সড়কে মৃত্যুর মিছিল, উৎসবযাত্রায় শঙ্কা
- আপডেট সময়ঃ ০৩:১৪:২৪ অপরাহ্ন, শনিবার, ১৭ অক্টোবর ২০২৬
- / ৭৪ বার পড়া হয়েছে

রিপন চৌধুরী, বিশেষ প্রতিনিধি: শারদীয় দুর্গাপূজার দীর্ঘ ছুটিতে যখন লাখো মানুষ রাজধানীসহ দেশের বড় শহরগুলো থেকে নাড়ির টানে বাড়ি ফিরবেন, তখন নিরাপদ যাত্রা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। একদিকে গণপরিবহনের সম্ভাব্য সংকট, অতিরিক্ত ভাড়া আদায় ও সড়কে বিশৃঙ্খলার আশঙ্কা, অন্যদিকে প্রতিনিয়ত প্রাণঘাতী দুর্ঘটনা—সব মিলিয়ে উৎসবের আনন্দ বিষাদে পরিণত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। এরই মধ্যে সেপ্টেম্বর মাসে সড়ক দুর্ঘটনায় অন্তত ৪২৩ জনের মৃত্যুর তথ্য সামনে এনেছে যাত্রী অধিকার সংরক্ষণ পরিষদ। সংগঠনটির হিসাবে, ওই মাসে ৪৪২টি দুর্ঘটনায় আহত হয়েছেন ৬৭৪ জন।
সংগঠনটির পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, সেপ্টেম্বরে সড়কে প্রতিদিন গড়ে ১৪ জনের বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছে। নিহতদের মধ্যে ৭৩ জন নারী ও ৬১ জন শিশু। মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা এবং পথচারীদের প্রাণহানির পরিসংখ্যানও পরিস্থিতির ভয়াবহতা তুলে ধরছে।
শনিবার (১৭ অক্টোবর) রাজধানীর সেগুনবাগিচায় ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির সাগর-রুনি মিলনায়তনে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য তুলে ধরে সংগঠনটি। একই সঙ্গে দুর্গাপূজার ছুটিতে যাত্রীদের নিরাপদ যাতায়াত নিশ্চিত করতে সরকার ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর কাছে একগুচ্ছ সুপারিশ পেশ করা হয়।
যাত্রী অধিকার সংরক্ষণ পরিষদের তথ্য অনুযায়ী, সেপ্টেম্বর মাসে মোট ১৫৬টি দুর্ঘটনা ছিল মোটরসাইকেলকেন্দ্রিক। এসব দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন ১৩৯ জন, যা সড়ক দুর্ঘটনায় মোট মৃত্যুর প্রায় ৩৩ শতাংশ। একই সময়ে প্রাণ হারিয়েছেন ১০৬ জন পথচারী—মোট নিহতের প্রায় এক-চতুর্থাংশ।
এ ছাড়া দায়িত্ব পালনকালে বা ঝুঁকিপূর্ণ কর্মপরিবেশের কারণে ৫৩ জন চালক ও সহকারীর মৃত্যু হয়েছে বলে জানিয়েছে সংগঠনটি। দুর্ঘটনায় জড়িত যানবাহনের মধ্যে ছিল ১৬২টি মোটরসাইকেল, ১২৯টি থ্রি-হুইলার ও ১১৩টি বাস।
দুর্ঘটনার ধরন বিশ্লেষণে সংগঠনটি জানিয়েছে, ১৬৮টি দুর্ঘটনা ঘটেছে চালকের নিয়ন্ত্রণ হারানোর কারণে। ১০৯টি ঘটনায় পথচারীকে ধাক্কা বা চাপা দেওয়া হয়েছে, ৯৮টি ঘটনায় মুখোমুখি বা একাধিক যানবাহনের সংঘর্ষ ঘটেছে এবং ৬১টি দুর্ঘটনায় পেছন থেকে আঘাতের ঘটনা ঘটেছে।
এই পরিসংখ্যানের মধ্য দিয়ে কয়েকটি প্রশ্ন সামনে এসেছে: চালকদের প্রশিক্ষণ ও কর্মঘণ্টা কতটা কার্যকরভাবে নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে, ফিটনেসবিহীন যানবাহন কীভাবে সড়কে চলছে এবং পথচারীদের নিরাপত্তায় বিদ্যমান ব্যবস্থাগুলো কতটা কার্যকর?
