ইতিহাসের দ্বারপ্রান্তে বিজয়, ভাঙতে যাচ্ছেন ৪৯ বছরের রেকর্ড
- আপডেট সময়ঃ ০৭:১০:৪৬ অপরাহ্ন, সোমবার, ৪ মে ২০২৬
- / ৭ বার পড়া হয়েছে
জোসেফ বিজয় চন্দ্রশেখর- তামিলনাড়ুর রাজনীতিতে এখন সবচেয়ে আলোচিত নাম। তিনি এমন এক সম্ভাবনার সামনে দাঁড়িয়ে আছেন যা বাস্তব হলে ভেঙে যাবে প্রায় পাঁচ দশকের এক রাজনৈতিক ইতিহাস।
২০২৬ সালে যদি বিজয় তামিলনাড়ুতে জয়ী হন তবে তিনি এমন একটি কৃতিত্ব অর্জন করবেন যা গত ৪৯ বছরে কোনো চলচ্চিত্র তারকা করতে পারেননি। ১৯৭৭ সালে এম জি রামচন্দ্রন রাজনীতির গতিপথ বদলে দেওয়ার পর তিনিই হবেন রাজ্যের প্রথম অভিনেতা-মুখ্যমন্ত্রী।
শেষবার যখন সিনেমা সরাসরি ফোর্ট সেন্ট জর্জ দখল করেছিল, তখন এমজিআর ১৯৭৭ সালের বিধানসভা নির্বাচনে বিপুল জয় পান এবং ১৯৮৭ সালে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত এক দশক ধরে রাজ্য শাসন করেন। তিনি ভক্তদের আবেগকে সংগঠিত রাজনৈতিক শক্তিতে রূপ দেন, জনকল্যাণকে ভোটারদের সঙ্গে এক ধরনের আবেগঘন চুক্তিতে পরিণত করেন এবং রাজনীতিতে ব্যক্তিত্ব ও নীতির সম্পর্ক স্থায়ীভাবে বদলে দেন।
এরপর বহু চেষ্টা এবং বিপুল জনপ্রিয়তা থাকা সত্ত্বেও কোনো অভিনেতা সেই চূড়ান্ত সাফল্য অর্জন করতে পারেননি। জয়ললিতা অবশ্য ব্যতিক্রম, তবে তিনি নতুন দল গড়ে নয় বরং এমজিআর এর প্রতিষ্ঠিত এআইএডিএমকে-কে উত্তরাধিকারসূত্রে পেয়ে সেটিকে সংহত করে শেষ পর্যন্ত মুখ্যমন্ত্রী হন।
২০২৬ সালের নির্বাচনী প্রবণতা বলছে, বিজয়ের দল তামিলগা ভেট্রি কাজাগাম (টিভিকে) যার বয়স মাত্র দুই বছর, ১০০ থেকে ১১৮ আসনের মধ্যে অবস্থান করছে। সর্বনিম্ন আসন পেলেও এটি তাঁকে রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে তুলে আনছে। আর সর্বোচ্চ আসন সংখ্যা তাঁকে ২৩৪ সদস্যের বিধানসভায় সংখ্যাগরিষ্ঠতার জন্য প্রয়োজনীয় ১১৮ আসনের খুব কাছাকাছি নিয়ে যাচ্ছে।
এই উত্থানকে আরো তাৎপর্যপূর্ণ করে তুলেছে এর পরিকল্পিত ও নিয়ন্ত্রিত গতি। বিজয় তাঁর পূর্বসূরিদের মতো নন, যারা চলচ্চিত্রে সক্রিয় থেকেও রাজনীতিতে আংশিকভাবে যুক্ত ছিলেন। ২০০৯ সালে তিনি তাঁর বিশাল ভক্তগোষ্ঠীকে ‘বিজয় মাক্কাল ইয়াক্কাম’-এ সংগঠিত করে এক নতুন ভিত্তি গড়ে তোলেন। শুরুতে এটি জনকল্যাণমূলক ও সেবামূলক একটি নেটওয়ার্ক ছিল, কিন্তু ত্রাণ, শিক্ষা সহায়তা এবং স্থানীয় পর্যায়ের কাজের মাধ্যমে এটি ধীরে ধীরে বুথ-স্তরের শক্তিশালী উপস্থিতি তৈরি করে।
২০১১ সালে এই সংগঠন প্রকাশ্যে এআইএডিএমকে-নেতৃত্বাধীন জোটকে সমর্থন করে। এটি ছিল বিজয়ের প্রথম স্পষ্ট নির্বাচনী অবস্থান এবং তাঁর জনপ্রিয়তা ভোটে কতটা প্রভাব ফেলতে পারে তার একটি পরীক্ষা।
২০১০-এর দশকের শেষ এবং ২০২০ এর দশকের শুরুতে বিজয়ের জনসমক্ষে উপস্থিতি আরো স্পষ্ট রাজনৈতিক রূপ নেয়। ২০১৯ সালে নাগরিকত্ব সংশোধনী আইনের বিরুদ্ধে তাঁর মন্তব্য প্রমাণ করে, তিনি শুধু সিনেমার গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ থাকতে চান না। অডিও লঞ্চ, ফ্যান মিটিং এবং দাতব্য অনুষ্ঠানে তিনি পরীক্ষার চাপ, যুব বেকারত্ব, দুর্নীতি ও সুশাসনের মতো বিষয় তুলে ধরতে শুরু করেন, যা নতুন ভোটার ও শহুরে জনগোষ্ঠীর কাছে বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক।
দল গঠনের আগেই তাঁর সাংগঠনিক শক্তির প্রমাণ মেলে। ২০২১ সালের স্থানীয় সরকার নির্বাচনে বিজয় মাক্কাল ইয়াক্কামের প্রার্থীরা অধিকাংশ আসনে জয় পায়, যা দেখায় এই নেটওয়ার্ক জনপ্রিয়তাকে ভোটে রূপান্তর করতে সক্ষম।
