নিজস্ব প্রতিবেদক :
দ্বিপাক্ষিকতা বা দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক বলতে দুটি সার্বভৌম রাষ্ট্রের মধ্যকার রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক এবং সাংস্কৃতিক সম্পর্ক পরিচালনা করা বোঝায়। একপাক্ষিকতা বা বহুপাক্ষিকতা যেখানে যথাক্রমে এক দেশ কিংবা বহুদেশ নিয়ে কাজ করে, দ্বিপাক্ষিকতা সেখানে দুটি দেশ নিয়ে কাজ করে। যখন দুটি রাষ্ট্র একে অপরকে সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেয় এবং কূটনৈতিক সম্পর্ক উন্নয়ন করতে চায়, তখন তারা আলোচনা ও সহযোগিতা এগিয়ে নিয়ে যাবার জন্য কূটনৈতিক প্রতিনিধি আদান-প্রদান করে। এটি দুটি রাষ্ট্র কর্তৃক গৃহীত চুক্তি, যা পারস্পরিক সম্মতির মাধ্যমে গঠিত হয়। দুটি রাষ্ট্রের মধ্যে স্বাক্ষরিত অর্থনৈতিক চুক্তি, যেমন মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (ফ্রী ট্রেড এগ্রিমেন্টস বা এফটিএ) কিংবা বৈদেশিক প্রত্যক্ষ বিনিয়োগ (ফরেইন ডিরেক্ট ইনভেস্টমেন্ট বা এফডিআই) প্রভৃতি হল দ্বিপাক্ষিকতার সাধারণ উদাহরণ। যেহেতু অধিকাংশ অর্থনৈতিক চুক্তি রাষ্ট্রদ্বয়ের নির্দিষ্ট বৈশিষ্ট্যের দিকে খেয়াল রেখেই তৈরি করা হয়, সেহেতু প্রতি ক্ষেত্রেই নির্দিষ্ট কিছু পার্থক্য বিদ্যমান থাকে। এ কারণে দ্বিপাক্ষিকতার মাধ্যমে চুক্তিভুক্ত রাষ্ট্র অধিক উপযোগী সুবিধা লাভ করে থাকে। এ ক্ষেত্রে বহুপাক্ষিক কৌশলের চেয়ে লেনদেনের খাতে অধিক ব্যয় হয়ে থাকে, তবুও সার্বিকভাবে দ্বিপাক্ষিকতা লাভজনক। দ্বিপাক্ষিক কৌশলে উভয় পক্ষই মধ্যস্থতার মাধ্যমে নতুন চুক্তি করে থাকে। যখন উভয়ের জন্যই লেনদেনে ব্যয় কম হয় এবং অর্থনীতির ভাষায় উৎপাদক উদ্বৃত্তি থাকে, তখনই চুক্তি সম্পাদিত হয়। অনেক ক্ষেত্রে বৃহত্তর লাভের উদ্দেশ্যে আপাতভাবে অলাভজনক চুক্তিও সম্পাদিত হয়ে থাকে। বাংলাদেশ সরকার বর্তমানে বিভিন্ন দেশের সাথে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য সম্পর্ক বৃদ্ধিতে জোর দিয়েছে। অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি অর্জনের জন্য এর অবশ্য কোন বিকল্প নেই। সম্প্রতি মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মালদ্বীপের প্রেসিডেন্ট ইবরাহিম মোহাম্মদ সলিহের সাথে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও সংযোগের উন্নয়নে ফলপ্রসূ দ্বিপক্ষীয় আলোচনা করেছেন বলে জানা গেছে। এটি দু’ দেশের মধ্যে পারস্পরিক সম্পর্ক বৃদ্ধির পাশাপাশি বাণিজ্য সম্প্রসারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে আশা করা যাচ্ছে।
