বর্তমানে মিডিয়ার মাধ্যমে জানা যায় বাংলাদেশে স্বামী স্ত্রীর মধ্যে বিবাহ বিচ্ছেদের মত ঘটনা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছেন। এই বিচ্ছেদ হয়ত স্বামীর দ্বারা বা স্ত্রীর দ্বারা হয়ে থাকে। সাধারণত বিবাহ বিচ্ছেদের পর সাবেক স্বামী সহজে সাবেক স্ত্রীর দেনমোহর পরিশোধ পুর্বক সাবেক স্ত্রীর স্ত্রীধন বা মুল্যবান সম্পদ যাহা তাহার ঘরে রক্ষিত থাকে সেই সব স্ত্রীধন সমুহ ফেরত প্রদান করেনা তবে অনেকে দেনমোহন পরিশোধ সহ স্ত্রীধন ফেরত প্রদান করে থাকেন কিন্তু সেই হার একে বারেই নগন্য বলা চলে।
সাবেক স্বামী যখন সাবেক স্ত্রীর দেনমোহর ও ইদ্দতকালীন খোরপোষের টাকা পরিশোধ করেনা তখন বিজ্ঞ পারিবারিক আদালতের আশ্রয় গ্রহন করে সাবেক স্বামীর বিরুদ্ধে মামলা দায়েরের মাধ্যমে দেনমোহর ও ইদ্দতকালীন খোরপোষের পাওনা টাকা আদায় করে থাকেন যদিও সেটা বাংলাদেশের বিচার ব্যবস্থা এবং বিবাদী পক্ষের অসহযোগীতার কারনে অনেক লম্বা সময় পার হয়ে যায়।
কিন্তু কথা হচ্ছে সাবেক স্ত্রী দেনমোহর ও ইদ্দতকালীন খোরপোষের টাকা বিজ্ঞ পারিবারিক আদালতের আশ্রয় গ্রহন করে ডিক্রীর মাধ্যমে গ্রহন করেছেন ভাল কথা, তবে সাবেক স্ত্রী তার সাবেক স্বামীর বাড়ী থেকে চলে আসার সময় বা স্বামী কর্তৃক তাড়িয়ে দেওয়ার সময় সেই স্ত্রীর মুল্যবান সম্পদ তথা স্বর্ন, আসবাব পত্র বা কাপড় চোপড় ইত্যাদি (যেটাকে বলা হয় স্ত্রীধন) রেখে আসেন সেসব স্ত্রীধন স্বামী কর্তৃক রেখে দেন।
যদি উল্লেখিত স্ত্রীধন বা মুল্যবান সম্পদ স্বামী স্বেচ্ছায় সাবেক স্ত্রীকে ফেরত প্রদান না করেন তখন অনেকে অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে ফৌজধারী কার্যবিধি আইনের ৯৮ ধারায় সে সব স্ত্রীধন বা মুল্যবান সম্পদ উদ্ধারের জন্যে মামলা দায়ের করে থাকেন। আর অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট আদালত ফৌজধারী কার্যবিধি আইনের ৯৮ ধারা আমলে নিয়ে সেই সব স্ত্রীধন বা মুল্যবান সম্পদ উদ্ধারের জন্যে সার্চ ওয়ারেন্ট বা তল্লাশি পরোয়ানা ইস্যু করে থাকেন। পেশাগত জীবনে এমন অনেক আদেশ দেওয়ার মত ঘটনার স্বাক্ষী হয়েছি।
এখন কথা হচ্ছে অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট আদালত ফৌজধারী কার্যবিধি আইনের ৯৮ ধারা আমলে নিয়ে সেই সব স্ত্রীধন বা মুল্যবান সম্পদ উদ্ধারের জন্যে সার্চ ওয়ারেন্ট বা তল্লাশি পরোয়ানা ইস্যু করতে পারেন কিনা ?
সহজ কথায় উত্তর হচ্ছে পারেনা কারণ ফৌজধারী কার্যবিধি আইনের ৯৮ ধারায় বলা হয়েছে,
যদি কোন জেলা ম্যাজিস্ট্রেট অথবা বিশেষভাবে সরকার কর্তৃক এই বিষয়ে ক্ষমতাপ্রাপ্ত একজন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট, তথ্যের ভিত্তিতে এবং প্রয়োজনীয় তদন্তের পরে বিশ্বাস করার কারণ আছে যে কোন জায়গায় চুরি করা সম্পত্তি জমা বা বিক্রির জন্য ব্যবহৃত হয়
অথবা জাল নথি, ভুয়া সীল বা নকল স্ট্যাম্প বা মুদ্রা অথবা জাল মুদ্রা বা ডাকটিকিট বা জালিয়াতির জন্য যন্ত্র বা উপকরণ জমা বা বিক্রয় বা তৈরির জন্য
অথবা যে কোন জাল দলিল, ভুয়া সীল বা নকল স্ট্যাম্প বা মুদ্রা অথবা জাল মুদ্রা বা ডাকটিকিট বা জালিয়াতির জন্য ব্যবহৃত যন্ত্র বা উপকরণ যে কোন স্থানে রাখা বা জমা করা হয়
