আবদুল মতিন চৌধুরী রিপন, বিশেষ প্রতিনিধি :
স্পেয়ার পার্টস ফর ডয়েজ ডিজেল ইঞ্জিন সংকট চরম সীমায় পৌছেছে ,খুব দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে না পারলে যেকোন সময় পাওয়ার সার্ভিসের অভাবে বন্ধ হতে পারে রেলসেবা। এই সংকট সমাধানের জন্য স্টোর, মেকানিক্যাল, ইলেক্ট্রিক শাখায় একাধিকবার চিঠি চালাচালি করেও কোন সমাধান করা যায়নি। এমনকি রেলওয়ের মহাপরিচালকের (ডিজি) কাছেও লিখিতভাবে জানানো হয়েছে, তবে শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত সংকটের কালো মেঘ বেধ করে আলো ফুটে ওঠেনি। তবে এই সংকট নিরসনের লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়ার জন্য কাজ চলছে বলে জানিয়েছেন প্রধান সরঞ্জাম নিয়ন্ত্রক (সিসিএস)।
জানা যায়, বাংলাদেশ রেলওয়ের ট্রেন চালানোর জন্য পাওয়ার কার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। যাত্রীবাহী ট্রেনের পাখা, বাতি ও শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্র সচল রাখার জন্য বিদ্যুৎ সরবরাহের কাজ করে থাকে পাওয়ার কার। এটি ডিজেল ইঞ্জিন নামে পরিচিত। এই পাওয়ার কার অচল হলে যাত্রীবাহী ট্রেন চলাচলও অচল হয়ে পড়বে।
সুত্র জানায়, বাংলাদেশ রেলওয়ের পূর্বাঞ্চলে ৮২ টি পাওয়ার কারের জন্য ১৬৪টি ডিজেল ইঞ্জিন রয়েছে, আর পশ্চিমাঞ্চলে ৯১ টি পাওয়ার কারের জন্য ডিজেল ইঞ্জিন রয়েছে ১৮২ টি। এসব ইঞ্জিন সচল রাখার জন্য প্রায় ২ শতাধিক আইটেমের খুচরা যন্ত্রাংশ থাকে। যেগুলো খুব জরুরী বিধায় নিরাপদ যাত্রীসেবার স্বার্থে প্রয়োজনের অধিক মালামাল কিনে জমা রাখতে হয়। যেকোন সময় ত্রুটি দেখা দিলেই যাতে মেরামত করা যায়। কিন্তু বিগত প্রায় ৭/৮ মাস যাবৎ এসব যন্ত্রাংশ সরবরাহ না করায় সংকট দেখা দিয়েছে। ২ শতাধিক আইটেমের মধ্যে বর্তমানে ৭/৮ টি আইটেম অল্প পরিমাণে স্টকে আছে। তাই ট্রেন সেবা অব্যাহত রাখতে অতি জরুরী ভিত্তিতে এসব মালামাল সরবরাহ অত্যন্ত জরুরী হয়ে পড়েছে।
রেলভবন সুত্রে জানা গেছে, সম্প্রতি ডিজির বরাবরে পাঠানো এক পত্রে এসব সমস্যা সমাধানের জন্য হস্তক্ষেপ কামনা করা হয়েছে। পত্রে বলা হয়েছে, যাত্রীবাহী ট্রেন সমূহের বাতি, পাখা ও শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা নিশ্চিত করার নিমিত্তে বিদ্যুৎ বিভাগ পূর্বাঞ্চলে বিভিন্ন টাইপ ও ক্যাপাসিটির সর্বমোট ৮২টি পাওয়ারকার রয়েছে এবং এই ৮২টি পাওয়ার কারে ১৬৪টি ডিজেল ইঞ্জিন রয়েছে। এবং পশ্চিমাঞ্চলে ৯১ টি পাওয়ার কারে ১৮২টি ডিজেল ইঞ্জিন রয়েছে। এসব পাওয়ারকার সমূহের ডিজেল ইঞ্জিন মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য প্রয়োজনীয় স্পেয়ার পার্টস/খুচরা যন্ত্রাংশসমূহ স্টকিং আইটেমভুক্ত হওয়াতে সেগুলি সিসিএস, পাহাড়তলী দপ্তর সংগ্রহ ও