জামালপুর প্রতিনিধি :
জামালপুরের মেলান্দহ উপজেলার প্রকৌশলী মোহাম্মদ মুসার বিরুদ্ধে ভূয়া মুক্তিযোদ্ধার অভিযোগ এনে স্থানীয় কোনামালঞ্চ মাদ্রাসার শিক্ষকদের হেনস্তা করে ওই মাদ্রাসার অর্থ আত্নসাতের অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগী মাদ্রাসার সাবেক ও বর্তমান শিক্ষক, প্রতিবেশী মুক্তিযোদ্ধা ও স্থানীয় প্রতিবেশী।
বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা বিষয়ক মন্ত্রনালয়ের উপদেষ্টা ও জামালপুর জেলা প্রশাসকসহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন দপ্তরে দাখিলকৃত অভিযোগ সুত্রে জানাগেছে, জামালপুর জেলার মেলান্দহ উপজেলার কোনামালঞ্চ এলাকার বাসিন্দা এলজিইডির সাবেক প্রকল্প পরিচালক প্রকৌশলী মোহাম্মদ মুসা মেলান্দহ উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ড কাউন্সিলের সাবেক কমান্ডারকে মোটা অঙ্কের বিশেষ সমঝোতায় ম্যানেজ করে একটি মুক্তিযোদ্ধা সনদ সংগ্রহ করে তিনি রাতারাতি প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা সেজে গেছেন এমন অভিযোগ পাওয়া গেছে। ওই ভুয়া সনদের বদৌলতেই তিনি নিয়মিত মুক্তিযোদ্ধা ভাতা গ্রহণসহ সরকারী নানা সুযোগ সুবিধা গ্রহণ করে চলেছেন বলে অভিযোগে জানা গেছে।
মেলান্দহের কোনামালঞ্চ গ্রামের বাসিন্দা একজন প্রকৃত বীর মুক্তিযোদ্ধা মোশারফ হোসেন ও পার্শ্ববর্তী দিলালের পাড় গ্রামের বাসিন্দা বীরমুক্তিযোদ্ধা হামিদুল হক জানান প্রকৌশলী মোহাম্মদ মুসা স্বাধীনতা যুদ্ধের পুরো সময়টায় নিজ বাড়িতেই অবস্থান করেছে এবং সে কখনোই মুক্তিযুদ্ধে অংশ গ্রহণ করে নাই এবং কি তাহার সাথে মুক্তিযুদ্ধের সময় কখনো দেখা হয় নাই বা কোন প্রকার যোগাযোগ হয় নাই।
আসলে সে ভুয়া সনদের একজন ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা বলে আমরা মনে করি। কোনামালঞ্চ গ্রামের মরহুম সাহাব উদ্দীন জীবদ্দশায় নিজস্ব জমিতে তার স্ত্রীর আমেনা বেগমের নামানুসারে কোনামালঞ্চ আমেনা দাখিল মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করেন। সেই সুবাদে পিতার অবর্তমানে বিগত সরকারের শুরুতেই প্রকৌশলী মোহাম্মদ মুসা দলীয় প্রভাব খাটিয়ে প্রথমে মাদ্রাসার প্রতিষ্ঠাতা সদস্য এবং পরে রাতারাতি ওই মাদ্রাসা পরিচালনা কমিটির সভাপতি বনে যান। সেইদিন থেকে গত ১৫ বছর ধরে কোন রকম কাউন্সিল ছাড়াই জোর পূর্বক তিনি মাদ্রসাটির সভাপতির পদ আকরে ধরে আছেন। আর সভাপতির পদে থেকে মাদ্রসার প্রধান শিক্ষকসহ অন্যান্য শিক্ষককে চাকুরী থেকে অপসারনের ভয় দেখিয়ে যেতেন। মাদ্রাসার সীমানাভুক্ত প্রায় ১০টি মেহগনি গাছ বিনা রেজুলেশনে বিক্রি করে টাকা আত্মসাৎ করেছেন।
