নিজস্ব প্রতিবেদক :
উদ্বোধনের প্রায় দেড় বছর হতে চললেও চালু হয়নি রাজশাহী শিশু হাসপাতালের কার্যক্রম। এ বিষয়ে নির্মাণকাজের তদারকির দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তার ভাষ্য, ‘নির্মাণকাজ শেষ করার পর প্রথম দফার করা রঙ উঠে যাওয়ায় মাস খানেক আগে আবারও রঙ করা হয়েছে। কিন্তু হাসপাতালটি কেউ বুঝে নিচ্ছেন না। অথচ, অন্যান্য কাজে দেখা যায়, সংশ্লিষ্ট বিভাগ বা কর্মকর্তারা আমাদের দ্রুত কাজ শেষ করতে তাগিদ দেন, আর এখানে পুরোটাই উল্টো চিত্র। এখানে এক বছরের অধিক সময় ধরে কাজ শেষ করে বসে আছি কিন্তু কারো কোনো খোঁজ নেই। স্বাস্থ্য বিভাগের কর্মকর্তাদের অনেকবার বলেছি, ভবন বুঝে নিতে, কিন্তু তারাও নিচ্ছেন না। আর এই বক্তব্যে প্রেক্ষিতে রাজশাহীর সিভিল সার্জনের ভাষ্য, গণপূর্ত বিভাগের পক্ষ থেকে আমাদেরকে এখনও চিঠি দিয়ে জানানো হয়নি।’ ফলে দাপ্তরিক এমন চিঠি চালাচালির রোষানলে পড়ে চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে এ অঞ্চলের শিশুরা। আর ২০০ শয্যার বিশেষায়িত এই শিশু হাসপাতালটি খালি পড়ে থাকলেও অন্তত ২০ জেলার শিশু রোগী সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতাল কতৃপক্ষ। সূত্র মতে, প্রায় দেড় বছর আগে ২০০ শয্যার বিশেষায়িত রাজশাহী শিশু হাসপাতালটির নির্মাণকাজ শেষ হয়েছে। এরপর ২০২৩ সালের ২৯ জানুয়ারি হাসপাতালটির উদ্বোধন করা হয়। উদ্বোধনের পর অতিবাহিত হয়েছে আরও প্রায় এক বছর তিন মাস। তারপরেও হাসপাতালটির কার্যক্রম চালু না হওয়ার বিষয়ে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, হাসপাতাল চালু করতে হলে জনবল এবং মেডিকেল সামগ্রীও দরকার। সেটি এখনো পাওয়া যায়নি। এজন্য হাসপাতালটি চালু করা যাচ্ছে না। নির্মাণকাজের তদারকির দায়িত্বে থাকা গণপূর্ত বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, হাসপাতালটি কোন দপ্তরের কাছে বুঝিয়ে দেয়া হবে, সে নির্দেশনা এখনও পায়নি। ফলে ২০০ শয্যার বিশেষায়িত হাসপাতালটি পড়ে আছে দিনের পর দিন। পূর্ণাঙ্গ হাসপাতালটি খালি পড়ে থাকলেও অন্তত ২০ জেলার শিশু রোগী সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতাল। এখানে তিনটি ওয়ার্ডে চিকিৎসা চলছে শিশুদের। এক শয্যাতেই রাখা হচ্ছে তিন-চারটি শিশুকে। তার পরও নতুন হাসপাতাল চালুর উদ্যোগ নেই। হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, নবনির্মিত হাসপাতালের জায়গায় আগে সরকারি কোয়ার্টার ছিল। সেগুলো ভেঙে পূর্ণাঙ্গ শিশু হাসপাতাল নির্মাণের