সড়কের ধরনভিত্তিক পরিসংখ্যানে আঞ্চলিক সড়কে ১৭৮টি দুর্ঘটনার কথা জানিয়েছে সংগঠনটি। এ ছাড়া শহরের সড়কে ৬৩টি, গ্রামীণ সড়কে ৫৬টি এবং জাতীয় মহাসড়কে ৪২টি দুর্ঘটনার তথ্য উল্লেখ করা হয়েছে।
বিভাগভিত্তিক হিসাবে ঢাকা বিভাগে সর্বাধিক ১৩২টি দুর্ঘটনায় ১৩৪ জন নিহত হয়েছেন। অন্যদিকে সিলেট বিভাগে ২০টি দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন ২১ জন। একক জেলা হিসেবে গাজীপুরে সর্বোচ্চ ৩৮ জন নিহত হওয়ার তথ্য দিয়েছে সংগঠনটি।
রাজধানী ঢাকায় ৫২টি দুর্ঘটনায় ২১ জন নিহত এবং ৪৭ জন আহত হয়েছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে সড়কের পাশাপাশি রেল ও নৌপথেও দুর্ঘটনার চিত্র উদ্বেগজনক বলে জানিয়েছে যাত্রী অধিকার সংরক্ষণ পরিষদ। সংগঠনটির তথ্য অনুযায়ী, সেপ্টেম্বর মাসে ১১টি নৌদুর্ঘটনায় ১৬ জন নিহত, সাতজন আহত এবং চারজন নিখোঁজ হয়েছেন। একই সময়ে ২৩টি ট্রেন দুর্ঘটনায় ১৯ জন নিহত ও ছয়জন আহত হয়েছেন।
উৎসবের ছুটিতে সড়ক, রেল ও নৌপথে যাত্রীর চাপ বাড়ার প্রেক্ষাপটে এসব পরিবহনে নিরাপত্তা তদারকি জোরদার করার দাবি জানিয়েছে সংগঠনটি।
সংগঠনটির পর্যবেক্ষণে দুর্ঘটনার সম্ভাব্য কারণ হিসেবে উঠে এসেছে ফিটনেসবিহীন যানবাহন, বেপরোয়া গতি, চালকদের প্রশিক্ষণ ও শারীরিক সক্ষমতার ঘাটতি এবং নির্ধারিত কর্মঘণ্টা ও বেতনের অভাব। দীর্ঘ সময় বিরতিহীনভাবে গাড়ি চালানোর ফলে চালকের ক্লান্তি দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়াতে পারে বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এ ছাড়া মহাসড়কে পর্যাপ্ত সার্ভিস লেন না থাকা, ধীরগতির যানবাহনের সঙ্গে দ্রুতগতির যানবাহনের সংঘাত, তরুণদের ঝুঁকিপূর্ণ মোটরসাইকেল চালানো, ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থার তদারকির ঘাটতিকে গুরুত্বের সঙ্গে দেখছে সংগঠনটি।
তবে এসব কারণের প্রত্যেকটির সঙ্গে দুর্ঘটনার প্রত্যক্ষ সম্পর্ক নির্ধারণে পৃথক তদন্ত, দুর্ঘটনাস্থল পরিদর্শন এবং সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থার তথ্য প্রয়োজন। সংগঠনটির পর্যবেক্ষণকে তাই পূর্ণাঙ্গ সরকারি তদন্তের বিকল্প হিসেবে দেখার সুযোগ নেই ।
দুর্গাপূজার ছুটিতে যাত্রীদের দুর্ভোগ কমাতে পরিবহন খাতে সমন্বিত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছে যাত্রী অধিকার সংরক্ষণ পরিষদ। তাদের প্রস্তাবের মধ্যে রয়েছে যাত্রীচাহিদা অনুযায়ী গণপরিবহনের ব্যবস্থা, অতিরিক্ত ভাড়া আদায় প্রতিরোধ, বাস টার্মিনাল ও গুরুত্বপূর্ণ সড়কে নজরদারি এবং ফিটনেসবিহীন যানবাহনের বিরুদ্ধে অভিযান।
সংগঠনটির মতে, উৎসবের সময় অতিরিক্ত যাত্রীর চাপ সামলাতে আগাম পরিবহন পরিকল্পনা না থাকলে টার্মিনালগুলোতে দীর্ঘ অপেক্ষা, টিকিটসংকট ও ভাড়া নিয়ে অনিয়মের আশঙ্কা বাড়ে। তাই সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সমন্বয়ে অগ্রিম পরিকল্পনা, অভিযোগ গ্রহণের কার্যকর ব্যবস্থা এবং নিয়মিত অভিযান প্রয়োজন।
সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে মহাসড়কে আধুনিক সিসিটিভি ক্যামেরা ও স্পিড গান ব্যবহারের মাধ্যমে যানবাহনের গতি পর্যবেক্ষণ এবং আইন লঙ্ঘনের ঘটনায় ই-প্রসিকিউশন চালুর সুপারিশ করেছে সংগঠনটি।
একই সঙ্গে ড্রাইভিং লাইসেন্স প্রদান ও নবায়ন এবং যানবাহনের ফিটনেস পরীক্ষা স্বচ্ছ ও প্রযুক্তিনির্ভর করার দাবি জানানো হয়েছে। ভুল পথে গাড়ি চালানো, বেপরোয়া গতি এবং ট্রাফিক আইন অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