এছাড়াও তিনি ২০১৯ সালে প্রধান শিক্ষককে নানা ভয়ভীতি দেখিয়ে মাদ্রাসা তহবিলের ব্যাংক হিসাব থেকে দুই লক্ষ টাকা উত্তোলন করে আত্নসাত করেছেন। যাহার হিসাব তিনি নিজ ক্ষমতা বলে দেন নাই।যাহা পরবর্তী ২০২২ ইং সালে ম্যানেজিং কমিটির চাপে রেজুলেশনে আনেন। রেজুলেশন ও সভা নং-৬/২২ তারিখ ২১/০৯/২০২২ইং।তিনি সভাপতি হওয়ার পর হইতেই মাদ্রাসার শিক্ষক কর্মচারীদের মাঝে গ্রুপিং সৃষ্টি করেন।
এছাড়াও তিনি তাহার মতের ভিন্ন মতাবলম্বী শিক্ষক কর্মচারীদের নানা ভাবে হয়রানি করেন। শোকজ দেওয়া, সময়মত টাইম স্কেল প্রদান না করা,বেতন ভাতা বন্ধ সহ সাময়িক বরখাস্ত করণ ছিলো রুটিন মাফিক কাজ যাহার ফলে বেশ কয়েকজন শিক্ষক অত্র মাদ্রাসা ছেড়ে অন্যত্র চলে যায়। মাদ্রাসার তহবিলে টাকা থাকা সত্বেও তাহার দ্বারা মাদ্রাসার কোন উন্নয়ন মূলক কাজ করা সন্ভব হয় নাই। যার কারণে ম্যানেজিং কমিটির সংখ্যা গরিষ্ঠ সদস্য ০৫/০৮/২০২৩ইংতারিখে শিক্ষক কর্মচারী একমত পোষণ করে ১৯/০৭/২০২৩ইং তারিখে তাহার অব্যাহতি চেয়ে রেজুলেশন করা হয় এবং সেই আলোকে মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডে পাঠানো হয়।কিন্তুু স্থানীয় এমপি ও সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যানের আত্মীয় হওয়ার এ বিষয়ে বেশিদূর অগ্রসর সন্ভব হয় নাই। বোর্ডের নির্দেশ অমান্য করায়ও তাহার একগুয়েমির কারণে ইতিপূর্বে উচ্চ আদালত কর্তৃক তাহার কমিটি একবার বাতিল করা হয়।
এই বিষয়ে কোনা মালঞ্চ দাখিল মাদ্রাসার নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক শিক্ষক এই ঘটনার কথা স্বীকার করেন। তবে তাহারা চাকরির সুবাদে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক।
এই বিষয়ে বীর মুক্তিযোদ্ধা মোশাররফ হোসেন জানান, প্রকৌশলী মোহাম্মদ মুসা স্কুলে আমার সহপাঠী ছিলেন তিনি যখন বড় হয়ে প্রকৌশলীতে পড়াশোনা করেন তখন থেকেই তার সাথে আমার তেমন যোগাযোগ নেই তিনি কখন মুক্তিযুদ্ধে অংশ গ্রহণ করেছেন তা আমার জানা নাই। আমি একজন প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে বলতে চাই তিনি মুক্তিযুদ্ধে যেহেতু অংশ গ্রহণ করে নাই সুতরাং তিনি একজন ভূয়া সনদের মুক্তিযোদ্ধা বলে আমি মনে করি।
