ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ই-পেপার

চসিকের প্রকৌশল বিভাগে ‘কমিশন’ আতঙ্ক

দৈনিক আইন বার্তা
  • আপডেট সময়ঃ ০৮:৩০:৪৭ অপরাহ্ন, বুধবার, ২ সেপ্টেম্বর ২০২৬
  • / ১০৫ বার পড়া হয়েছে

রিপন চৌধুরী বিশেষ প্রতিনিধি:চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের (চসিক) উন্নয়ন ও মেরামতকাজে কমিশন বাণিজ্যের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছেন চসিকের প্রধান প্রকৌশলী মো. আনিছুর রহমান। সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র ও কয়েকজন ঠিকাদারের দাবি, বিভিন্ন উন্নয়নকাজের টেন্ডার, বিল প্রস্তুত ও বিল ছাড়ানোর প্রক্রিয়ায় প্রধান প্রকৌশলীর নামে ৩ থেকে ৫ শতাংশ পর্যন্ত কমিশন দিতে হয়। এমনকি ভ্যাট ও ট্যাক্সের অর্থ থেকেও কমিশন দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
অভিযোগকারীদের ভাষ্য, চাহিদামতো কমিশন না দিলে সংশ্লিষ্ট ফাইলে স্বাক্ষর করতে গড়িমসি করা হয়। দিনের পর দিন ফাইল আটকে থাকে। আর কমিশনের অর্থ দেওয়া হলে দ্রুতই ফাইল ছাড়ার অভিযোগ রয়েছে। শুধু প্রধান প্রকৌশলীর দপ্তর নয়, প্রকল্প পরিচালক (পিডি), তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী, নির্বাহী প্রকৌশলীসহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধেও আনুপাতিক হারে কমিশন নেওয়ার অভিযোগ করেছেন কয়েকজন ঠিকাদার।

ফলে কাজের ব্যয় বেড়ে যাওয়ার পাশাপাশি কমিশনের টাকা সমন্বয় করতে গিয়ে নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহার এবং কাজে ফাঁকি দেওয়ার প্রবণতা তৈরি হচ্ছে বলে অভিযোগ সংশ্লিষ্টদের। এতে অনেক উন্নয়নকাজ শেষ হওয়ার অল্প সময়ের মধ্যেই নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। পরে একই সড়ক, ড্রেন বা অবকাঠামো মেরামতে আবারও সরকারি অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে। এতে একদিকে নাগরিক দুর্ভোগ বাড়ছে, অন্যদিকে অপচয় হচ্ছে বিপুল সরকারি অর্থ।

চসিকের সঙ্গে কাজ করা একাধিক ঠিকাদারের অভিযোগ, একটি কাজের টেন্ডার প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার পর বিল পাওয়া পর্যন্ত বিভিন্ন পর্যায়ে ‘কমিশন’ দিতে হয়। তাদের দাবি, প্রধান প্রকৌশলীর দপ্তরে একাই ৩ থেকে ৫ শতাংশ পর্যন্ত কমিশন চাওয়া হয়।

রাজস্ব খাতের থোক বরাদ্দের কাজেও আলাদা কমিশন নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, কাজের ইস্টিমেট তৈরির সময় ১ শতাংশ এবং চূড়ান্ত বিল প্রস্তুতের সময় আরও ১ শতাংশ—মোট ২ শতাংশ পর্যন্ত কমিশন দিতে হয়।

ঠিকাদারদের অভিযোগ, এসব অর্থের কোনো আনুষ্ঠানিক রসিদ থাকে না। ফলে কেউ প্রকাশ্যে অভিযোগ করতেও সাহস পান না।

এক ঠিকাদার নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘কমিশন না দিলে ফাইল আটকে থাকে। ব্যবসা করতে হলে শেষ পর্যন্ত চাহিদামতো টাকা দিয়েই ফাইল ছাড়াতে হয়। অভিযোগ করলে পরবর্তী কাজ পাওয়ার পথ বন্ধ হয়ে যেতে পারে—এই ভয়েই কেউ মুখ খুলতে চান না।’

