ঢাকা, মঙ্গলবার, ১১ অগাস্ট ২০২৬ | ই-পেপার

চাঁদপুরে পুনরায় চালু হচ্ছে শতবর্ষী ২ টাকার চিকিৎসালয়

দৈনিক আইন বার্তা
  • আপডেট সময়ঃ ১১:২২:৪২ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ১১ অগাস্ট ২০২৬
  • / ৮ বার পড়া হয়েছে

চাঁদপুরের পুরানবাজারের সরু গলির ভেতর দিয়ে প্রতিদিন হেঁটে যান কত মানুষ। কেউ দিনমজুর, কেউ ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, কেউ নদীভাঙনে ঘর হারিয়ে শহরে এসে ঠাঁই নিয়েছেন। সংসারের খরচ মেলাতেই যাদের হিমশিম খেতে হয়, তাদের কাছে অসুস্থতা অনেক সময় বাড়তি বিপদ। চিকিৎসকের ফি, পরীক্ষা-নিরীক্ষা কিংবা ওষুধের খরচ জোগাড় করা তাদের জন্য সহজ নয়।

এ মানুষগুলোর কাছে একসময় ভরসার নাম ছিল পুরানবাজার দাতব্য চিকিৎসালয়। মাত্র দুই টাকার টিকিটে চিকিৎসকের পরামর্শ মিলত, দেয়া হতো প্রয়োজনীয় ওষুধ। এক-দুই বছর নয়, এভাবে কেটে গেছে এক শতাব্দী। ব্রিটিশ আমলে প্রতিষ্ঠিত সেই চিকিৎসালয় পেরিয়েছে পাকিস্তান আমল, স্বাধীন বাংলাদেশের বহু সরকার ও সময়কাল। পুরানবাজারের মানুষের কাছে এটি হয়ে উঠেছিল শুধু একটি চিকিৎসাকেন্দ্র নয় বরং তাদের জীবনের সঙ্গে মিশে থাকা এক মানবিক প্রতিষ্ঠান।

কিন্তু গত বছর হঠাৎ সেই দরজা বন্ধ হয়ে যায়। চিকিৎসক সংকটসহ নানা সমস্যার কথা বলে বন্ধ করে দেয়া হয় ১০৫ বছরের পুরোনো এ দাতব্য চিকিৎসালয়। এরপর কেটে গেছে এক বছর। চিকিৎসাসেবার এ ছোট্ট আশ্রয়কেন্দ্রটি বন্ধ থাকায় দরিদ্র মানুষের ভোগান্তিও বেড়েছে।

চাঁদপুর পৌরসভার ঐতিহ্যবাহী পুরানবাজার দাতব্য চিকিৎসালয় আবার চালু করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে পাশেই অস্থায়ী স্থাপনা নির্মাণ করে চিকিৎসাসেবা চালুর নির্দেশ দিয়েছেন চাঁদপুর পৌর প্রশাসক ও স্থানীয় সরকার বিভাগের উপপরিচালক মো. এরশাদ উদ্দিন।

গত রোববার (৯ আগস্ট) বিকেলে চিকিৎসালয়টি পরিদর্শে এসে তিনি এ নির্দেশ দেন। একই সঙ্গে শতবর্ষী ঝুঁকিপূর্ণ ভবনটি দ্রুত নিলামের ব্যবস্থা করতে সংশ্লিষ্টদের নির্দেশ দিয়েছেন। ভবিষ্যতে সেখানে একটি বহুতল ভবন নির্মাণের পরিকল্পনার কথা জানান তিনি।

পৌর প্রশাসক মো. এরশাদ উদ্দিন জানান, চাঁদপুর পৌরসভার পক্ষ থেকে এই দাতব্য চিকিৎসালয়টি সুদীর্ঘ সময় ধরে চালু ছিল। মাঝখানে কিছু সমস্যার কারণে এটি সাময়িক বন্ধ রাখা হয়েছে। আমরা এটি আবার চালু করার উদ্যোগ নিয়েছি, যাতে পুরানবাজারের পৌরসভার পাঁচটি ওয়ার্ডের মানুষ এখানে বিনা মূল্যে প্রাথমিক চিকিৎসাসেবা পেতে পারেন।

পুরানবাজারের মানুষের কাছে চিকিৎসালয়টির পরিচয় ছিল খুব সহজ- ‘দুই টাকার চিকিৎসালয়’। নামটি শুধু সেবার মূল্য বোঝাত না; এটি মানুষের পাশে দাঁড়ানোর একটি দীর্ঘ ঐতিহ্য।