এ বিষয়ে বীর মুক্তিযোদ্ধা হামিদুর রহমান বলেন, ১৯৭১ সালে আমি মুক্তিযুদ্ধে অংশ গ্রহণ করে বাহিরে ছিলাম। ১৬ ডিসেম্বরে আমার নিজ বাড়িতে ফিরে আসি এবং আমি অস্ত্র জমা দিয়ে যুদ্ধের পর থেকে আমি ময়মনসিংহ আনন্দ মোহন কলেজ থেকে এইচএসসি পাশ করে পরবর্তীতে আমি জামালপুর আশেক মাহমুদ কলেজ থেকে ডিগ্রি পাশ করে নিজ বাড়িতেই থেকে বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে চাকরি করি। আমার সহযোদ্ধা বীর মুক্তিযোদ্ধা মোশাররফ হোসেনের কাছে জানতে পেরেছি যে, প্রকৌশলী মোহাম্মদ মুসা মুক্তিযুদ্ধে অংশ গ্রহণ করে নাই। পরবর্তীতে সে নাকি মুক্তিযোদ্ধার সনদ নিয়ে মুক্তিযোদ্ধা হয়েছেন। আমি চাই বাংলাদেশে নামধারী এই ধরনের মুক্তিযোদ্ধাদের সয়লাব থেকে মুক্তিযোদ্ধাদের অনুপ্রবেশ থেকে দুর করে সরকার রাষ্ট্রীয়ভাবে সঠিক তদন্ত করে ভূয়া সনদে মুক্তিযোদ্ধাদের সনদ বাতিল করে প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধাদের সঠিক তালিকা তৈরি করে লিপিবদ্ধ করবেন বলে তিনি আশাবাদী।
এই বিষয়ে কোনামালঞ্চ মাদ্রাসার দাতা ও প্রতিষ্ঠাতা প্রকৌশলী মোহাম্মদ মুসা বলেন, আমি একজন প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা আমি ১৯৭০ সালে এইচএসসি পাশ করে ১৯৭০ সালেই আমি চট্টগ্রাম ইন্জিনিয়ারিং কলেজে ভর্তি হই।পরে ১৯৭১ সালে দেশে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে আমি পড়াশুনা ফেলে দিয়ে ভারতে চলে গিয়ে সেখানে মাহিন্দ্রগন্জে মুক্তিযুদ্ধের ক্যাম্পে ট্রেনিং করে মুক্তিযুদ্ধে অংশ গ্রহণ করি।সেখানে ১১নং সেক্টর অধীনে আমি মুক্তিযুদ্ধে অংশ গ্রহণ করি। ঐ সময় আমার সাথে মুক্তিযুদ্ধে অংশ গ্রহণ করেন ও পরিচয় হয় বীর মুক্তিযোদ্ধা আলহাজ্ব আব্দুল মান্নান কমান্ডার, বীর মুক্তিযোদ্ধা আনোয়ার হোসেন কমান্ডার তাদের সহযোগিতায় আমি কামালপুর বর্ডার পার হয়ে বাংলাদেশে এসে বিভিন্ন জায়গায় অপারেশনে অংশ গ্রহণ করি এবং মুক্তিযুদ্ধ করি। পরবর্তীতে যুদ্ধের সময় জামালপুর জেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের সাবেক কমান্ডার বীর মুক্তিযোদ্ধা শফিকুল ইসলাম খোকা ভাইয়ের সাথে পরিচয় হয় এবং তিনি আমাকে সহযোগিতা করেন। সুতরাং আমি একজন প্রকৃত সনদের মুক্তিযোদ্ধা। আমি স্বাধীনতা যুদ্ধের পর আমি চাকরি করা অবস্থায় আমার নিজ এলাকায় আমার মায়ের নামে কোনা মালঞ্চায় একটি মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করি যার নাম কোনামালঞ্চ আমেনা দাখিল মাদ্রাসা । যার প্রতিষ্ঠাতা আমি একজন ও আমার পিতা একজন এবং ঔ মাদ্রাসার যৌথ দাতা আমি ও আমার পিতা শাহাব উদ্দিন তালুকদার। ১ নং দাতা আমি ও ২নং দাতা আমার পিতা মরহুম শাহাব উদ্দিন তালুকদার। ঔ মাদ্রাসার জমি দাতা হিসেবে প্রায় ৮৭ শতাংশ জমি দান করেন আমার পিতা সাহাব উদ্দিন তালুকদার। আমি প্রকৌশলী মোহাম্মদ মুসা বিভিন্ন সময়ে মোট প্রায় ৯০ শতাংশ জমি ঔ মাদ্রাসায় দান করি। অত্র মাদ্রাসার প্রতিষ্ঠার পর পর্যায়ক্রমে ৩টি টিনসেড ঘর নির্মাণ করা হয় আমার নিজ অর্থায়নে।