চসিকে বর্তমানে কয়েকটি বড় উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নাধীন। এর মধ্যে এয়ারপোর্ট রোডসহ বিভিন্ন সড়ক উন্নয়ন ও প্রশস্তকরণ প্রকল্পের ব্যয় প্রায় ২ হাজার ৪৯১ কোটি টাকা। এ ছাড়া প্রায় ১ হাজার ২৩০ কোটি টাকা ব্যয়ে সড়ক, সেতু, কালভার্টসহ অবকাঠামো উন্নয়ন ও জালালাবাদ ওয়ার্ডের কুলগাঁও এলাকায় বাস টার্মিনাল নির্মাণ, প্রায় ১ হাজার ৩০০ কোটি টাকা ব্যয়ে বাড়ইপাড়া খাল নির্মাণ এবং প্রায় ৩০৯ কোটি টাকা ব্যয়ে সেবক নিবাস নির্মাণ প্রকল্প চলমান রয়েছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, এসব প্রকল্পে প্রতিবছর কয়েকশ কোটি টাকার উন্নয়নকাজ হয়। বছরে প্রায় ৬০০ থেকে ৭০০ কোটি টাকার কাজের বিল-সংক্রান্ত ফাইল বিভিন্ন পর্যায় পেরিয়ে প্রধান প্রকৌশলীর দপ্তরে যায়। অভিযোগ সত্য হলে এই বিপুল অঙ্কের কাজ থেকে ৩ থেকে ৫ শতাংশ কমিশনের অর্থ দাঁড়ায় বছরে কয়েক দশক কোটি টাকা।
সূত্রগুলোর দাবি, এই হিসাব অনুযায়ী শুধু বড় প্রকল্পগুলোর বিল থেকেই বছরে প্রায় ২০ থেকে ২৫ কোটি টাকা কমিশন হিসেবে আদায়ের অভিযোগ রয়েছে। তবে এই অর্থের প্রকৃত পরিমাণ কত এবং কারা কী পরিমাণ অর্থ নেন, তা নিরপেক্ষ তদন্ত ছাড়া নিশ্চিত হওয়া সম্ভব নয়।

শুধু বড় প্রকল্প নয়, চসিকের রাজস্ব খাতের মেরামত ও ছোট উন্নয়নকাজ নিয়েও একই ধরনের অভিযোগ রয়েছে। সংশ্লিষ্টদের তথ্যমতে, প্রতিবছর রাজস্ব খাত থেকে প্রায় ১০০ কোটি টাকার বিভিন্ন মেরামত ও উন্নয়নকাজ করা হয়।

ঠিকাদারদের অভিযোগ, এসব কাজের ফাইলও বিভিন্ন পর্যায় ঘুরে প্রধান প্রকৌশলীর দপ্তরে যায়। সেখানে চাহিদা অনুযায়ী অর্থ না দিলে ফাইল ছাড়তে বিলম্ব করা হয়।
একাধিক ঠিকাদারের দাবি, ‘কাজ শুরু থেকে বিল পাওয়া পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে খরচ আছে। এক টেবিল থেকে আরেক টেবিলে ফাইল নিতে গেলেও টাকা দিতে হয়।’
তবে এসব অভিযোগের কোনোটি কারও বিরুদ্ধে অপরাধ প্রমাণ হিসেবে গণ্য নয়। অভিযোগগুলোর সত্যতা যাচাইয়ে নথিপত্র, বিল-ভাউচার, ফাইলের গতিবিধি এবং সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।

ঠিকাদারদের ভাষ্য, কাজের প্রকৃত ব্যয়ের বাইরে কমিশন দিতে হলে সেই অর্থ শেষ পর্যন্ত প্রকল্পের কাজ থেকেই সমন্বয় করতে হয়। ফলে নির্মাণসামগ্রীর মান কমানো, কাজের পরিমাণ কমিয়ে দেওয়া কিংবা নির্ধারিত স্পেসিফিকেশন পুরোপুরি অনুসরণ না করার প্রবণতা তৈরি হয়।