প্রতিবেশী ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের প্রবৃদ্ধির হার ১১ শতাংশের বেশি। ২০১৮ সালে ভারতে ৯১ কোটি ৬০ লাখ ডলারের পণ্য রফতানি করে বাংলাদেশ। আমদানি হয় প্রায় ৮৯৩ কোটি ডলারের পণ্য। দ্বিপক্ষীয় এ বাণিজ্যের সিংহভাগই স্থলপথনির্ভর। তবে স্থলপথ ব্যবহার করে বাণিজ্যের জন্য অবকাঠামোগত দুর্বলতা দুই দেশেই বিদ্যমান। যার কারণে গড়ে উঠছে না কার্যকর দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য। ঢাকা-কলকাতা রুট দিয়ে ভারত-বাংলাদেশ দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য নিয়ে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) করা এক প্রতিবেদনে এমন তথ্য উঠে এসেছে। অপ্রশস্ত ও যানজটপ্রবণ সড়ক, বন্দরগুলোর অপ্রতুল সুযোগ-সুবিধা আর প্রযুক্তিগত দুর্বলতার কারণে রুটটিতে কার্যকর দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য সম্প্রসারণে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।এডিবির প্রতিবেদনের সঙ্গে একমত পোষণ করেছেন আমদানি-রফতানিকারকরাও। তারা বলছেন, বিদ্যমান অবকাঠামো ব্যবহার করে ভারত থেকে পণ্য আমদানি কিংবা রফতানি করতে ক্ষেত্রবিশেষে এক মাস বা তার চেয়ে বেশি সময় লেগে যায়, যা দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য সম্প্রসারণে বড় বাধা। বাংলাদেশ-ভারতের মধ্যে আমদানি-রফতানির জন্য সড়ক, রেল ও আকাশপথ এবং সমুদ্র ও অভ্যন্তরীণ নৌপথ ব্যবহার হয়। ভারত থেকে বাংলাদেশে যেসব পণ্য আসে তার প্রায় ৩৮ শতাংশ পরিবহন হয় সড়ক ও রেলে। অন্যদিকে বাংলাদেশ থেকে ভারতে রফতানি হওয়া এক-তৃতীয়াংশের বেশি পণ্য পরিবহন হয়। ভারত থেকে তুলা, খাদ্যশস্য, গাড়ি, যন্ত্রপাতি, জ¦ালানি তেল, বিভিন্ন শিল্পের কাঁচামালের মতো পণ্যগুলো বাংলাদেশে আমদানি করা হয়। অন্যদিকে ফ্যাব্রিক, গার্মেন্টস, অ্যাপারেল পণ্যসহ বিভিন্ন ধরনের সবজি ভারতে রফতানি করে বাংলাদেশ। এসব পণ্যের একটা বড় অংশ পরিবহন করা হয় ঢাকা-কলকাতা রুট দিয়ে। ঢাকা-কলকাতা দিয়ে বাণিজ্য করতে গিয়ে ব্যবসায়ীরা সবচেয়ে বেশি সমস্যায় পড়েন পণ্য পরিবহনে। রুটটির বেশির ভাগ সড়ক ভারী যানবাহন চলাচলের জন্য উপযুক্ত নয়, যা পণ্য পরিবহনের গতি কমিয়ে দেয়। আরেকটি বড় সমস্যা যানজট। এ কারণে একটি কেন্দ্র থেকে সীমান্ত পর্যন্ত পণ্য পৌঁছাতেও অনেকটা সময় লেগে যায়। সেতু না থাকায় অনেক জায়গায় ফেরির জন্য পণ্যবাহী যানবাহনগুলোকে দীর্ঘ সময় অপেক্ষায় থাকতে হয়। রেলপথে এসব সমস্যা না থাকলেও শুধু একমুখী হওয়ার কারণে তা-ও বাণিজ্য সম্প্রসারণে খুব একটা ভূমিকা রাখতে সক্ষম হচ্ছে না। বর্তমানে রেলপথ ব্যবহার করে কেবল পণ্য আমদানির সুযোগ পাচ্ছেন বাংলাদেশী ব্যবসায়ীরা। রফতানির ক্ষেত্রে ভরসা সড়ক, নৌ ও আকাশপথ। পণ্য খালাসের জন্য যেসব উপকরণ ও সুযোগ-সুবিধা দরকার, ঢাকা-কলকাতা রুটের স্থলবন্দরগুলোয় সেসবের স্বল্পতার কথা প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে এডিবি। বন্দরে পৌঁছার পর একটি পণ্যবাহী ট্রাককে প্রথম সমস্যায় পড়তে হয় পার্ক করতে গিয়ে। পার্কিংয়ের জায়গা পেতেই লেগে যায় কয়েক ঘণ্টা। বর্ডার ক্রসিং পয়েন্ট (বিসিপি) সুবিধা পেতে কয়েক ঘণ্টা থেকে কয়েক দিন পর্যন্ত সময় লাগে। অনেক বন্দরে আবার কোল্ড স্টোরেজ সুবিধা নেই। ফলে পচনশীল পণ্য আমদানি-রফতানি কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। এসবের বাইরে বন্দরে পর্যাপ্ত স্বাস্থ্যসেবা, বিশ্রামাগার, রেস্টুরেন্ট সুবিধাও অপ্রতুল।