সিদ্ধান্ত নেয় স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। সে অনুযায়ী হাসপাতাল নির্মাণ শুরু করে গণপূর্ত বিভাগ। এরপর ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ২০১৫ সালের মে মাসে ভবন নির্মাণ কাজের শুরুতেই জটিলতায় পড়ে নকশা নিয়ে। প্রথমে ১০ তলা ভবন নির্মাণের পরিকল্পনা থাকলেও পরে তা নেমে আসে চার তলায়। যে ১০ তলা ভবনটি করার পরিকল্পনা ছিল ১৬ হাজার বর্গফুটের। পরে সেই নকশা সংশোধন হলে ২৭ হাজার বর্গফুট সীমানায় চার তলা ভবন নির্মানের কাজ শুরু করে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। সিডিউল মতে, ২০১৮ সালের জুন মাসে নির্মাণকাজ শেষ হওয়ার কথা থাকলেও ২০১৯ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত প্রকল্পের মেয়াদ বাড়ানো হয়। তাতেও কাজ শেষ না হওয়ায় ২০২০ সালের জুন পর্যন্ত এরপর ৪র্থ দফায় আবার ২০২১ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত মেয়াদ বাড়ে। ওই মেয়াদও পার হওয়ার প্রায় এক বছর পর নির্মান কাজ শেষ হয়। এদিকে, প্রথম মেয়াদে কাজের ব্যয় ধরা হয়েছিল প্রায় ১৩ কোটি টাকা। পরে কয়েক দফা প্রকল্পের মেয়াদ বেড়ে গিয়ে নির্মানব্যয় দাঁড়ায় প্রায় ৩৪ কোটি টাকায়। জানা গেছে, এই শিশু হাসপাতালটির প্রথম তলার আয়তন ১৯ হাজার বর্গফুট। এখানে রয়েছে ১৪ শয্যার জেনারেল অবজারভেশন ইউনিট। এক্স-রে করানোর জন্য দুটি এবং সিটি স্ক্যান ও এমআরআই-এর জন্য একটি করে কক্ষ রাখা হয়েছে। স্টোর হিসেবে রয়েছে ৮টি কক্ষ। নিচতলায় একসঙ্গে ২০টি গাড়ি পার্কিংয়েরও ব্যবস্থা রয়েছে। ২০ হাজার ২২৫ বর্গফুটের দ্বিতীয় তলা রয়েছে একটি মাইনর অপারেশন থিয়েটার (ওটি) ও চারটি বিশেষায়িত ওটি। এ ছাড়া ১০ শয্যার প্রি ও পোস্ট অপারেশন থিয়েটার এবং ৫৬ শয্যার নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র (আইসিইউ) ইউনিট করা হয়েছে। চতুর্থ তলায় রয়েছে শিশুদের ৯৬ শয্যার সাধারণ ওয়ার্ড এবং ১৮ শয্যার পেয়িং শয্যা। হাসপাতালে রোগী ভর্তি রাখার পাশাপাশি বহির্বিভাগে চিকিৎসাও দেয়া হবে। তৃতীয় তলায় চিকিৎসকের জন্য করা হয়েছে ১৮টি কক্ষ। হাসপাতালে থাকবে ক্যান্টিন, ল্যাব এবং অফিস ব্লক। গণপূর্তের তথ্যানুযায়ী, হাসপাতাল ভবন নির্মাণে ব্যয় হয়েছে প্রায় ২৩ কোটি টাকা। এর মধ্যে জেনারেটর কেনা ও সাবস্টেশন নির্মাণে খরচ হয়েছে প্রায় ২ কোটি টাকা। বৈদ্যুতিক পাখা, এসি, সোলার প্যানেল এবং অগ্নিনির্বাপণ সামগ্রী বসানো হয়েছে আরও প্রায় দেড় কোটি টাকার। আর প্রায় এক কোটি টাকা খরচ হয়েছে সাবস্টেশন এবং আন্ডারগ্রাউন্ড ওয়াটার রিজার্ভার নির্মাণ করতে। দুটি লিফট কিনতে খরচ হয়েছে প্রায় ২ কোটি টাকা। পুরো হাসপাতালে অক্সিজেন সরবরাহ লাইন বসাতে খরচ হয়েছে প্রায় ২ কোটি টাকা। তাদের এ হিসেব অনুযায়ী শুধু হাসপাতালটির সীমানাপ্রাচীরের গ্রিল লাগানোর কাজ ছাড়া চালুর জন্য সবকিছুই প্রস্তুত। অবশিষ্ট কাজ না করার বিষয়ে বলেন, চুরি হয়ে যাওয়ার আশঙ্কায় ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান গ্রিল লাগাচ্ছেন না। ২০০ শয্যার বিশেষায়িত এই হাসপাতাল নির্মাণকাজের তদারকির দায়িত্বে থাকা রাজশাহী গণপূর্ত বিভাগ-২-এর উপবিভাগীয় প্রকৌশলী রবিউল ইসলাম খান বলেন, নির্মাণকাজ এক বছর আগে শেষ হয়েছে। প্রথম দফার করা রঙ উঠে যাওয়ায় এক মাস আগে আবারও রঙ করা হয়েছে। কিন্তু হাসপাতাল কেউ বুঝে নিচ্ছে না। রামেক হাসপাতাল, সিভিল সার্জনের কার্যালয় নাকি বিভাগীয় স্বাস্থ্য দপ্তরকে হাসপাতালটি বুঝে নেবে, আমরা তাও জানি না। অন্য কাজে দেখি সংশ্লিষ্ট বিভাগ বা কর্মকর্তারা আমাদের দ্রুত কাজ শেষ করতে তাগিদ দেন। অথচ, এখানে কাজ শেষ করে বসে থাকলেও কারোরই কোনো খোঁজ নেই। স্বাস্থ্য বিভাগের কর্মকর্তাদের অনেকবার বলেছি, ভবন বুঝে নিতে, কিন্তু তারাও নিচ্ছেন না। এ বিষয়ে হাসপাতাল বাস্তবায়ন কমিটির সদস্য সচিব রাজশাহীর সিভিল সার্জন ডা. আবু সাইদ মো. ফারুক বলেন, হাসপাতালের নির্মাণকাজ শেষ হওয়ার বিষয়ে গণপূর্ত বিভাগ তো আমাদের চিঠি দিয়ে জানাননি। চিঠি না দেয়ার বিষয়ে নির্মাণকাজের তদারকির দায়িত্বে থাকা রাজশাহী গণপূর্ত বিভাগ-২-এর উপবিভাগীয় প্রকৌশলী রবিউল ইসলাম খান বলেন, হস্তান্তরের আগের দিন পর্যন্ত টুকটাক কাজের প্রয়োজন হতে পারে। এ কারণে চিঠি না দেওয়া হলেও স্বাস্থ্য বিভাগের সংশ্লিষ্ট সবাইকে মৌখিকভাবে জানানো হয়েছে। এ বিষয়ে রাজশাহী বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালক ডা. আনোয়ারুল কবীর বলেন, হাসপাতালের কাজ শেষ হওয়ার বিষয়টি আমরা জানি। এখন চালু করতে হলে জনবল প্রয়োজন। অন্যান্য মেডিকেল সামগ্রীও দরকার। বিষয়টি একাধিকবার স্বাস্থ্য অধিদপ্তরকে জানিয়েছি। কিন্তু সেখান থেকে কোনো ধরনের নির্দেশনা না পাওয়ায় আমরা কোনো পদক্ষেপ নিতে পারছি না।
সর্বশেষঃ
দেড় বছরেও চালু হয়নি বিশেষায়িত শিশু হাসপাতালের কার্যক্রম
-
দৈনিক আইন বার্তা
- আপডেট সময়ঃ ০৯:৫০:১৩ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৩ এপ্রিল ২০২৪
- ১১০ বার পড়া হয়েছে
ট্যাগস :
জনপ্রিয় সংবাদ