একজন মাদ্রাসা শিক্ষক সরকারি নিয়ম বহির্ভূতভাবে ম্যানেজিং কমিটির স্বাক্ষর জালিয়াতি করে ৮ বছরের জায়গায় ৩ বছর চাকরি করে ২বার টাইম স্কেল নিয়েছে যাহা নিয়মবহির্ভূত। এই সরকারি নিয়ম ভঙ্গ করায় আমি এর বিরুদ্ধে দুর্নীতির প্রতিবাদ করায় তারা আমার বিরুদ্ধে আন্দোলন করে এবং হাইকোর্টে রিট করে। শুধু তাই নয় এই মাদ্রাসা কয়েকটি মামলা দায়ের করায় প্রতিষ্ঠানের অনেক ছাত্র /ছাত্রী কমে গেছে এবং মাদ্রাসাকে তারা ধ্বংস করতে যাচ্ছেন। অত্র মাদ্রাসার সুপার দীর্ঘ দিন যাবৎ অসুস্থ অবস্থায় আছে বর্তমানে তিনি ভারসাম্যহীন হয়ে গেছে। এই ইতিপূর্বে মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার মাদ্রাসা সুপার কে ২বার চিঠি দিয়ে তাঁকে শোকজ করেছেন। বর্তমানে এই মাদ্রাসার সুপার অসুস্থতার কারণে মাদ্রাসায় তেমন একটা উপস্থিতি থাকতে না পারায় তাকে দিয়ে কতিপয় শিক্ষক যখন যেখানে খুশি সেখানে খেয়াল খুশি মতে মাদ্রাসার বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ কাজে কাগজে কলমে সই করে নেয়। একটি স্বার্থান্বেষী মহল আমার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করে মিথ্যাচার করেছে। মাঝে মধ্যে আমাকে মাদ্রাসায় যেতে বারণ করেন এমন কি আমাকে মারার জন্য হুমকি প্রদান করেন। অত্র মাদ্রাসার দাবিদার প্রতিষ্ঠাতা ও দাতা প্রকৌশলী মোহাম্মদ মুসা আরো বলেন, বর্তমানে আমি সিলেটে চাকরির সুবাদে অত্র প্রতিষ্ঠানের ম্যানেজিং কমিটির সদস্য আমার ভাতিজার কাছে মাদ্রাসার উন্নয়নের গাছ বিক্রির টাকা ও মাদ্রাসার একাউন্ট থেকে তোলা দুই লাখ টাকা ম্যানেজিং কমিটির মৌখিক অনুমতিতে ক্রমে মাদ্রাসার উন্নয়নের কাজে গচ্ছিত রাখা আছে। তিনিই সেই মাদ্রাসার উন্নয়নের কাজ করবেন বলে জানান।
তবে কোনামালঞ্চ দাখিল মাদ্রাসার শিক্ষক, প্রতিবেশী মুক্তিযোদ্ধা ও স্থানীয় প্রতিবেশীরা জানান,অবিলম্বে প্রকৌশলী মোহাম্মদ মুসার বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ জরুরি ভিত্তিতে তদন্ত করে অবিলম্বে মাদ্রাসার কমিটি থেকে অপসারণ করে নতুন কমিটি গঠন করা হউক। এছাড়াও ভূয়া মুক্তিযোদ্ধা মোহাম্মদ মূসার সনদ বাতিল করে তার বিরুদ্ধে অবিলম্বে আইনানুসারে ব্যবস্হা গ্রহণ করা হবে এমনটাই প্রত্যাশা এলাকাবাসীর।