২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে বিজয় আনুষ্ঠানিকভাবে তামিলগা ভেট্রি কাজাগাম (টিভিকে) গঠন করেন। তিনি স্পষ্ট ঘোষণা দেন—দলটি ২০২৬ সালের নির্বাচনে এককভাবে লড়বে, কোনো প্রাক-নির্বাচনী জোটে যাবে না এবং ডিএমকে-এআইএডিএমকে আধিপত্যের বিকল্প হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করবে। এই ঘোষণার পর তিনি চলচ্চিত্র থেকে অবসর নেওয়ার ঘোষণা দেন প্রায় ৭০টি চলচ্চিত্রের তিন দশকের ক্যারিয়ারের ইতি টেনে। তাঁর বার্তা ছিল পরিষ্কার—রাজনীতি তাঁর জন্য কোনো পার্শ্ব প্রকল্প নয়।
পরবর্তী দুই বছরে টিভিকে ভক্তভিত্তিক কাঠামোকে পূর্ণাঙ্গ রাজনৈতিক সংগঠনে রূপ দেয়—জেলা কমিটি, আসনভিত্তিক ইউনিট, বুথ পর্যায়ের সংগঠন তৈরি করে। পাশাপাশি শিক্ষা, কর্মসংস্থান, দুর্নীতি দমন এবং জবাবদিহিতা—এই বিষয়গুলোকে কেন্দ্র করে প্রচার আরো শক্তিশালী করা হয়।
বিজয়কে কেবল বক্তা হিসেবে নয়, একজন মনোযোগী শ্রোতা হিসেবেও তুলে ধরা হয়। সোশ্যাল মিডিয়া টাউন হল ও নিয়ন্ত্রিত জনসভাগুলোতে এই ইমেজ আরো জোরালো হয়। তবে পথটা পুরোপুরি মসৃণ ছিল না। ২০২৫ সালে কারুরে টিভিকে-সম্পর্কিত এক অনুষ্ঠানে মারাত্মক পদদলনের ঘটনা তাঁর নেতৃত্বকে প্রথম বড় পরীক্ষার মুখে ফেলে। এতে সাংগঠনিক শৃঙ্খলা ও জবাবদিহিতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। এই সংকটে তাঁর পরিমিত, প্রকাশ্য এবং সংশোধনমূলক প্রতিক্রিয়া দেখায়, প্রশাসনিক জটিলতা সামলানোর ক্ষেত্রে তাঁর সম্ভাব্য সক্ষমতা।
বর্তমান পরিসংখ্যান বলছে, তাঁর ঝুঁকি নেওয়া সফল হতে পারে। নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পেলেও, প্রায় ১১০টি আসন পেলেই বিজয় সরকার গঠনের কেন্দ্রীয় ভূমিকায় চলে আসবেন—হয় মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে, নয়তো ক্ষমতার প্রধান নির্ধারক হিসেবে। নির্বাচনের আগে জোট না করার সিদ্ধান্তের কারণে নির্বাচনের পর যেকোনো সমঝোতা তাঁর অবস্থানের সঙ্গে কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ তা নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হবে।
রাজনৈতিক কাঠামোতেও এর প্রভাব ইতোমধ্যেই দৃশ্যমান। ডিএমকে ও দুর্বল হলেও টিকে থাকা এআইএডিএমকের পাশাপাশি টিভিকে একটি শক্তিশালী তৃতীয় শক্তি হিসেবে উঠে এসেছে। এমজিআর-এর সময়কার পরিবর্তনের পর এই প্রথম তামিলনাড়ুতে একটি বিশ্বাসযোগ্য ত্রিমুখী প্রতিদ্বন্দ্বিতা দেখা যাচ্ছে। ছোট দলগুলো, যারা এতদিন দুই বড় দলের ওপর নির্ভরশীল ছিল, এখন একটি নতুন বিকল্প পাচ্ছে।
এমজিআরের সঙ্গে তুলনা অবধারিত, তবে পুরোপুরি যথাযথ নয়। এমজিআর যেখানে নাটকীয় বিভাজন ও জনতুষ্টিবাদী ঢেউয়ের ওপর ভর করে উঠে এসেছিলেন, সেখানে বিজয়ের আবেদন তৈরি হয়েছে নতুন প্রজন্মের উদ্বেগ, শাসনব্যবস্থার ক্লান্তি এবং স্বচ্ছ ক্ষমতা হস্তান্তরের প্রতিশ্রুতির ওপর।
তিনি শেষ পর্যন্ত ক্ষমতায় পৌঁছাবেন কিনা, নাকি শুধু নতুন রাজনৈতিক সমীকরণ তৈরি করবেন—যাই হোক না কেন, ২০২৬ সাল ইতোমধ্যেই তামিলনাড়ুর রাজনীতির ব্যাকরণ বদলে দিয়েছে। হয় বিজয় প্রায় পাঁচ দশকে প্রথম অভিনেতা হিসেবে ফোর্ট সেন্ট জর্জে প্রবেশ করবেন, নয়তো তিনি প্রমাণ করবেন—এই সম্ভাবনা আর অসম্ভব নয়, শুধু এখনও অপূর্ণ।






