একজন দরিদ্র মানুষ পকেটে অল্প কিছু টাকা নিয়ে চিকিৎসার জন্য এখানে আসতেন। দুই টাকার টিকিট কাটার পর চিকিৎসকের পরামর্শ পেতেন। প্রয়োজন অনুযায়ী ওষুধও দেয়া হতো। ফলে অসুস্থতার সময় অন্তত চিকিৎসকের কাছে যাওয়ার সুযোগ ছিল তাদের।

স্থানীয় বাসিন্দা গোপাল জানান, গরিব মানুষের জন্য এ চিকিৎসালয়টি অনেকটা পরিবারের মানুষের মতো ছিল। অসুস্থ হলে বেশি টাকা লাগবে- এই চিন্তা করতে হতো না। দুই টাকার টিকিট কেটে চিকিৎসা পাওয়া যেত। ওষুধও মিলত।

আরেক বাসিন্দার জানায়, পুরানবাজারে অনেক নিম্নআয়ের মানুষ বসবাস করেন। নদীভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারও আছে। তাদের অনেকের পক্ষেই বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা নেয়া কঠিন। এ চিকিৎসালয় বন্ধ হওয়ার পর সেই জায়গাটা আর কেউ পূরণ করতে পারেনি।

চাঁদপুরের পুরানবাজারের এ চিকিৎসালয়ের ইতিহাস একেবারেই পুরোনো। স্থানীয়ভাবে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, ১৯২০ সালে ব্রিটিশ আমলে দরিদ্র মানুষের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার উদ্দেশ্যে এটি প্রতিষ্ঠা করা হয়।

পৌর প্রশাসক মো. এরশাদ উদ্দিন বলেন, চাঁদপুর পৌরসভার পক্ষ থেকে এই দাতব্য চিকিৎসালয়টি সুদীর্ঘ সময় ধরে চালু ছিল। মাঝখানে কিছু সমস্যার কারণে এটি সাময়িক বন্ধ রাখা হয়েছে। আমরা এটি আবার চালু করার উদ্যোগ নিয়েছি, যাতে পুরানবাজারের পৌরসভার পাঁচটি ওয়ার্ডের মানুষ এখানে বিনা মূল্যে প্রাথমিক চিকিৎসাসেবা পেতে পারেন।

ট্যাগস :

নিউজটি শেয়ার করুন

চাঁদপুরে পুনরায় চালু হচ্ছে শতবর্ষী ২ টাকার চিকিৎসালয়

আপডেট সময়ঃ ১১:২২:৪২ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ১১ অগাস্ট ২০২৬

চাঁদপুরের পুরানবাজারের সরু গলির ভেতর দিয়ে প্রতিদিন হেঁটে যান কত মানুষ। কেউ দিনমজুর, কেউ ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, কেউ নদীভাঙনে ঘর হারিয়ে শহরে এসে ঠাঁই নিয়েছেন। সংসারের খরচ মেলাতেই যাদের হিমশিম খেতে হয়, তাদের কাছে অসুস্থতা অনেক সময় বাড়তি বিপদ। চিকিৎসকের ফি, পরীক্ষা-নিরীক্ষা কিংবা ওষুধের খরচ জোগাড় করা তাদের জন্য সহজ নয়।

এ মানুষগুলোর কাছে একসময় ভরসার নাম ছিল পুরানবাজার দাতব্য চিকিৎসালয়। মাত্র দুই টাকার টিকিটে চিকিৎসকের পরামর্শ মিলত, দেয়া হতো প্রয়োজনীয় ওষুধ। এক-দুই বছর নয়, এভাবে কেটে গেছে এক শতাব্দী। ব্রিটিশ আমলে প্রতিষ্ঠিত সেই চিকিৎসালয় পেরিয়েছে পাকিস্তান আমল, স্বাধীন বাংলাদেশের বহু সরকার ও সময়কাল। পুরানবাজারের মানুষের কাছে এটি হয়ে উঠেছিল শুধু একটি চিকিৎসাকেন্দ্র নয় বরং তাদের জীবনের সঙ্গে মিশে থাকা এক মানবিক প্রতিষ্ঠান।

কিন্তু গত বছর হঠাৎ সেই দরজা বন্ধ হয়ে যায়। চিকিৎসক সংকটসহ নানা সমস্যার কথা বলে বন্ধ করে দেয়া হয় ১০৫ বছরের পুরোনো এ দাতব্য চিকিৎসালয়। এরপর কেটে গেছে এক বছর। চিকিৎসাসেবার এ ছোট্ট আশ্রয়কেন্দ্রটি বন্ধ থাকায় দরিদ্র মানুষের ভোগান্তিও বেড়েছে।

