ঢাকা, মঙ্গলবার, ০১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ই-পেপার

কমিশন-বাণিজ্যের অভিযোগে জিম্মি রেলের পূর্বাঞ্চল

রিপন চৌধুরী বিশেষ প্রতিনিধি
  • আপডেট সময়ঃ ০৩:৫০:০৭ অপরাহ্ন, সোমবার, ৩১ অগাস্ট ২০২৬
  • / ২২ বার পড়া হয়েছে

পুরোনো ফাইলে ৩%, নতুন ফাইলে ৫%—নগদ ছাড়া ফাইল ছাড়েন না প্রধান প্রকৌশলী, দুদকে অভিযোগ

বাংলাদেশ রেলওয়ের পূর্বাঞ্চলে অবকাঠামো উন্নয়ন ও রক্ষণাবেক্ষণের কাজ ঘিরে কমিশন-বাণিজ্যের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছেন পূর্বাঞ্চলের প্রধান প্রকৌশলী মো. তানভীরুল ইসলাম। ঠিকাদারদের দাবি, পুরোনো ফাইলে ৩ শতাংশ এবং নতুন ফাইলে ৫ শতাংশ পর্যন্ত কমিশন না দিলে তাঁর দপ্তর থেকে ফাইল ছাড়ানো কঠিন। শুধু প্রকল্পের বিল নয়, বিভিন্ন উন্নয়নকাজের বরাদ্দ ও অনুমোদন ঘিরেও কমিশন আদায়ের অভিযোগ রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে।
এদিকে মো. তানভীরুল ইসলামের বিরুদ্ধে দুর্নীতি, অনিয়ম, সরকারি অর্থ আত্মসাৎ, অর্থ পাচার ও জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগ এনে দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) লিখিত অভিযোগ করেছেন সাইফুল ইসলাম নামের এক ব্যক্তি। অভিযোগে তাঁর প্রকল্প পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালনের সময়কার কর্মকাণ্ড তদন্তের পাশাপাশি বর্তমানে প্রধান প্রকৌশলী পদে পদায়নের ক্ষেত্রেও ঘুষ লেনদেনের অভিযোগ তদন্তের দাবি জানানো হয়েছে। তবে অভিযোগের বিষয়ে জানতে মো. তানভীরুল ইসলামের সঙ্গে একাধিকবার ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি। পরে এসএমএসের মাধ্যমে তিনি জানান, ‘আজকে মাননীয় মন্ত্রী মহোদয়ের সঙ্গে মিটিং আছি।’

রেলওয়ের পূর্বাঞ্চলের একাধিক ঠিকাদারের সঙ্গে কথা বলে কমিশন দাবির অভিযোগ পাওয়া গেছে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক প্রভাবশালী ঠিকাদার বলেন, “পুরোনো ফাইলে ৩ শতাংশ আর নতুন ফাইলে ৫ শতাংশ কমিশন দিতে হয়। নগদ টাকা না দিলে ফাইল আটকে থাকে।”
আরেক ঠিকাদারের অভিযোগ, তাঁর ছয় লাখ টাকার একটি উন্নয়নকাজের ফাইল অনুমোদনের ক্ষেত্রে ৫ শতাংশ কমিশন দাবি করা হয়েছিল। তাঁর ভাষ্য, কমিশনের টাকা না দেওয়া পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট ফাইলে স্বাক্ষর করা হয়নি।

ঠিকাদারদের আরও অভিযোগ, চিফ ইঞ্জিনিয়ারের অধীন বিভিন্ন দপ্তরে কাজ করতে গিয়ে বিভিন্ন নামে ২৮ থেকে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত অর্থ ব্যয় করতে হয়। এর মধ্যে কমিশন, বিভিন্ন পর্যায়ের খরচ এবং অন্যান্য আনুষঙ্গিক অর্থ রয়েছে বলে তাঁদের দাবি।
অভিযোগকারীদের ভাষ্য, এ ধরনের অতিরিক্ত ব্যয়ের কারণে প্রকল্পের প্রকৃত কাজের জন্য বরাদ্দ অর্থ কমে যায়। ফলে অনেক ক্ষেত্রে কাজের গুণগত মান ও স্থায়িত্ব নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়।

