• সোমবার, ০৪ মার্চ ২০২৪, ১১:১১ অপরাহ্ন
সর্বশেষ
অগ্নিকা- প্রতিরোধে পদক্ষেপ পর্যালোচনায় বিশেষজ্ঞ কমিটি গঠন হাইকোর্টের রমজানে পণ্যের দাম ঊর্ধ্বমুখী হওয়ার সুযোগ নেই: বাণিজ্য প্রতিমন্ত্রী ১০ মার্চের মধ্যে ১৫ টাকা কেজি দরে চাল পাবে ৫০ লাখ পরিবার: খাদ্যমন্ত্রী বীজে অনিয়মের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে ডিসিদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে: কৃষিমন্ত্রী ধানম-ির টুইন পিক টাওয়ারের ১২ রেস্তোরাঁ সিলগালা বান্দরবানে সাংবাদিকদের ২ দিন ব্যাপী আলোকচিত্র ও ভিডিওগ্রাফি প্রশিক্ষণ মজুদদারির বিরুদ্ধে ডিসিদের কঠোর হওয়ার নির্দেশ প্রধানমন্ত্রীর ক্লিনিক-ডায়াগনস্টিকে অভিযানে ডিসিদের সহায়তা চাইলেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী সংসদে অনির্বাচিত কেউ আসতে পারে না : স্পিকার ইসলামি শিক্ষা কেন্দ্রে মাওলানা আব্দুলাহ আনোয়ার আটক

করোনায় দেশে আয়-বৈষম্য বেড়েছে

Reporter Name / ১০৫ Time View
Update : শনিবার, ১৮ ডিসেম্বর, ২০২১

নিজস্ব প্রতিবেদক :
দেড় বছরের বেশি সময় ধরে চলমান করোনা মহামারি মানুষের জীবন ও জীবিকার ওপর নানাভাবে প্রভাব ফেলেছে। জীবিকার ক্ষেত্রে মধ্য ও নিম্নবিত্তের ক্ষতি সবচেয়ে বেশি। কারণ লকডাউন ও অর্থনৈতিক কর্মকা-ে স্থবিরতার ফলে বহু মানুষ চাকরি হারিয়েছেন, অনেকের ব্যবসা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় তারাও হারিয়েছেন আয়ের উৎস। সবচেয়ে বিপাকে পড়েছেন অনানুষ্ঠানিক খাতের কর্মজীবীরা তথা স্বল্প আয়ের মানুষ। তবে লক্ষণীয় বিষয় হলো, করোনা মহামারিতে বিত্তবানদের ক্ষতি হয়েছে তুলনামূলক কম; বরং অনেক ক্ষেত্রে তাদের আয় বেড়েছে। এ তথ্যের সত্যতা পাওয়া যায় বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ প্রতিবেদনে। প্রতিবেদনে দেখা যাচ্ছে, করোনার প্রাদুর্ভাবের আগে গত বছরের মার্চ পর্যন্ত দেশে ব্যক্তি ও প্রাতিষ্ঠানিক কোটিপতি আমানতকারীর সংখ্যা ছিল ৮২ হাজার ৬২৫, চলতি বছরের মার্চ শেষে এ সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৯৪ হাজার ২৭২-এ। অর্থাৎ করোনাকালের এক বছরের হিসাবে দেখা যাচ্ছে, দেশে নতুন কোটিপতি আমানতকারী বেড়েছে ১১ হাজার ৬৪৭ জন। অন্যদিকে, একাধিক বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠানের জরিপ অনুযায়ী, করোনার আঘাতে দেশে নতুন করে ২ কোটি ৪৫ লাখ মানুষ দরিদ্র হয়েছে। গবেষণায় দেখা গেছে, দেশের মোট আয়ের ৩৭.৮০ শতাংশ এখন অতি ধনীদের হাতে, যা লকডাউনের আগে ছিল ২৭.৮২ শতাংশ। কাজেই এটা স্পষ্ট যে, করোনা মহামারির কারণে দেশে আয়-বৈষম্য প্রকট হয়ে উঠছে। দেশের আর্থসামাজিক অবস্থার নিরিখে এ প্রবণতা মোটেই শুভ লক্ষণ নয়। বেশকিছু সামাজিক ও অর্থনৈতিক উন্নয়ন সূচকে আমাদের অগ্রগতি হয়েছে। যেমন বৃদ্ধি পাচ্ছে মাথাপিছু জাতীয় আয়, গড় আয়ু ও শিক্ষার হার। আবার হ্রাস পেয়েছে শিশুমৃত্যু ও মাতৃমৃত্যুর হার। এ ছাড়া নারী শিক্ষা, নারীর ক্ষমতায়ন ও স্বাস্থ্যসেবায় বাংলাদেশের অগ্রগতি চোখে পড়ার মতো। কিন্তু ধনী- দরিদ্রের ব্যবধান বা আয়বৈষম্যের ক্ষেত্রে সমাজের চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। সম্প্রতি আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে পরিকল্পনামন্ত্রী বৈষম্য বাড়ার কথা স্বীকার করে সমাধানের পথ খোঁজার আহ্বান জানিয়েছেন। বিশেষজ্ঞরা স্বাস্থ্যসেবা, সর্বজনীন শিক্ষা ও ছোট উদ্যোক্তাদের সমস্যা দূর করার উদ্যোগ নেয়ার পরামর্শও দিয়েছেন। করোনার প্রভাবে নতুন করে দরিদ্রদের জন্য সামাজিক নিরাপত্তা কার্যক্রম আরো বিস্তৃত করা প্রয়োজন। সরকার উদ্যোগ নিয়েছে, বরাদ্দও বাড়িয়েছে কিন্তু কার্যক্রমে স্বচ্ছতা নিশ্চিত না হওয়া ও তথ্যস্বল্পতায় ক্ষতিগ্রস্তদের কাছে সহায়তা পৌঁছাচ্ছে না। টেকসই অর্থনৈতিক উন্নয়ন নিশ্চিত করতে হলে আয় ও সম্পদবৈষম্যের রাশ টেনে ধরতে হবে। অতিধনীদের সংখ্যা দ্রুতই বেড়ে চলেছে। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সুফল নিম্ন আয় ও পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর কাছে অনেকাংশেই পৌঁছাচ্ছে না বললে হয়তো ভুল হবে না, আর তাই বাড়ছে বৈষম্য। অর্থনীতির ‘চুইয়ে পড়া তত্ত্ব’, যার মাধ্যমে প্রবৃদ্ধি বা উন্নয়নের সুফল সাধারণ জনগোষ্ঠীর কাছে পৌঁছার কথা, তা আসলে বাংলাদেশসহ উন্নয়নশীল দেশগুলোয় সেভাবে পরিলক্ষিত হচ্ছে না। প্রবৃদ্ধির সঙ্গে ক্রমবর্ধমান বৈষম্য বিশ্লেষণের পরিপ্রেক্ষিতে অনেক সময় মনে করা হয়, প্রবৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে উন্নয়নের প্রাথমিক পর্যায়ে আয়বৈষম্য বাড়লেও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এর সুষম বণ্টন হবে। ফলে ধীরে ধীরে কমবে বৈষম্য, অর্থনীতিতে যা ‘কুজনেট রেখা’ নামে পরিচিত। তবে বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, অর্থনীতির এ তত্ত্ব বাস্তবে প্রায়োগিকতার বিচারে অনেক ক্ষেত্রেই খাটে না, তাই প্রবৃদ্ধির পাশাপাশি বৈষম্যের বিষয়টি অধিকতর গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা জরুরি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বাংলাদেশের পরিপ্রেক্ষিতে এ আয়বৈষম্যের পেছনে রয়েছে বহু কারণ। তবে দেশের উন্নয়ন কর্মকা-ে মূলত উচ্চ প্রবৃদ্ধির ওপর গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। আর এ প্রবৃদ্ধিকেন্দ্রিক উন্নয়ন দর্শনের পরিপ্রেক্ষিতে এর গুণগত মান কিংবা সম্পদ বণ্টন ব্যবস্থার দিকে তুলনামূলকভাবে গুরুত্ব দেয়া হয়েছে কম। এ ছাড়া সময়ের সঙ্গে সঙ্গে অর্থনীতিতে কাঠামোগত রূপান্তর হলেও তা কর্মসংস্থানমুখী উচ্চ উৎপাদনশীল শিল্পায়নের পরিবর্তে মূলত নিম্ন আয় ও অনানুষ্ঠানিক সেবা খাতের দিকেই ঘটেছে। আর শিল্পায়ন মূলত হয়েছে নিম্ন মজুরির