চাঁদপুর পৌরসভার ঐতিহ্যবাহী পুরানবাজার দাতব্য চিকিৎসালয় আবার চালু করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে পাশেই অস্থায়ী স্থাপনা নির্মাণ করে চিকিৎসাসেবা চালুর নির্দেশ দিয়েছেন চাঁদপুর পৌর প্রশাসক ও স্থানীয় সরকার বিভাগের উপপরিচালক মো. এরশাদ উদ্দিন।

গত রোববার (৯ আগস্ট) বিকেলে চিকিৎসালয়টি পরিদর্শে এসে তিনি এ নির্দেশ দেন। একই সঙ্গে শতবর্ষী ঝুঁকিপূর্ণ ভবনটি দ্রুত নিলামের ব্যবস্থা করতে সংশ্লিষ্টদের নির্দেশ দিয়েছেন। ভবিষ্যতে সেখানে একটি বহুতল ভবন নির্মাণের পরিকল্পনার কথা জানান তিনি।

পৌর প্রশাসক মো. এরশাদ উদ্দিন জানান, চাঁদপুর পৌরসভার পক্ষ থেকে এই দাতব্য চিকিৎসালয়টি সুদীর্ঘ সময় ধরে চালু ছিল। মাঝখানে কিছু সমস্যার কারণে এটি সাময়িক বন্ধ রাখা হয়েছে। আমরা এটি আবার চালু করার উদ্যোগ নিয়েছি, যাতে পুরানবাজারের পৌরসভার পাঁচটি ওয়ার্ডের মানুষ এখানে বিনা মূল্যে প্রাথমিক চিকিৎসাসেবা পেতে পারেন।

পুরানবাজারের মানুষের কাছে চিকিৎসালয়টির পরিচয় ছিল খুব সহজ- ‘দুই টাকার চিকিৎসালয়’। নামটি শুধু সেবার মূল্য বোঝাত না; এটি মানুষের পাশে দাঁড়ানোর একটি দীর্ঘ ঐতিহ্য।

একজন দরিদ্র মানুষ পকেটে অল্প কিছু টাকা নিয়ে চিকিৎসার জন্য এখানে আসতেন। দুই টাকার টিকিট কাটার পর চিকিৎসকের পরামর্শ পেতেন। প্রয়োজন অনুযায়ী ওষুধও দেয়া হতো। ফলে অসুস্থতার সময় অন্তত চিকিৎসকের কাছে যাওয়ার সুযোগ ছিল তাদের।

স্থানীয় বাসিন্দা গোপাল জানান, গরিব মানুষের জন্য এ চিকিৎসালয়টি অনেকটা পরিবারের মানুষের মতো ছিল। অসুস্থ হলে বেশি টাকা লাগবে- এই চিন্তা করতে হতো না। দুই টাকার টিকিট কেটে চিকিৎসা পাওয়া যেত। ওষুধও মিলত।

আরেক বাসিন্দার জানায়, পুরানবাজারে অনেক নিম্নআয়ের মানুষ বসবাস করেন। নদীভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারও আছে। তাদের অনেকের পক্ষেই বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা নেয়া কঠিন। এ চিকিৎসালয় বন্ধ হওয়ার পর সেই জায়গাটা আর কেউ পূরণ করতে পারেনি।

চাঁদপুরের পুরানবাজারের এ চিকিৎসালয়ের ইতিহাস একেবারেই পুরোনো। স্থানীয়ভাবে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, ১৯২০ সালে ব্রিটিশ আমলে দরিদ্র মানুষের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার উদ্দেশ্যে এটি প্রতিষ্ঠা করা হয়।

পৌর প্রশাসক মো. এরশাদ উদ্দিন বলেন, চাঁদপুর পৌরসভার পক্ষ থেকে এই দাতব্য চিকিৎসালয়টি সুদীর্ঘ সময় ধরে চালু ছিল। মাঝখানে কিছু সমস্যার কারণে এটি সাময়িক বন্ধ রাখা হয়েছে। আমরা এটি আবার চালু করার উদ্যোগ নিয়েছি, যাতে পুরানবাজারের পৌরসভার পাঁচটি ওয়ার্ডের মানুষ এখানে বিনা মূল্যে প্রাথমিক চিকিৎসাসেবা পেতে পারেন।