এর প্রভাব পড়ে নগরবাসীর ওপর। নতুন সড়কে দ্রুত গর্ত সৃষ্টি, ড্রেনের অংশ ভেঙে যাওয়া কিংবা সংস্কার করা অবকাঠামো অল্প সময়ের মধ্যে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পেছনে নিম্নমানের কাজের অভিযোগ দীর্ঘদিনের।

ঠিকাদারদের প্রশ্ন—সরকারি অর্থে একটি কাজ করার পর যদি কয়েক মাস বা অল্প সময়ের মধ্যে সেটি আবার সংস্কার করতে হয়, তাহলে প্রথম দফার অর্থ ব্যয়ের দায় কার?
তাদের মতে, কাজের মান নিশ্চিত করতে হলে প্রকল্পের প্রতিটি স্তরে স্বচ্ছতা, নিয়মিত কারিগরি তদারকি এবং কমিশন বাণিজ্যের অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত জরুরি।
সংশ্লিষ্টদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে প্রায় ৩০০ কোটি টাকা দেনার দায় রয়েছে চসিকের। অর্থসংকটের কারণে নিয়মিত মেরামত ও নাগরিক সেবা কার্যক্রম পরিচালনাও কঠিন হয়ে পড়েছে।

এমন পরিস্থিতিতে উন্নয়ন ও মেরামতকাজের অর্থের একটি অংশ যদি অনিয়ম বা কমিশন বাণিজ্যের মাধ্যমে বেরিয়ে যায়, তাহলে এর সরাসরি প্রভাব পড়বে নাগরিক সেবায়—এমন আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

নগরবাসীর প্রশ্ন, একদিকে অর্থ সংকট ও দেনার চাপ, অন্যদিকে উন্নয়নকাজে অনিয়মের অভিযোগ—এই দুইয়ের মধ্যে সমন্বয় না হলে চসিকের আর্থিক শৃঙ্খলা ও উন্নয়ন প্রকল্পের গুণগত মান কীভাবে নিশ্চিত হবে?

চসিকের সঙ্গে নিয়মিত ব্যবসা করা ঠিকাদারদের বড় একটি অংশই প্রকাশ্যে কথা বলতে চান না। তাদের আশঙ্কা, অভিযোগের কারণে ভবিষ্যতে কাজ পাওয়া কঠিন হয়ে যেতে পারে।

একাধিক ঠিকাদারের ভাষ্য, ‘চসিকের সঙ্গে ব্যবসা করতে হলে কমিশন দিতে হয়—এটা সবাই জানে। কিন্তু প্রকাশ্যে অভিযোগ করার সাহস কারও নেই। অভিযোগ করলে ব্যবসার দরজা বন্ধ হয়ে যেতে পারে।’

এই পরিস্থিতি আরও একটি প্রশ্ন সামনে এনেছে—যদি অভিযোগকারীরাই ভয় পান, তাহলে চসিকের অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা কতটা কার্যকর?
নাগরিক সেবা নিশ্চিত করতে চসিক মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন নগরের বিভিন্ন এলাকায় নিয়মিত পরিদর্শন ও উন্নয়ন কার্যক্রম তদারক করছেন। নগরীর সড়ক, জলাবদ্ধতা, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও অবকাঠামোগত সমস্যার সমাধানে নানা উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

কিন্তু মাঠপর্যায়ে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিরুদ্ধে অনিয়মের অভিযোগ থাকলে এসব উদ্যোগ কতটা কার্যকর হবে—সেটিই এখন প্রশ্ন।
সংশ্লিষ্টদের মতে, কোনো একজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলেই তাকে দোষী সাব্যস্ত করা যায় না। তবে অভিযোগ যদি একাধিক স্বাধীন সূত্র ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বক্তব্যে বারবার উঠে আসে, তাহলে বিষয়টি এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগও নেই।

অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে চসিকের প্রধান প্রকৌশলী মো. আনিছুর রহমানের কার্যালয়ে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। তবে তাকে পাওয়া যায়নি। মোবাইল ফোনে একাধিকবার কল করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। ফলে তার বক্তব্য জানা সম্ভব হয়নি।

তবে অভিযোগের বিষয়ে চসিকের সচিব ও ভারপ্রাপ্ত প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) মো. আশরাফুল আমিন বলেন, ‘বিষয়টি আমার জানা নেই। সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পেলে তদন্ত সাপেক্ষে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ে চসিকের বিভিন্ন প্রকল্পের ইস্টিমেট, টেন্ডার নথি, কার্যাদেশ, বিল-ভাউচার, পরিমাপ বই (এমবি), ফাইলের অনুমোদন ও স্বাক্ষরের তারিখ, ঠিকাদারদের বিল পরিশোধের সময় এবং কাজের গুণগত মান পরীক্ষা করা যেতে পারে।

একই সঙ্গে নির্দিষ্ট কয়েকটি প্রকল্পের ব্যয় ও বাস্তব কাজের পরিমাণ তুলনা করে দেখা হলে কমিশন বা অনিয়মের অভিযোগের কোনো বাস্তব ভিত্তি রয়েছে কি না, তা অনেকটাই স্পষ্ট হতে পারে।

চসিকের অর্থসংকটের এই সময়ে উন্নয়ন বরাদ্দের প্রতিটি টাকা যথাযথভাবে ব্যয় হচ্ছে কি না—এ প্রশ্নের উত্তর এখন নগরবাসীর জানার অধিকার। আর অভিযোগগুলো সত্য হলে শুধু সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা নয়, সরকারি অর্থের অপচয় ও অনিয়মের সঙ্গে জড়িত প্রত্যেকের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি উঠছে।

ট্যাগস :

নিউজটি শেয়ার করুন

চসিকের প্রকৌশল বিভাগে ‘কমিশন’ আতঙ্ক

আপডেট সময়ঃ ০৮:৩০:৪৭ অপরাহ্ন, বুধবার, ২ সেপ্টেম্বর ২০২৬

রিপন চৌধুরী বিশেষ প্রতিনিধি:চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের (চসিক) উন্নয়ন ও মেরামতকাজে কমিশন বাণিজ্যের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছেন চসিকের প্রধান প্রকৌশলী মো. আনিছুর রহমান। সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র ও কয়েকজন ঠিকাদারের দাবি, বিভিন্ন উন্নয়নকাজের টেন্ডার, বিল প্রস্তুত ও বিল ছাড়ানোর প্রক্রিয়ায় প্রধান প্রকৌশলীর নামে ৩ থেকে ৫ শতাংশ পর্যন্ত কমিশন দিতে হয়। এমনকি ভ্যাট ও ট্যাক্সের অর্থ থেকেও কমিশন দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
অভিযোগকারীদের ভাষ্য, চাহিদামতো কমিশন না দিলে সংশ্লিষ্ট ফাইলে স্বাক্ষর করতে গড়িমসি করা হয়। দিনের পর দিন ফাইল আটকে থাকে। আর কমিশনের অর্থ দেওয়া হলে দ্রুতই ফাইল ছাড়ার অভিযোগ রয়েছে। শুধু প্রধান প্রকৌশলীর দপ্তর নয়, প্রকল্প পরিচালক (পিডি), তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী, নির্বাহী প্রকৌশলীসহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধেও আনুপাতিক হারে কমিশন নেওয়ার অভিযোগ করেছেন কয়েকজন ঠিকাদার।