সরবরাহ করে থাকেন। কিন্তু বর্তমানে বেশকিছু স্পেয়ার পার্টস পাহাড়তলী স্টোরডিপোতে দীর্ঘদিন যাবত মজুদ শূন্য আছে। বিশেষ চাহিদাপত্রের অনুকূলেও মালামাল পাওয়া যাচ্ছে না। যার ফলে পাওয়ার কারের ডিজেল ইঞ্জিনসমূহ মেরামত করা সম্ভব হচ্ছেনা। দ্রুততম সময়ের মধ্যে ডিজেল ইঞ্জিনের খুচরা যন্ত্রাংশসমূহ সরবরাহ পাওয়া না গেলে চলাচলরত যাত্রীবাহী ট্রেনের বাতি, পাখা ও শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা সচল রাখা কঠিন হয়ে পড়বে।
স্পেয়ার পার্টস সংকটের বিষয়টি স্বীকার করে রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের প্রধান ইলেক্ট্রিক ইঞ্জিনিয়ার (সিইই) মো. শফিকুর রহমান বলেন, ’ ২ শতাধিক খুচরা যন্ত্রাংশের মধ্যে ৭/৮ টি আইটেম অল্প পরিমাণে আছে। বাকীগুলোর স্টক শুন্য। যেকোন সময় এসব যন্ত্রাংশ প্রয়োজন হতে পারে। আমরা বিষয়টি উর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের জানিয়েছি, নিরাপদ যাত্রীসেবা অব্যাহত রাখতে দ্রুত পদক্ষেপ নিবেন বলে আশা করছি।
যে কারণে সংকট:রেলওয়ের একটি বিশ্বস্ত সুত্র জানিয়েছে, নিরাপদ যাত্রীসেবার স্বার্থে এসব খুচরা যন্ত্রাংশ অরিজিনাল ইকুইপমেন্ট ম্যানুফেকচারার কান্ট্রি জার্মান থেকে ’নেক্সট জেনারেশন গ্রাফিক্স লিমিটেড’ নামের একটি প্রতিষ্ঠান সরবরাহ করত। বাংলাদেশে একমাত্র তারাই এসব পণ্য আমদানি করত, ফলে অন্যকেউ এসব মালামাল সরবরাহ করতে পারতো না। কিন্তু প্রতিষ্ঠানটির মালিক মো. এহসানের সাথে রেল মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির সাবেক সভাপতি এবিএম ফজলে করিম চৌধুরীর সাথে ঘনিষ্ঠ সখ্যতা ছিল।
সেসময় ফজলে করিমের ছেলে ফারাজ করিমের নির্দেশে নাছির, আদেশ, জাহিদ,তপু নামের ব্যক্তিরা ব্যবসা তদারকি করতেন। ৫ আগস্টে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে সরকার পতনের পর এদের আর খুজে পাওয়া যায়নি। আর অন্যান্যদের কাছে যে মালামাল পাওয়া যাচ্ছে তা নিম্নমানের এবং দামও অনেক বেশি। ফলে আর টেন্ডার আহবান করা যায়নি। এখন এমন এক অবস্থা দাঁড়িয়েছে টেন্ডার না করলে আর ট্রেন চালানো সম্ভব নয়। সুত্র জানায় ওয়ার্কশপ ও ডিপো থেকে রিকুইজিশন আসলেও নানা জটিলতায় টেন্ডার করা হয়নি।
পাওয়ার কারের খুচরা যন্ত্রাংশ সংকটের বিষয়টি স্বীকার করে বাংলাদেশ রেলওয়ের প্রধান সরঞ্জাম নিয়ন্ত্রক (সিসিএস) মো. বেলাল সরকার বলেন, ’ সংকটের বিষয়টি নিরসনের লক্ষ্যে আমরা কাজ করছি, মহাপরিচালক (ডিজি) মহোদয়ের সাথে কথা বলেছি, চিফ মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারের (সিএমই) মতামত নিয়েছি। ঢাকায় ফাইল পাঠানো হয়েছে, অনুমোদন হয়ে আসলে আমরা টেন্ডার আহবান করব। আশা করছি দ্রুত সময়ের মধ্যে অতিজরুরী ভিত্তিতে যন্ত্রাংশ সরবরাহ করা সম্ভব হবে।