অবকাঠামোগত উন্নয়নের অংশ হিসেবে দুর্ঘটনাপ্রবণ স্থান বা ব্ল্যাক স্পট চিহ্নিত করে বিপজ্জনক বাঁক সংশোধন, সড়ক বিভাজক স্থাপন, দৃশ্যমান সাইনবোর্ড এবং নিরাপদ পথচারী পারাপারের ব্যবস্থা করার প্রস্তাব রয়েছে। জাতীয় মহাসড়কে ধীরগতির যানবাহনের জন্য বিকল্প সড়ক ও প্রয়োজনীয় সার্ভিস লেন নির্মাণের দাবিও জানিয়েছে সংগঠনটি।
চালকদের টানা আট ঘণ্টার বেশি গাড়ি চালানো নিষিদ্ধ করা, দূরপাল্লার রুটে বিকল্প চালক রাখা এবং চালক ও সহকারীদের নির্দিষ্ট বেতন, নিয়োগপত্র ও সামাজিক সুরক্ষার আওতায় আনার সুপারিশ করেছে যাত্রী অধিকার সংরক্ষণ পরিষদ।
সংগঠনটির বক্তব্য, দৈনিক ট্রিপ বা আয়নির্ভর ব্যবস্থায় চালকদের ওপর দ্রুত গন্তব্যে পৌঁছানোর চাপ তৈরি হতে পারে। নির্ধারিত কর্মঘণ্টা, পর্যাপ্ত বিশ্রাম ও প্রাতিষ্ঠানিক প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করা গেলে চালকের ক্লান্তিজনিত ঝুঁকি কমানোর সুযোগ রয়েছে।
এ ছাড়া চালকদের নিয়মিত প্রশিক্ষণ, প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্য ও সক্ষমতা যাচাই এবং আইনসম্মত পদ্ধতিতে মাদকাসক্তি পরীক্ষা কার্যকর করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
দুর্গাপূজায় যানজট ও শব্দদূষণ কমাতে অবৈধ হাইড্রোলিক হর্নের ব্যবহার বন্ধ এবং অপ্রয়োজনীয় হর্ন বাজানোর প্রবণতা রোধের আহ্বান জানিয়েছে সংগঠনটি। তাদের মতে, অতিরিক্ত শব্দ চালক ও পথচারীদের মনোযোগ বিঘ্নিত করতে পারে এবং সড়কে অস্বস্তিকর পরিস্থিতি তৈরি করে।
এ বিষয়ে সংগঠনটির বার্তা, ‘অপ্রয়োজনীয় হর্ন বর্জন করি, শব্দদূষণমুক্ত নিরাপদ ও আনন্দময় দুর্গাপূজা নিশ্চিত করি।’
শুধু সরকারি উদ্যোগ নয়, যাত্রীদের সচেতনতাও নিরাপদ যাতায়াতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছে সংগঠনটি। বাস, ট্রেন ও লঞ্চে ধারণক্ষমতার অতিরিক্ত যাত্রী হয়ে বা ছাদে ভ্রমণ না করা, চালকের বেপরোয়া গতি দেখলে নিরাপদভাবে প্রতিবাদ জানানো, মোটরসাইকেলে মানসম্মত হেলমেট ব্যবহার এবং নির্ধারিত স্থান দিয়ে সড়ক পার হওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
দীর্ঘ ছুটিতে বাড়ি ছাড়ার আগে গ্যাস, বিদ্যুৎ ও পানির সংযোগ পরীক্ষা এবং বাসাবাড়ির নিরাপত্তা নিশ্চিত করার আহ্বানও জানানো হয়।
সংবাদ সম্মেলনে যাত্রী অধিকার সংরক্ষণ পরিষদের নেতারা বাস টার্মিনাল, লঞ্চঘাট ও রেলস্টেশনের পরিস্থিতি, অতিরিক্ত ভাড়া আদায় এবং পরিবহন খাতের অনিয়ম গণমাধ্যমে তুলে ধরার আহ্বান জানান। পাশাপাশি সড়ক নিরাপত্তার সচেতনতামূলক বার্তা প্রচারে সংবাদমাধ্যমের সহযোগিতা কামনা করেন তারা।
সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন সংগঠনের সভাপতি কামারুন নাহার, সাধারণ সম্পাদক সায়মুন নাহার জিদনী, সাংগঠনিক সম্পাদক যুবায়ের সিকদার, অর্থ সম্পাদক আবুল বাশার হাওলাদার এবং উপদেষ্টা গোলাম ফারুক ও মো. আজাদুর রহমান।
সংগঠনটির পক্ষ থেকে বলা হয়, উৎসবের ছুটিতে মানুষের যাতায়াত নিরাপদ করতে সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থা, পরিবহন মালিক-শ্রমিক, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং গণমাধ্যমকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। তাদের প্রত্যাশা, কার্যকর নজরদারি, আইন প্রয়োগ ও জনসচেতনতার মাধ্যমে দুর্ঘটনা ও যাত্রী ভোগান্তি কমিয়ে সবার জন্য নিরাপদ যাত্রা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।






