ফলে কাজের ব্যয় বেড়ে যাওয়ার পাশাপাশি কমিশনের টাকা সমন্বয় করতে গিয়ে নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহার এবং কাজে ফাঁকি দেওয়ার প্রবণতা তৈরি হচ্ছে বলে অভিযোগ সংশ্লিষ্টদের। এতে অনেক উন্নয়নকাজ শেষ হওয়ার অল্প সময়ের মধ্যেই নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। পরে একই সড়ক, ড্রেন বা অবকাঠামো মেরামতে আবারও সরকারি অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে। এতে একদিকে নাগরিক দুর্ভোগ বাড়ছে, অন্যদিকে অপচয় হচ্ছে বিপুল সরকারি অর্থ।

চসিকের সঙ্গে কাজ করা একাধিক ঠিকাদারের অভিযোগ, একটি কাজের টেন্ডার প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার পর বিল পাওয়া পর্যন্ত বিভিন্ন পর্যায়ে ‘কমিশন’ দিতে হয়। তাদের দাবি, প্রধান প্রকৌশলীর দপ্তরে একাই ৩ থেকে ৫ শতাংশ পর্যন্ত কমিশন চাওয়া হয়।

রাজস্ব খাতের থোক বরাদ্দের কাজেও আলাদা কমিশন নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, কাজের ইস্টিমেট তৈরির সময় ১ শতাংশ এবং চূড়ান্ত বিল প্রস্তুতের সময় আরও ১ শতাংশ—মোট ২ শতাংশ পর্যন্ত কমিশন দিতে হয়।

ঠিকাদারদের অভিযোগ, এসব অর্থের কোনো আনুষ্ঠানিক রসিদ থাকে না। ফলে কেউ প্রকাশ্যে অভিযোগ করতেও সাহস পান না।

এক ঠিকাদার নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘কমিশন না দিলে ফাইল আটকে থাকে। ব্যবসা করতে হলে শেষ পর্যন্ত চাহিদামতো টাকা দিয়েই ফাইল ছাড়াতে হয়। অভিযোগ করলে পরবর্তী কাজ পাওয়ার পথ বন্ধ হয়ে যেতে পারে—এই ভয়েই কেউ মুখ খুলতে চান না।’

চসিকে বর্তমানে কয়েকটি বড় উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নাধীন। এর মধ্যে এয়ারপোর্ট রোডসহ বিভিন্ন সড়ক উন্নয়ন ও প্রশস্তকরণ প্রকল্পের ব্যয় প্রায় ২ হাজার ৪৯১ কোটি টাকা। এ ছাড়া প্রায় ১ হাজার ২৩০ কোটি টাকা ব্যয়ে সড়ক, সেতু, কালভার্টসহ অবকাঠামো উন্নয়ন ও জালালাবাদ ওয়ার্ডের কুলগাঁও এলাকায় বাস টার্মিনাল নির্মাণ, প্রায় ১ হাজার ৩০০ কোটি টাকা ব্যয়ে বাড়ইপাড়া খাল নির্মাণ এবং প্রায় ৩০৯ কোটি টাকা ব্যয়ে সেবক নিবাস নির্মাণ প্রকল্প চলমান রয়েছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, এসব প্রকল্পে প্রতিবছর কয়েকশ কোটি টাকার উন্নয়নকাজ হয়। বছরে প্রায় ৬০০ থেকে ৭০০ কোটি টাকার কাজের বিল-সংক্রান্ত ফাইল বিভিন্ন পর্যায় পেরিয়ে প্রধান প্রকৌশলীর দপ্তরে যায়। অভিযোগ সত্য হলে এই বিপুল অঙ্কের কাজ থেকে ৩ থেকে ৫ শতাংশ কমিশনের অর্থ দাঁড়ায় বছরে কয়েক দশক কোটি টাকা।
সূত্রগুলোর দাবি, এই হিসাব অনুযায়ী শুধু বড় প্রকল্পগুলোর বিল থেকেই বছরে প্রায় ২০ থেকে ২৫ কোটি টাকা কমিশন হিসেবে আদায়ের অভিযোগ রয়েছে। তবে এই অর্থের প্রকৃত পরিমাণ কত এবং কারা কী পরিমাণ অর্থ নেন, তা নিরপেক্ষ তদন্ত ছাড়া নিশ্চিত হওয়া সম্ভব নয়।