রেলওয়ের পূর্বাঞ্চলের উন্নয়নকাজের বিভিন্ন বরাদ্দের ক্ষেত্রে নির্মাণসামগ্রীর মূল্য বাজারদরের তুলনায় কয়েকগুণ বেশি দেখানোর অভিযোগও রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, কাজের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট পরিদর্শন ও বিভিন্ন আনুষঙ্গিক ব্যয়ের বোঝাও ঠিকাদারদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয়।
ঠিকাদারদের দাবি, কমিশন ও অতিরিক্ত ব্যয়ের চাপের কারণে অনেক প্রকল্পে বরাদ্দের বড় অংশ প্রকৃত উন্নয়নকাজে ব্যয় করা সম্ভব হয় না। এতে সরকারি অর্থের অপচয়ের পাশাপাশি নিম্নমানের কাজ হওয়ার ঝুঁকি বাড়ছে।

অভিযোগের মধ্যে নতুন করে আলোচনায় এসেছে রেলওয়ের ট্র্যাক রক্ষণাবেক্ষণ ও পুনর্বাসন প্রকল্প। ২০২৫ সালের ১৭ জুলাই অনুমোদিত প্রকল্পে সরঞ্জামসহ মোট ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ১ হাজার ৭৬১ কোটি টাকা। এর মধ্যে ট্র্যাক মেরামতের জন্য প্রাক্কলিত ব্যয় অনুমোদিত হয়েছে ৮৮৩ কোটি ৭২ লাখ টাকা। প্রকল্পটি আটটি প্যাকেজে ভাগ করা হয়েছে।

অভিযোগ রয়েছে, এই প্রকল্পের পরিচালক হিসেবেও মো. তানভীরুল ইসলাম দায়িত্ব পাওয়ায় নিজের পছন্দের ঠিকাদারদের মধ্যে কাজ ভাগ করে দেওয়ার মাধ্যমে অনিয়মের সুযোগ তৈরি হতে পারে ।

সংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা, প্রকল্পের প্রতিটি প্যাকেজে স্বচ্ছতা ও প্রতিযোগিতামূলক দরপত্র নিশ্চিত করা না হলে বড় অঙ্কের সরকারি অর্থ অপচয় বা অনিয়মের ঝুঁকিতে পড়তে পারে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, প্রধান প্রকৌশলীর অধীন প্রকৌশলীদের মাধ্যমে বিভিন্ন উন্নয়নকাজ হাতে নেওয়া হয় এবং এসব কাজের বরাদ্দ থেকে কমিশন আদায়ের অভিযোগ রয়েছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ঠিকাদার বলেন, “ছোট অঙ্কের কাজ হলেও কমিশনের দাবি থেকে রেহাই নেই। কমিশন না দিলে ফাইল এগোয় না।”
ঠিকাদারদের অভিযোগ, কমিশন-বাণিজ্যের একটি অংশ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কাছেও পৌঁছে থাকে। তবে কার কাছে কী পরিমাণ অর্থ যায়—এমন অভিযোগের পক্ষে কোনো নথিপত্র বা স্বাধীন প্রমাণ পাওয়া যায়নি। এ কারণে বিষয়টি তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করার দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
দুদকে দেওয়া অভিযোগে বলা হয়েছে, মো. তানভীরুল ইসলাম বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব রেলওয়ে সেতু নির্মাণ প্রকল্প এবং আখাউড়া-লাকসাম প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে বিভিন্ন অনিয়ম ও দুর্নীতির মাধ্যমে বিপুল অর্থ আত্মসাৎ করেছেন। অভিযোগে তাঁর বিরুদ্ধে অর্থ পাচার ও জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।

অভিযোগে ওই দুই প্রকল্পে তাঁর দায়িত্ব পালনের সময়ের বিল ও নথিপত্র যাচাই করার দাবি জানানো হয়েছে। একই সঙ্গে প্রকল্প পরিচালক থাকা অবস্থায় গৃহীত সিদ্ধান্ত, ঠিকাদার নিয়োগ এবং প্রকল্পের বিভিন্ন বিল-ভাউচার তদন্তের দাবি জানানো হয়েছে।
মো. তানভীরুল ইসলামের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের বিষয়ে বাংলাদেশ রেলওয়ের মহাপরিচালক (ডিজি) আফজাল হোসেনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি এ বিষয়ে অতিরিক্ত মহাপরিচালক (অবকাঠামো) আল ফাত্তাহ মো. মাসউদুর রহমানের সঙ্গে কথা বলার পরামর্শ দেন।
পরে অতিরিক্ত মহাপরিচালক (অবকাঠামো) আল ফাত্তাহ মো. মাসউদুর রহমানের কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, “দুদকে করা অভিযোগের বিষয়ে আমি জানি না।”
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব রেলওয়ে সেতু প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক থাকাকালে কোনো অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, “একেকজন একেকভাবে অভিযোগ করতে পারে। আমি বিষয়টি খোঁজ নিয়ে দেখছি।”