অথবা যদি কোন জেলা ম্যাজিস্ট্রেট অথবা বিশেষভাবে সরকার কর্তৃক এই বিষয়ে ক্ষমতাপ্রাপ্ত একজন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট তথ্যের ভিত্তিতে এবং প্রয়োজনীয় তদন্তের পরে এই মর্মে বিশ্বাস করার কারণ আছে যে কোন স্থান জমা, বিক্রয়, উৎপাদনের জন্য ব্যবহৃত হয় অথবা যে কোন অশ্লীল বস্তুর উৎপাদন যেমন দ-বিধির ২৯২ ধারা উল্লেখ করা হয়েছে বা এই ধরনের অশ্লীল বস্তু যে কোন স্থানে রাখা বা জমা করা হয়েছে তিনি তার পরোয়ানা দ্বারা একজন কনস্টেবল পদমর্যাদার উপরের পুলিশ অফিসারকে অনুমোদন দিতে পারেন।
তাহলে দেখা যায় যেহেতু ফৌজধারী কার্যবিধি আইনের ৯৮ ধারার কোথাও স্ত্রীধন বা মুল্যবান সম্পদ উদ্ধারের কথা উল্লেখ নেই সেহেতু অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট আদালত কর্তৃক ফৌজধারী কার্যবিধি আইনের ৯৮ ধারা আমলে নিয়ে সেই সব স্ত্রীধন বা মুল্যবান সম্পদ উদ্ধারের জন্যে সার্চ ওয়ারেন্ট বা তল্লাশি পরোয়ানা ইস্যু করার আদেশ আইনত রক্ষণীয় নহে এবং আইন বিরোধী হয় আর অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট আদালত ফৌজধারী কার্যবিধি আইনের ৯৮ ধারা আমলে নিয়ে স্ত্রীধন বা মুল্যবান সম্পদ উদ্ধারের জন্যে সার্চ ওয়ারেন্ট বা তল্লাশি পরোয়ানা ইস্যু করার আদেশ দিলেও সেই আদেশ রিভিশন দায়েরের প্রেক্ষিতে বিজ্ঞ দায়রা জজ আদালত কর্তৃক রদ বা বাতিল হয়ে যায় এমন নজির দেখেছি এবং মহামান্য উচ্চ আদালতের অনেক নজীর রহিয়াছেন যে, অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট আদালত ফৌজধারী কার্যবিধি আইনের ৯৮ ধারা আমলে নিয়ে স্ত্রীধন বা মুল্যবান সম্পদ উদ্ধারের জন্যে সার্চ ওয়ারেন্ট বা তল্লাশি পরোয়ানা ইস্যু করিতে পারেনা।
মহামান্য উচ্চ আদালতের নজীর হিসেবে দেখা যায়, বিয়ের ফার্নিচার উদ্ধারের জন্যে ফৌজধারী কার্যবিধির ৯৮ ধারায় প্রার্থীক বিজ্ঞ ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে মামলা দায়ের করিলে মহামান্য সুপ্রিম কোর্ট বলেন,
চৎড়ারংরড়হ ড়ভ ংবপঃরড়হ ৯৮ ড়ভ ঃযব ঈৎ.চঈ রং ধঢ়ঢ়ষরপধনষব ড়হষু যিবহ ঃযব সধমরংঃৎধঃব রং ংধঃরংভরবফ ঃযধঃ ঃযব ঢ়ষধপব ঃড় নব ংবধৎপযবফ রং ঁংবফ ভড়ৎ ফবঢ়ড়ংরঃব ড়ৎ ংধষব ড়ভ ংঃড়ষবহ ঢ়ৎড়ঢ়বৎঃু.
ছধুর ঐধনরনঁষষধয ইবষধষর ঠং. ঈধঢ়ঃ. অহধিৎঁষ অুরস কযধহ (৪০ উখজ- ১৯৮৮, ঐঈউ-২৯৫), ( ৯, ইখঞ- ২০০১- ঐঈউ-২৯৩)
উক্ত মামলার রায়ের মহামান্য আদালত উল্লেখ করেছেন বিয়ের ফার্নিচার উদ্ধারের জন্যে বিজ্ঞ ম্যাজিস্ট্রেট ফৌজধারী কার্যবিধির ৯৮ ধারায় আদেশ প্রদান করিতে পারেনা।
এবার আসি তাহলে সাবেক স্ত্রী তাহার স্ত্রীধন বা মুল্যবান সম্পদ সাবেক স্বামীর নিকট হতে কিভাবে বা কোন আইনে উদ্ধার করিবেন। এই ক্ষেত্রে নজর দেওয়া যাক পারিবারিক সহিংসতা (প্রতিরোধ ও সুরক্ষা) আইন, ২০১০ এর দিকে। এই আইনের ধারা ১৫ (১) এর উপধারা ৭ এ বলা হয়েছে যে,
আদালত সংক্ষুব্ধ ব্যক্তির মালিকানাধীন যে কোন স্থাবর সম্পত্তি বা স্ত্রীধন বা উপহার সামগ্রী বা বিবাহের সময় অর্জিত যে কোন সম্পদ এবং অস্থাবর সম্পত্তি বা মূল্যবান দলিল বা সনদ এবং অন্য যে কোন সম্পদ অথবা মূল্যবান জামানত তাহাকে ফেরত প্রদান করিবার জন্য প্রতিপক্ষকে আদেশ দিতে পারিবে।
তাহলে ইহা বুঝা যায় স্ত্রীধন বা মুল্যবান সম্পদ বা বিবাহের সময় দেওয়া ফার্নিচার সমুহ ফেরত পাওয়ার লক্ষে একমাত্র উপযুক্ত আদালত হচ্ছে বিজ্ঞ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট বা বিজ্ঞ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত এবং স্থান ভেদে এসব আদালতেই বিবাহের ফার্নিচার তথা স্ত্রীধন উদ্ধারের জন্যে আবেদন করিতে হইতে।
তালাকের পর বিয়ের ফার্নিচার উদ্ধার করবেন যেভাবে
-
এ্যাডভোকেট মোঃ ওমর ফারুক
- আপডেট সময়ঃ ০৮:৪৩:৫৫ অপরাহ্ন, রবিবার, ৩ অক্টোবর ২০২১
- ৩১৮ বার পড়া হয়েছে