শুধু বড় প্রকল্প নয়, চসিকের রাজস্ব খাতের মেরামত ও ছোট উন্নয়নকাজ নিয়েও একই ধরনের অভিযোগ রয়েছে। সংশ্লিষ্টদের তথ্যমতে, প্রতিবছর রাজস্ব খাত থেকে প্রায় ১০০ কোটি টাকার বিভিন্ন মেরামত ও উন্নয়নকাজ করা হয়।

ঠিকাদারদের অভিযোগ, এসব কাজের ফাইলও বিভিন্ন পর্যায় ঘুরে প্রধান প্রকৌশলীর দপ্তরে যায়। সেখানে চাহিদা অনুযায়ী অর্থ না দিলে ফাইল ছাড়তে বিলম্ব করা হয়।
একাধিক ঠিকাদারের দাবি, ‘কাজ শুরু থেকে বিল পাওয়া পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে খরচ আছে। এক টেবিল থেকে আরেক টেবিলে ফাইল নিতে গেলেও টাকা দিতে হয়।’
তবে এসব অভিযোগের কোনোটি কারও বিরুদ্ধে অপরাধ প্রমাণ হিসেবে গণ্য নয়। অভিযোগগুলোর সত্যতা যাচাইয়ে নথিপত্র, বিল-ভাউচার, ফাইলের গতিবিধি এবং সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।

ঠিকাদারদের ভাষ্য, কাজের প্রকৃত ব্যয়ের বাইরে কমিশন দিতে হলে সেই অর্থ শেষ পর্যন্ত প্রকল্পের কাজ থেকেই সমন্বয় করতে হয়। ফলে নির্মাণসামগ্রীর মান কমানো, কাজের পরিমাণ কমিয়ে দেওয়া কিংবা নির্ধারিত স্পেসিফিকেশন পুরোপুরি অনুসরণ না করার প্রবণতা তৈরি হয়।

এর প্রভাব পড়ে নগরবাসীর ওপর। নতুন সড়কে দ্রুত গর্ত সৃষ্টি, ড্রেনের অংশ ভেঙে যাওয়া কিংবা সংস্কার করা অবকাঠামো অল্প সময়ের মধ্যে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পেছনে নিম্নমানের কাজের অভিযোগ দীর্ঘদিনের।

ঠিকাদারদের প্রশ্ন—সরকারি অর্থে একটি কাজ করার পর যদি কয়েক মাস বা অল্প সময়ের মধ্যে সেটি আবার সংস্কার করতে হয়, তাহলে প্রথম দফার অর্থ ব্যয়ের দায় কার?
তাদের মতে, কাজের মান নিশ্চিত করতে হলে প্রকল্পের প্রতিটি স্তরে স্বচ্ছতা, নিয়মিত কারিগরি তদারকি এবং কমিশন বাণিজ্যের অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত জরুরি।
সংশ্লিষ্টদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে প্রায় ৩০০ কোটি টাকা দেনার দায় রয়েছে চসিকের। অর্থসংকটের কারণে নিয়মিত মেরামত ও নাগরিক সেবা কার্যক্রম পরিচালনাও কঠিন হয়ে পড়েছে।

এমন পরিস্থিতিতে উন্নয়ন ও মেরামতকাজের অর্থের একটি অংশ যদি অনিয়ম বা কমিশন বাণিজ্যের মাধ্যমে বেরিয়ে যায়, তাহলে এর সরাসরি প্রভাব পড়বে নাগরিক সেবায়—এমন আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

নগরবাসীর প্রশ্ন, একদিকে অর্থ সংকট ও দেনার চাপ, অন্যদিকে উন্নয়নকাজে অনিয়মের অভিযোগ—এই দুইয়ের মধ্যে সমন্বয় না হলে চসিকের আর্থিক শৃঙ্খলা ও উন্নয়ন প্রকল্পের গুণগত মান কীভাবে নিশ্চিত হবে?