বাংলাদেশ মানবাধিকার পরিষদের সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট সেলিম চৌধুরী বলেন, রেলওয়ের মতো একটি রাষ্ট্রীয় সেবামূলক প্রতিষ্ঠানে দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগ অত্যন্ত উদ্বেগজনক।

তিনি বলেন, “রেলওয়েতে যদি একটি সিন্ডিকেটের মাধ্যমে দুর্নীতির সুযোগ তৈরি হয় এবং দুর্নীতির অভিযোগ থাকা ব্যক্তিরাই গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পান, তাহলে প্রতিষ্ঠানটির স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হবে। বাংলাদেশ রেলওয়েকে লোকসানের হাত থেকে বাঁচাতে হলে দুর্নীতির অভিযোগগুলো নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নিতে হবে।”

তাঁর মতে, দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে রেলওয়েকে আধুনিক, জনবান্ধব ও কার্যকর সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানে পরিণত করা কঠিন হবে।

রেলওয়ের পূর্বাঞ্চলের প্রধান প্রকৌশলীর দপ্তর ঘিরে কমিশন-বাণিজ্য, প্রকল্প বাস্তবায়নে অনিয়ম, অতিরিক্ত দামে উপকরণ কেনা, ঠিকাদারদের কাছ থেকে অর্থ আদায় এবং প্রকল্পের অর্থ ব্যবহারে স্বচ্ছতার ঘাটতির যেসব অভিযোগ উঠেছে, সেগুলো তদন্তের দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট ঠিকাদার ও অভিযোগকারীরা।

তাঁদের দাবি, শুধু অভিযোগের ভিত্তিতে কাউকে দোষী সাব্যস্ত না করে দুদক ও রেলওয়ের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের উচিত প্রকল্পগুলোর নথি, বিল-ভাউচার, দরপত্র, কার্যাদেশ, কাজের পরিমাণ ও বাস্তব অগ্রগতি সরেজমিনে যাচাই করা। একই সঙ্গে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।
দেশের রেল যোগাযোগের উন্নয়নে সরকার যখন বিপুল অর্থ বিনিয়োগ করছে, তখন প্রকল্প বাস্তবায়নের প্রতিটি স্তরে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা না গেলে সেই বিনিয়োগের সুফল নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাবে।

ট্যাগস :

নিউজটি শেয়ার করুন

কমিশন-বাণিজ্যের অভিযোগে জিম্মি রেলের পূর্বাঞ্চল

আপডেট সময়ঃ ০৩:৫০:০৭ অপরাহ্ন, সোমবার, ৩১ অগাস্ট ২০২৬

পুরোনো ফাইলে ৩%, নতুন ফাইলে ৫%—নগদ ছাড়া ফাইল ছাড়েন না প্রধান প্রকৌশলী, দুদকে অভিযোগ

বাংলাদেশ রেলওয়ের পূর্বাঞ্চলে অবকাঠামো উন্নয়ন ও রক্ষণাবেক্ষণের কাজ ঘিরে কমিশন-বাণিজ্যের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছেন পূর্বাঞ্চলের প্রধান প্রকৌশলী মো. তানভীরুল ইসলাম। ঠিকাদারদের দাবি, পুরোনো ফাইলে ৩ শতাংশ এবং নতুন ফাইলে ৫ শতাংশ পর্যন্ত কমিশন না দিলে তাঁর দপ্তর থেকে ফাইল ছাড়ানো কঠিন। শুধু প্রকল্পের বিল নয়, বিভিন্ন উন্নয়নকাজের বরাদ্দ ও অনুমোদন ঘিরেও কমিশন আদায়ের অভিযোগ রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে।
এদিকে মো. তানভীরুল ইসলামের বিরুদ্ধে দুর্নীতি, অনিয়ম, সরকারি অর্থ আত্মসাৎ, অর্থ পাচার ও জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগ এনে দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) লিখিত অভিযোগ করেছেন সাইফুল ইসলাম নামের এক ব্যক্তি। অভিযোগে তাঁর প্রকল্প পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালনের সময়কার কর্মকাণ্ড তদন্তের পাশাপাশি বর্তমানে প্রধান প্রকৌশলী পদে পদায়নের ক্ষেত্রেও ঘুষ লেনদেনের অভিযোগ তদন্তের দাবি জানানো হয়েছে। তবে অভিযোগের বিষয়ে জানতে মো. তানভীরুল ইসলামের সঙ্গে একাধিকবার ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি। পরে এসএমএসের মাধ্যমে তিনি জানান, ‘আজকে মাননীয় মন্ত্রী মহোদয়ের সঙ্গে মিটিং আছি।’