বন্দরের কাস্টমস ব্যবস্থাপনায় কিছু আধুনিকায়নের কাজ চললেও বর্তমানে ঢাকা-কলকাতা রুটের বন্দরগুলোর বেশির ভাগ কাজ হচ্ছে পুরনো পদ্ধতিতে। ফলে পণ্য খালাস করতে অনেকটা সময় চলে যায়।
বেনাপোলে বর্তমানে যে অবস্থা, একটি বড় কনটেইনার সেখানে এলে তা খালাস করতে এক মাসের মতো সময় লেগে যাওয়ার কথা জানান এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি মোহাম্মদ হাতেম। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, কিছু পণ্য আছে, যেগুলো অগ্রাধিকার ভিত্তিতে খালাস হয়। কিন্তু বেশির ভাগ পণ্যই খালাসে এক মাসের বেশি সময় লেগে যাচ্ছে। খালাসের ক্ষেত্রে বেনাপোলে খুব একটা সমস্যা হয় না। সমস্যাটা বেশি পেট্রাপোলে। সড়ক অবকাঠামোর কথা যদি বলি, বাংলাদেশের দিকে কিছুটা ভালো হলেও ভারতের দিকের রাস্তাগুলো খুব করুণ অবস্থায় আছে। ফলে আমদানি-রফতানি বিশালভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে সমাধান হচ্ছে, দেশে যতগুলো স্থলবন্দর আছে প্রত্যেকটি খুলে দিতে হবে। যেসব পণ্যের জট বেশি লেগে আছে, সেগুলোকে অন্য বন্দর দিয়ে আমদানির সুযোগ করে দিতে হবে। পাশাপাশি দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য গতিশীল করতে প্রয়োজনীয় অবকাঠামো উন্নয়নের গুরুত্বের কথাও উল্লেখ করেন মোহাম্মদ হাতেম।
ঢাকা-কলকাতার মধ্যে পণ্য পরিবহনে তিনটি স্থলবন্দর বেশি ব্যবহূত হয়। স্থলবন্দরগুলো হলো বেনাপোল-পেট্রাপোল, ঘোজাডাঙ্গা-ভোমরা ও গেদে-দর্শনা। ঢাকা-কলকাতার মধ্যে যত পণ্য পরিবহন হয়, তার ৮০ শতাংশ বেনাপোল-পেট্রাপোল স্থলবন্দর ব্যবহার করে। বেনাপোল স্থলবন্দরে ৮০০ ট্রাক ও ৬০০-৭০০ চেসিস পার্কিংয়ের ব্যবস্থা রয়েছে। ইমপোর্ট ইয়ার্ডটি ২৫০ ট্রাক ধারণে সক্ষম। কোনো কোল্ড স্টোরেজ নেই। স্বাস্থ্যসেবাসহ বিভিন্ন সুবিধা এ বন্দরে অপ্রতুল। অন্যদিকে ভোমরা স্থলবন্দরে ৩০০ ট্রাক পার্ক করার সক্ষমতা রয়েছে। এখানেও কোল্ড স্টোরেজ নেই। অন্য সুবিধাগুলোও অপ্রতুল। একই অবস্থা বিরাজ করছে দর্শনা স্থলবন্দরেও। এসব স্থলবন্দর ব্যবহার করে ঢাকা-কলকাতার মধ্যে আমদানি-রফতানি করার ক্ষেত্রে তিনটি প্রধান চ্যালেঞ্জের কথা বলা হয়েছে এডিবির প্রতিবেদনে। পণ্য পরিবহন, সীমান্ত পারাপার ও কাস্টমস জটিলতায় রুটটিতে আমদানি-রফতানি কার্যক্রম গতি পাচ্ছে না।
সর্বশেষঃ
দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য সম্প্রসারণে জোর, বাধা দুর্বল অবকাঠামো
-
দৈনিক আইন বার্তা
- আপডেট সময়ঃ ০৭:৫২:৪৯ অপরাহ্ন, রবিবার, ২৬ ডিসেম্বর ২০২১
- ১৯২ বার পড়া হয়েছে
ট্যাগস :
জনপ্রিয় সংবাদ