শ্রমিকনির্ভর পোশাক শিল্পকে কেন্দ্র করে। ফলে শিল্পায়নের ক্ষেত্রে বহুমুখীকরণ সেভাবে হয়ে ওঠেনি। বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান তেমন বাড়ছে না। একে কর্মসংস্থানহীন প্রবৃদ্ধি হিসেবে অভিহিত করা হচ্ছে। প্রতি বছর যে পরিমাণ তরুণ-তরুণী কর্মবাজারে প্রবেশ করেন, তাদের অধিকাংশ কাজ পাচ্ছেন না। এভাবে বেকারত্ব ক্রমেই বেড়ে চলেছে এবং এটা একটা গুরুতর সংকটে রূপ নিচ্ছে। করোনার কারণে সামষ্টিক অর্থনীতি ব্যাপকভাবে প্রভাবিত হয়েছে। করোনার সময়ে মানুষের আয় কমেছে। দেশে আয়বৈষম্যও বেড়েছে। এখানে সমন্বয়ের উদ্যোগ জরুরি। অনেক ছোট প্রতিষ্ঠান ঝুঁকিতে পড়েছে। যে কারণে পুষ্টি ও স্বাস্থ্য খাতে উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে। শিক্ষা খাতের চ্যালেঞ্জ বেড়েছে। ক্রমবর্ধমান আয়বৈষম্য সমস্যা মোকাবেলা করা দুরূহ কিন্তু অসম্ভব নয়। আয়বৈষম্যের লাগাম টেনে ধরতে চাইলে ‘বাজার ব্যর্থতা’ কেন হয়, তা ভালোভাবে বুঝে রাষ্ট্রের ভূমিকাকে যৌক্তিকভাবে পুনর্বিন্যস্ত করতে হবে। বাজার ব্যর্থ হয় গরিবের মানসম্মত শিক্ষা ও স্বাস্থ্য ব্যবস্থা গড়ে তুলতে, ব্যর্থ হয় পরিবেশ দূষণের মতো নেতিবাচক বাহ্যিকতাগুলো ঠেকাতে, ব্যর্থ হয় অর্থনৈতিক ও সামাজিক অবকাঠামো গড়ে তোলায়, ব্যর্থ হয় নানা রকম মনোপলি ও অলিগোপলির কারণে, ব্যর্থ হয় গণদ্রব্য বা ‘পাবলিক গুডস’ জোগান দিতে। মূলকথা হলো, রাষ্ট্রকে বৈষম্য নিরসনকারীর ভূমিকা নিতে হবে, যে রকম করা হয়েছে ভিয়েতনামে, গণচীনে কিংবা ইউরোপের কল্যাণরাষ্ট্রগুলোয়। সরকারকে রাজস্ব সংগ্রহ করতে হবে প্রধানত সমাজের উচ্চ মধ্যবিত্তদের আয়কর ও সম্পত্তি কর থেকে। সরকারি ব্যয়ে প্রধান অগ্রাধিকার দিতে হবে বৈষম্যহীন ও মানসম্পন্ন প্রাথমিক শিক্ষায়, গরিবের জন্য ভালো মানের স্বাস্থ্য ব্যবস্থা গড়ে তোলায়, মানসম্পন্ন ভৌত অবকাঠামো নির্মাণে, পরিবেশ দূষণ নিয়ন্ত্রণে, গরিবের খাদ্যনিরাপত্তা বিধানে। আয় বৈষম্য মাপার যে সূচক সেই জিনি বা গিনি সহগ ১৯৭৩ সালে বাংলাদেশে ছিল ০.৩৬। জিনি সহগ যত বেশি তা তত বেশি আয় বা সম্পদ বৈষম্যেরই ইঙ্গিত দেয় এবং এই সূচক ০.৫ এর কাছাকাছি বা তার থেকে বেশি হলে বুঝতে হবে সেই দেশ বা সমাজে চরম বৈষম্য আছে। উদ্বেগের বিষয় ২০২০ সালে বাংলাদেশে জিনি সহগ হয়েছে ০.৫২। এর চার বছর আগেও অর্থাৎ ২০১৬ সালে এটা ছিল ০.৪৮। দেশের আয় বৈষম্য দিন দিন যে প্রকট হচ্ছে সেটা এ থেকে সহজে অনুমান করা যায়। এর অর্থ কোথাও একটা বড় সমস্যা রয়ে গেছে। দেশের সম্পদ ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের সুফল যেন সবার কাছে সমানভাবে পৌঁছে যায় সেই লক্ষ্যে সরকারকে কাজ করতে হবে। পিছিয়েপড়া জনগোষ্ঠীকে উন্নয়নের অংশীদারিত্ব নিশ্চিত করতে হবে। মহামারীর কারণে এই কাজটি আরও জরুরি হয়ে দাঁড়িয়েছে।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category