রেলওয়ের পূর্বাঞ্চলের একাধিক ঠিকাদারের সঙ্গে কথা বলে কমিশন দাবির অভিযোগ পাওয়া গেছে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক প্রভাবশালী ঠিকাদার বলেন, “পুরোনো ফাইলে ৩ শতাংশ আর নতুন ফাইলে ৫ শতাংশ কমিশন দিতে হয়। নগদ টাকা না দিলে ফাইল আটকে থাকে।”
আরেক ঠিকাদারের অভিযোগ, তাঁর ছয় লাখ টাকার একটি উন্নয়নকাজের ফাইল অনুমোদনের ক্ষেত্রে ৫ শতাংশ কমিশন দাবি করা হয়েছিল। তাঁর ভাষ্য, কমিশনের টাকা না দেওয়া পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট ফাইলে স্বাক্ষর করা হয়নি।

ঠিকাদারদের আরও অভিযোগ, চিফ ইঞ্জিনিয়ারের অধীন বিভিন্ন দপ্তরে কাজ করতে গিয়ে বিভিন্ন নামে ২৮ থেকে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত অর্থ ব্যয় করতে হয়। এর মধ্যে কমিশন, বিভিন্ন পর্যায়ের খরচ এবং অন্যান্য আনুষঙ্গিক অর্থ রয়েছে বলে তাঁদের দাবি।
অভিযোগকারীদের ভাষ্য, এ ধরনের অতিরিক্ত ব্যয়ের কারণে প্রকল্পের প্রকৃত কাজের জন্য বরাদ্দ অর্থ কমে যায়। ফলে অনেক ক্ষেত্রে কাজের গুণগত মান ও স্থায়িত্ব নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়।

রেলওয়ের পূর্বাঞ্চলের উন্নয়নকাজের বিভিন্ন বরাদ্দের ক্ষেত্রে নির্মাণসামগ্রীর মূল্য বাজারদরের তুলনায় কয়েকগুণ বেশি দেখানোর অভিযোগও রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, কাজের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট পরিদর্শন ও বিভিন্ন আনুষঙ্গিক ব্যয়ের বোঝাও ঠিকাদারদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয়।
ঠিকাদারদের দাবি, কমিশন ও অতিরিক্ত ব্যয়ের চাপের কারণে অনেক প্রকল্পে বরাদ্দের বড় অংশ প্রকৃত উন্নয়নকাজে ব্যয় করা সম্ভব হয় না। এতে সরকারি অর্থের অপচয়ের পাশাপাশি নিম্নমানের কাজ হওয়ার ঝুঁকি বাড়ছে।

অভিযোগের মধ্যে নতুন করে আলোচনায় এসেছে রেলওয়ের ট্র্যাক রক্ষণাবেক্ষণ ও পুনর্বাসন প্রকল্প। ২০২৫ সালের ১৭ জুলাই অনুমোদিত প্রকল্পে সরঞ্জামসহ মোট ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ১ হাজার ৭৬১ কোটি টাকা। এর মধ্যে ট্র্যাক মেরামতের জন্য প্রাক্কলিত ব্যয় অনুমোদিত হয়েছে ৮৮৩ কোটি ৭২ লাখ টাকা। প্রকল্পটি আটটি প্যাকেজে ভাগ করা হয়েছে।

অভিযোগ রয়েছে, এই প্রকল্পের পরিচালক হিসেবেও মো. তানভীরুল ইসলাম দায়িত্ব পাওয়ায় নিজের পছন্দের ঠিকাদারদের মধ্যে কাজ ভাগ করে দেওয়ার মাধ্যমে অনিয়মের সুযোগ তৈরি হতে পারে ।

সংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা, প্রকল্পের প্রতিটি প্যাকেজে স্বচ্ছতা ও প্রতিযোগিতামূলক দরপত্র নিশ্চিত করা না হলে বড় অঙ্কের সরকারি অর্থ অপচয় বা অনিয়মের ঝুঁকিতে পড়তে পারে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, প্রধান প্রকৌশলীর অধীন প্রকৌশলীদের মাধ্যমে বিভিন্ন উন্নয়নকাজ হাতে নেওয়া হয় এবং এসব কাজের বরাদ্দ থেকে কমিশন আদায়ের অভিযোগ রয়েছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ঠিকাদার বলেন, “ছোট অঙ্কের কাজ হলেও কমিশনের দাবি থেকে রেহাই নেই। কমিশন না দিলে ফাইল এগোয় না।”
ঠিকাদারদের অভিযোগ, কমিশন-বাণিজ্যের একটি অংশ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কাছেও পৌঁছে থাকে। তবে কার কাছে কী পরিমাণ অর্থ যায়—এমন অভিযোগের পক্ষে কোনো নথিপত্র বা স্বাধীন প্রমাণ পাওয়া যায়নি। এ কারণে বিষয়টি তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করার দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
দুদকে দেওয়া অভিযোগে বলা হয়েছে, মো. তানভীরুল ইসলাম বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব রেলওয়ে সেতু নির্মাণ প্রকল্প এবং আখাউড়া-লাকসাম প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে বিভিন্ন অনিয়ম ও দুর্নীতির মাধ্যমে বিপুল অর্থ আত্মসাৎ করেছেন। অভিযোগে তাঁর বিরুদ্ধে অর্থ পাচার ও জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।

অভিযোগে ওই দুই প্রকল্পে তাঁর দায়িত্ব পালনের সময়ের বিল ও নথিপত্র যাচাই করার দাবি জানানো হয়েছে। একই সঙ্গে প্রকল্প পরিচালক থাকা অবস্থায় গৃহীত সিদ্ধান্ত, ঠিকাদার নিয়োগ এবং প্রকল্পের বিভিন্ন বিল-ভাউচার তদন্তের দাবি জানানো হয়েছে।
মো. তানভীরুল ইসলামের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের বিষয়ে বাংলাদেশ রেলওয়ের মহাপরিচালক (ডিজি) আফজাল হোসেনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি এ বিষয়ে অতিরিক্ত মহাপরিচালক (অবকাঠামো) আল ফাত্তাহ মো. মাসউদুর রহমানের সঙ্গে কথা বলার পরামর্শ দেন।
পরে অতিরিক্ত মহাপরিচালক (অবকাঠামো) আল ফাত্তাহ মো. মাসউদুর রহমানের কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, “দুদকে করা অভিযোগের বিষয়ে আমি জানি না।”
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব রেলওয়ে সেতু প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক থাকাকালে কোনো অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, “একেকজন একেকভাবে অভিযোগ করতে পারে। আমি বিষয়টি খোঁজ নিয়ে দেখছি।”

বাংলাদেশ মানবাধিকার পরিষদের সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট সেলিম চৌধুরী বলেন, রেলওয়ের মতো একটি রাষ্ট্রীয় সেবামূলক প্রতিষ্ঠানে দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগ অত্যন্ত উদ্বেগজনক।

তিনি বলেন, “রেলওয়েতে যদি একটি সিন্ডিকেটের মাধ্যমে দুর্নীতির সুযোগ তৈরি হয় এবং দুর্নীতির অভিযোগ থাকা ব্যক্তিরাই গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পান, তাহলে প্রতিষ্ঠানটির স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হবে। বাংলাদেশ রেলওয়েকে লোকসানের হাত থেকে বাঁচাতে হলে দুর্নীতির অভিযোগগুলো নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নিতে হবে।”

তাঁর মতে, দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে রেলওয়েকে আধুনিক, জনবান্ধব ও কার্যকর সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানে পরিণত করা কঠিন হবে।

রেলওয়ের পূর্বাঞ্চলের প্রধান প্রকৌশলীর দপ্তর ঘিরে কমিশন-বাণিজ্য, প্রকল্প বাস্তবায়নে অনিয়ম, অতিরিক্ত দামে উপকরণ কেনা, ঠিকাদারদের কাছ থেকে অর্থ আদায় এবং প্রকল্পের অর্থ ব্যবহারে স্বচ্ছতার ঘাটতির যেসব অভিযোগ উঠেছে, সেগুলো তদন্তের দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট ঠিকাদার ও অভিযোগকারীরা।

তাঁদের দাবি, শুধু অভিযোগের ভিত্তিতে কাউকে দোষী সাব্যস্ত না করে দুদক ও রেলওয়ের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের উচিত প্রকল্পগুলোর নথি, বিল-ভাউচার, দরপত্র, কার্যাদেশ, কাজের পরিমাণ ও বাস্তব অগ্রগতি সরেজমিনে যাচাই করা। একই সঙ্গে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।
দেশের রেল যোগাযোগের উন্নয়নে সরকার যখন বিপুল অর্থ বিনিয়োগ করছে, তখন প্রকল্প বাস্তবায়নের প্রতিটি স্তরে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা না গেলে সেই বিনিয়োগের সুফল নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাবে।