নিজস্ব প্রতিবেদক :
এবারে দিনাজপুর শিক্ষা বোর্ডের অধীনে এইচএসসি পরীক্ষায় ২০টি কলেজের কেউই পাস করতে পারেননি। এমনও হয়েছে যে গত কয়েক বছর ধরেই কোনো কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান শতভাগ অকৃতকার্যের তালিকাতেই রয়েছে। শতভাগ অকৃতকার্য প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা প্রতিবছরই বাড়ছে দিনাজপুর বোর্ডে। তবে এবারে নড়েচড়ে বসেছে শিক্ষা বোর্ড। প্রতিষ্ঠানগুলোর ব্যাপারে তদন্ত করে শক্ত অবস্থানে যাচ্ছে। সেক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানগুলো পাঠদানের অনুমতি হারাতে পারে। দিনাজপুর শিক্ষা বোর্ড সূত্রে জানা যায়, চলতি বছরে এই বোর্ডের অধীনে এইচএসসিতে শতভাগ অকৃতকার্য হয় ২০টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। গত বছর যেটা ছিল ১৬, ২০২২ সালে ১৩ এবং ২০২১ সালে ২টি। অর্থাৎ প্রতিবছরই বাড়ছে এই সংখ্যা। কিন্তু কেন এমনটি হচ্ছে এর সদুত্তর দিতে পারেনি সংশ্লিষ্টরা। তদন্ত করে ব্যবস্থা গ্রহণের কথা থাকলেও বাস্তবে তা প্রতিফলিত হয়নি। বরং এমন হয়েছে যে, বারবার বেশ কিছু প্রতিষ্ঠান শতভাগ অকৃতকার্যের তালিকাতে এসেছে। চলতি বছরও যে ২০টি প্রতিষ্ঠান থেকে কেউই পাস করতে পারেনি তার মধ্যে ৫টি প্রতিষ্ঠান রয়েছে যেগুলো থেকে গত বছরও কেউই পাস করেনি। সবচেয়ে বড় বিষয়, নিয়ম রয়েছে যেকোনও প্রতিষ্ঠানের একটি শ্রেণিতে যদি ২৫ জনের কম শিক্ষার্থী থাকে তাহলে সেই প্রতিষ্ঠান পাঠদানের অনুমোদন পাবে না। এই পাঠদানের অনুমতি দেওয়া হয় শিক্ষা বোর্ড থেকেই। অথচ শতভাগ অকৃতকার্য প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করেছেন সর্বোচ্চ ৮ জন পর্যন্ত। যা অনুমোদন পেতে শর্তের এক তৃতীয়াংশ। আবার এমন প্রতিষ্ঠান রয়েছে যেগুলো থেকে মাত্র একজন বা দুজন করে পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করেছেন। শিক্ষা বোর্ড থেকে প্রাপ্ত পরিসংখ্যান সূত্রে জানা যায়, এবার শতভাগ অকৃতকার্যের তালিকায় থাকা প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে ৬টি লালমনিরহাটের, ৫টি ঠাকুরগাঁওয়ের, ৩টি দিনাজপুরের, ২টি করে রংপুর ও কুড়িগ্রামে এবং একটি করে গাইবান্ধা ও নীলফামারীর। এগুলো হলো লালমনিরহাট জেলার আদিতমারী উপজেলার গন্ধমরুয়া স্কুল অ্যান্ড কলেজের ৮ জন, কালীগঞ্জ উপজেলার সোনারহাট স্কুল অ্যান্ড কলেজের ৩ জন, একই উপজেলার শিয়ালখোওয়া কলেজের ৩ জন, দুহুলী এসসি হাইস্কুল অ্যান্ড কলেজের একজন, কাকিনা গার্লস হাইস্কুল অ্যান্ড কলেজের একজন ও আদিতমারী উপজেলার নামুরি হাইস্কুল অ্যান্ড কলেজের একজন; ঠাকুররগাঁও জেলার রানীশংকৈল উপজেলার গোগর কলেজের ৬ জন, বালিয়াডাঙ্গী উপজেলার রতœাই বাগুলাবাড়ী হাইস্কুল অ্যান্ড কলেজের ৩ জন, মোড়লহাট জনতা স্কুল অ্যান্ড কলেজের ২ জন, সদর উপজেলার কদমসুল হাট স্কুল অ্যান্ড কলেজের ২ জন ও কালেক্টরেট পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজের একজন; দিনাজপুরের বীরগঞ্জ উপজেলার সনকা আদর্শ কলেজের ৬ জন, হাকিমপুর উপজেলার বোয়ালদার হাইস্কুল অ্যান্ড কলেজের ৪ জন ও ফুলবাড়ী উপজেলার উত্তর লক্ষ্মীপুর হাইস্কুল অ্যান্ড কলেজের ৩ জন; কুড়িগ্রাম জেলার নাগেশ্বরী উপজেলার গোপালপুর এমএল হাইস্কুল অ্যান্ড কলেজের ৬ জন ও রৌমারী উপজেলার শৌলমারী এমআর স্কুল অ্যান্ড কলেজের একজন; রংপুর সদর উপজেলার আর্কেডিয়া ইন্টারন্যাশনাল কলেজের ৩ জন ও গঙ্গাচরা উপজেলার বড়াইবাড়ী কলেজের একজন, নীলফামারী জেলার ডোমার উপজেলার বাগডোকরা নিমোজখানা হাইস্কুল অ্যান্ড কলেজের ৬ জন এবং গাইবান্ধা জেলার পলাশবাড়ী উপজেলার ফকিরহাট মহিলা কলেজের ২ জন। এসব প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ৫টি কলেজ থেকে গত বছরও কোন শিক্ষার্থী পাস করতে পারেনি। প্রতিষ্ঠানগুলো হলো ঠাকুরগাঁও জেলার মোড়লহাট স্কুল অ্যান্ড কলেজ, একই জেলার সদর উপজেলার কদমরসুল স্কুল অ্যান্ড কলেজ, লালমনিরহাট জেলার কালীগঞ্জ উপজেলার দুহুলী হাইস্কুল অ্যান্ড কলেজ, দিনাজপুর জেলার ফুলবাড়ী উপজেলার উত্তর লক্ষ্মীপুর হাইস্কুল অ্যান্ড কলেজ এবং গাইবান্ধা জেলার পলাশবাড়ী উপজেলার ফকিরহাট মহিলা কলেজ। নিয়ম রয়েছে, একটি শ্রেণিতে ২৫ জনের কম শিক্ষার্থী হলে সেই প্রতিষ্ঠান পাঠদানের অনুমতি পাবে না। এরপরও এত কম শিক্ষার্থী পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করেছে। আবার এসব প্রতিষ্ঠানের অধিকাংশতেই নেই শিক্ষার সুষ্ঠু পরিবেশ, বাহ্যিক অবকাঠামোও ভঙ্গুর। যা নিয়ে অভিভাবকদের রয়েছে আক্ষেপ। শতভাগ অকৃতকার্যের তালিকায় থাকা দিনাজপুরের ফুলবাড়ী উপজেলার উত্তর লক্ষ্মীপুর হাইস্কুল অ্যান্ড কলেজ একটি। ২০২২, ২০২৩ ও ২০২৪ সাল পরপর তিনবারই শতভাগ অকৃতকার্যের তালিকায় রয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। প্রতিষ্ঠানটির কলেজ শাখা এখনও এমপিওভুক্ত হয়নি। কলেজ শাখায় ১৫ জন শিক্ষক ও কর্মচারী থাকলেও তাদের অধিকাংশই কলেজে আসেন না। কথা হলে এলাকার সিরাজুল ইসলাম বলেন, ‘শিক্ষার্থীরা আসলেও শিক্ষকরা আসেন না। দীর্ঘদিন যাবৎ বেতন-ভাতা নাই। ফলে শিক্ষকরা আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছেন। শিক্ষার্থী ভর্তি হলেও পড়াশোনা নাই। যার কারণে শিক্ষার্থীরা পাস করতে পারছে না।’ স্থানীয় এক বাসিন্দা বলেন, ‘এমপিও না হওয়ার কারণে বেতন নাই। এজন্য শিক্ষকরা আসেন না। ৪ জন শিক্ষক, তারাও ঠিকভাবে আসেন না।’ দিনাজপুর মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডের কলেজ পরিদর্শক আবু সায়েম বলেন, ‘২০টি প্রতিষ্ঠানই নন-এমপিও। কোনো কোনো প্রতিষ্ঠান রয়েছে যেখানে শিক্ষক নাই। যখন পাঠদানের অনুমতি দেওয়া হয়েছিল তখন শিক্ষার্থী সংখ্যা ২৫ জন বা তার বেশি ছিল। কিন্তু এখন কমে গেছে। এটা নিয়ে আমাদের চেয়ারম্যান ইতোমধ্যেই নির্দেশনা দিয়েছেন। এগুলো সরেজমিনে তদন্ত করে কী অবস্থা, কবে পাঠদানের অনুমতি দেওয়া হয়েছে এসব দেখে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’ এ ব্যাপারে কথা হলে দিনাজপুর মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান প্রফেসর স ম আবদুস সামাদ আজাদ বলেন, ‘যে ২০টি প্রতিষ্ঠান থেকে কেউই পাস করতে পারেনি সেগুলোর পরীক্ষার্থীসংখ্যা খুবই কম। অনেকগুলোতে একজন পরীক্ষার্থী, সেই একজনই ফেল করেছে। আবার কিছুসংখ্যক রয়েছে ২ থেকে ৩ জন পরীক্ষার্থী। আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি, প্রতিষ্ঠানগুলো সরেজমিন তদন্ত করা হবে। সেই প্রতিবেদনের ভিত্তিতে পাঠদানের যে অনুমোদন শিক্ষা বোর্ড থেকে দেওয়া হয় সেই অনুমতি বাতিল করা যায় কি না, সেই বিষয়ে পদক্ষেপ গ্রহণ করবো। প্রয়োজনে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে এ-সংক্রান্ত প্রতিবেদন প্রেরণ করবো।’
সর্বশেষঃ
দিনাজপুর বোর্ডের ২০ কলেজের সবাই ফেল, হারাতে পারে পাঠদান অনুমতি
-
দৈনিক আইন বার্তা
- আপডেট সময়ঃ ০৭:৩১:২৫ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১৮ অক্টোবর ২০২৪
- ৪৮ বার পড়া হয়েছে
ট্যাগস :
জনপ্রিয় সংবাদ