষ্কার করে নেওয়া প্রয়োজন, যাতে কাজ করতে গিয়ে আমরা অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ে না যাই।” প্রধান উপদেষ্টা বলেন, “আমাদের শৃঙ্খলা ভঙ্গ হলে কী করতে হবে, উপর থেকে নিচ পর্যন্ত চেইন অব কমান্ড কীভাবে যাবে-এটা স্পষ্ট থাকতে হবে। এই নয় যে, ‘এটা আমার কাজ ছিল না, আমি এটাতে মনোযোগ দেই নাই’- এভাবে বললে হবে না। আমরা তো সবাই মিলে সরকার। কাজেই এটা থেকে আমাদের উদ্ধার হতে হবে।” ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের সুরক্ষা নিশ্চিত করার নির্দেশ দিয়ে তিনি বলেন, “নারী-শিশুদের রক্ষা এবং সংখ্যালঘুদের রক্ষা একটা মস্তবড় দায়িত্ব; কারণ এটার উপরে সারা দুনিয়া নজর রাখে আমাদের উপরে। আমরা সংখ্যালঘুদের সঙ্গে কীভাবে ব্যবহার করছি- একটা ছোট্ট ঘটনা সারা দুনিয়ায় বিশাল হয়ে যায়। “আমি সেই ভয়ের জন্য বলছি না, এটা আমাদের সরকারের দায়িত্ব- সকল নাগরিকের সুরক্ষা বিধান করা। আমি সংখ্যালঘুদেরও বলেছি, আপনারা সংখ্যালঘু হিসেবে দাবি করবেন না, দেশের নাগরিক হিসেবে দাবি করুন। সংবিধান আপনাকে অধিকার দিয়েছে, সেই অধিকার আপনাকে সরকারের কাছ থেকে পেতে হবে- এটা আপনাদের পাওনা। আমাদের সরকারের টিমের দায়িত্ব সকলের সুরক্ষা নিশ্চিত করা। আমি এর সরকার, তারও সরকার।” উল্লেখ্য, এবারের সম্মেলনে ৫৬টি মন্ত্রণালয়, বিভাগ, কার্যালয় ও সংস্থা সম্পর্কে ৩৫৪টি প্রস্তাব কার্যপত্রে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। এসব নিয়ে আলোচনা করবেন সংশ্লিষ্টরা। গত শনিবার সচিবালয়ে এক প্রেস ব্রিফিংয়ে মন্ত্রিপরিষদ সচিব শেখ আব্দুর রশীদ বলেন, গত বছর ডিসি সম্মেলনে নেওয়া সিদ্ধান্তের মাত্র ৪৬ শতাংশ বাস্তবায়িত হয়েছে। আগের সরকারের অগ্রাধিকারমূলক অনেক বিষয় বর্তমান সরকারের অগ্রাধিকারের মধ্যে পড়ে না। এ কারণেই অনেক বিষয় কম বাস্তবায়ন হয়েছে। ভূমি ব্যবস্থাপনা, স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম জোরদার করা, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও পুনর্বাসন কার্যক্রম বাড়ানো, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি বাস্তবায়ন এবং ভৌত অবকাঠামো উন্নয়ন বিষয়ে গুরুত্বের সঙ্গে আলোচনা করা হবে এ সম্মেলনে। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন অগ্রগতি প্রতিবেদন থেকে জানা গেছে, কাগজে-কলমে প্রায় প্রতিবছরই ডিসি সম্মেলনে গৃহীত ৯০ শতাংশের বেশি সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন হয়েছে। কিন্তু বাস্তবে এ চিত্র ৬০ শতাংশেরও নিচে বলে জানিয়েছেন এ বিভাগের এক কর্মকর্তা।
ডিসি-বিভাগীয় কমিশনারদের ৩৫৪ সুপারিশ
ঢাকা জেলায় প্রধান সহকারী কাম হিসাব সহকারী পদ সৃষ্টির প্রস্তাব এসেছে। ঢাকা জেলার পাঁচটি উপজেলায় প্রধান সহকারী কাম হিসাব সহকারী পদ সৃজন করা হলেও ১৪টি রাজস্ব সার্কেলে প্রধান এ পদ সৃজন না করায় সেবা প্রদান কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। এজন্য ১৪টি রাজস্ব সার্কেলে একটি করে প্রধান সহকারী পদ সৃজন করা যেতে পারে। সারাদেশে ৩৬টি জেলায় দুদকের কার্যালয় আছে। এখন প্রতিটি জেলায় দুদকের কার্যালয় স্থাপনের প্রস্তাব করেছেন ডিসিরা। কার্যালয় স্থাপনের পাশাপাশি পর্যাপ্ত জনবল নিয়োগেরও প্রস্তাব করেছেন তারা। তিনজন জেলা প্রশাসক এই প্রস্তাব করেছেন। বর্তমানে ডিসি, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসকদের বদলি ও পদায়নের কাজটি করে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়। আর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের (ইউএনও) পদায়নের জন্য মন্ত্রণালয় বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয়ে ন্যস্ত করে। এখন অতিরিক্ত জেলা প্রশাসকের বদলি ও পদায়নের কাজটিও বিভাগীয় কমিশনারের হাতে ন্যস্ত করার প্রস্তাব দিয়েছেন তারা। এ ছাড়া প্রস্তাবের মধ্যে রয়েছে জেলা পুলিশের এসিআর দেওয়া, কনস্টেবল নিয়োগ কমিটিতে তাদের প্রতিনিধি রাখা, ডিসির অধীনে বিশেষ ফোর্স গঠন, অপরাধ ডেটাবেজ ও এনআইডি ডেটাবেজ সার্ভারে ডিসি এবং ইউএনওদের প্রবেশাধিকার, উপজেলা পরিষদের কর্মচারী নিয়োগ ও বদলির ক্ষমতা এবং উপজেলা চেয়ারম্যানের বদলে উপজেলার সরকারি বাসা বরাদ্দের ক্ষমতা। উপজেলা পরিষদের কর্মচারীদের নিয়োগ ও বদলি ডিসিদের হাতে দেওয়ার প্রস্তাব করেছেন ফরিদপুরের ডিসি মোহাম্মদ কামরুল হাসান মোল্যা।
সর্বশেষঃ
আইনশৃঙ্খলা স্বাভাবিক রাখতে ডিসিদের সজাগ থাকার নির্দেশ প্রধান উপদেষ্টার
-
দৈনিক আইন বার্তা
- আপডেট সময়ঃ ০৯:২২:২২ অপরাহ্ন, রবিবার, ১৬ ফেব্রুয়ারী ২০২৫
- ৪২ বার পড়া হয়েছে
ট্যাগস :
জনপ্রিয় সংবাদ