চসিকের সঙ্গে নিয়মিত ব্যবসা করা ঠিকাদারদের বড় একটি অংশই প্রকাশ্যে কথা বলতে চান না। তাদের আশঙ্কা, অভিযোগের কারণে ভবিষ্যতে কাজ পাওয়া কঠিন হয়ে যেতে পারে।

একাধিক ঠিকাদারের ভাষ্য, ‘চসিকের সঙ্গে ব্যবসা করতে হলে কমিশন দিতে হয়—এটা সবাই জানে। কিন্তু প্রকাশ্যে অভিযোগ করার সাহস কারও নেই। অভিযোগ করলে ব্যবসার দরজা বন্ধ হয়ে যেতে পারে।’

এই পরিস্থিতি আরও একটি প্রশ্ন সামনে এনেছে—যদি অভিযোগকারীরাই ভয় পান, তাহলে চসিকের অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা কতটা কার্যকর?
নাগরিক সেবা নিশ্চিত করতে চসিক মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন নগরের বিভিন্ন এলাকায় নিয়মিত পরিদর্শন ও উন্নয়ন কার্যক্রম তদারক করছেন। নগরীর সড়ক, জলাবদ্ধতা, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও অবকাঠামোগত সমস্যার সমাধানে নানা উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

কিন্তু মাঠপর্যায়ে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিরুদ্ধে অনিয়মের অভিযোগ থাকলে এসব উদ্যোগ কতটা কার্যকর হবে—সেটিই এখন প্রশ্ন।
সংশ্লিষ্টদের মতে, কোনো একজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলেই তাকে দোষী সাব্যস্ত করা যায় না। তবে অভিযোগ যদি একাধিক স্বাধীন সূত্র ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বক্তব্যে বারবার উঠে আসে, তাহলে বিষয়টি এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগও নেই।

অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে চসিকের প্রধান প্রকৌশলী মো. আনিছুর রহমানের কার্যালয়ে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। তবে তাকে পাওয়া যায়নি। মোবাইল ফোনে একাধিকবার কল করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। ফলে তার বক্তব্য জানা সম্ভব হয়নি।

তবে অভিযোগের বিষয়ে চসিকের সচিব ও ভারপ্রাপ্ত প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) মো. আশরাফুল আমিন বলেন, ‘বিষয়টি আমার জানা নেই। সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পেলে তদন্ত সাপেক্ষে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ে চসিকের বিভিন্ন প্রকল্পের ইস্টিমেট, টেন্ডার নথি, কার্যাদেশ, বিল-ভাউচার, পরিমাপ বই (এমবি), ফাইলের অনুমোদন ও স্বাক্ষরের তারিখ, ঠিকাদারদের বিল পরিশোধের সময় এবং কাজের গুণগত মান পরীক্ষা করা যেতে পারে।

একই সঙ্গে নির্দিষ্ট কয়েকটি প্রকল্পের ব্যয় ও বাস্তব কাজের পরিমাণ তুলনা করে দেখা হলে কমিশন বা অনিয়মের অভিযোগের কোনো বাস্তব ভিত্তি রয়েছে কি না, তা অনেকটাই স্পষ্ট হতে পারে।

চসিকের অর্থসংকটের এই সময়ে উন্নয়ন বরাদ্দের প্রতিটি টাকা যথাযথভাবে ব্যয় হচ্ছে কি না—এ প্রশ্নের উত্তর এখন নগরবাসীর জানার অধিকার। আর অভিযোগগুলো সত্য হলে শুধু সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা নয়, সরকারি অর্থের অপচয় ও অনিয়মের সঙ্গে জড়িত প্রত্যেকের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি উঠছে।