পুলিশের CDMS থেকে মামলার তথ্য উধাও হলেও সন্ধান মিলছে না নেপথ্যের শক্তির
- আপডেট সময়ঃ ১০:১৯:৫৩ অপরাহ্ন, শনিবার, ৩ অক্টোবর ২০২৬
- / ২৬ বার পড়া হয়েছে
মিজানুর রহমান, রাজশাহী প্রতিনিধি: রাজশাহীতে মাদক ও অপরাধ জোন হিসেবে বেশ পরিচিত নাম মতিহার থানা। এই থানার বেশিরভাগ এলাকায় মাদকের বেচাকেনা হয়। এই এলাকায় কয়েক শত মাদককারবারি এবং বেশ কয়েকটি সিন্ডিকেট রয়েছে। এই মাদক সিন্ডিকেটের অন্যতম নাম মাসুদ রানা রাব্বানী। সেই সিন্ডিকেট থেকে রাজনৈতিক নেতার হাত ধরে অনুপ্রবেশ করে সংবাদ মাধ্যমে। এরপর থেকে তিনি আরও বেপরোয়া হয়ে উঠেন। তিনি ধিরে ধিরে অপরাধ জগতের বটবৃক্ষে পরিণত হয়েছে। এতে বাড়তে থাকে রাব্বানীর বিরুদ্ধে মামলা ও মামলার সংখ্যা। আলোচিত সেই মাসুদ রানা রাব্বানীকে ঘিরে একের পর এক অভিযোগ থাকলেও এবার পুলিশের তথ্যভান্ডার CDMS থেকে তার বিরুদ্ধে পূর্বে থাকা মামলা ও অপরাধসংক্রান্ত তথ্য উধাও হওয়ার অভিযোগ উঠেছে। বিষয়টি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও আইজিপি বরাবর লিখিত আবেদনও করা হয়েছে।
আবেদনে বলা হয়েছে, রাজশাহী মহানগরীর মতিহার থানাধীন তালাইমারী কাজলা এলাকার বাসিন্দা মাসুদ রানা রাব্বানীর বিরুদ্ধে অতীতে ডজন খানেক মামলা, গ্রেপ্তার, কারাবরণ এবং শীর্ষ সন্ত্রাসী তালিকাভুক্তির তথ্য পুলিশের সিডিএমএস ছিল বলে স্থানীয়ভাবে দীর্ঘদিন ধরে আলোচনা ছিল। এমনকি ২০২১ সাল পর্যন্ত তার নামে একাধিক মামলার তথ্য পুলিশের ওই ডাটাবেজে থাকার কথাও আবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। কিন্তু বর্তমানে তার বিরুদ্ধে পূর্বের মামলা, অপরাধসংক্রান্ত তথ্য ও শীর্ষ সন্ত্রাসী তালিকাভুক্তির তথ্য ডাটাবেজে পাওয়া যাচ্ছে না বলে অভিযোগ করা হয়েছে। এ অবস্থায় তথ্যগুলো কোন কারিগরি ত্রুটি, সার্ভার-সংক্রান্ত সমস্যা, ডাটা এন্ট্রির অনিয়ম কিংবা কোন প্রভাবশালী মহলের হস্তক্ষেপে সরানো হয়েছে কি না, তা তদন্তের দাবি জানানো হয়েছে।
আবেদনের সঙ্গে সংযুক্ত আরেকটি নথিতে রাব্বানীর বিরুদ্ধে CDMS থাকা বিভিন্ন সময়ের একাধিক মামলা ও জিডির তথ্য উল্লেখ রয়েছে। সেখানে ২০২১ সালের একটি মামলায় তাকে আসামি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। নথিতে তার বিরুদ্ধে পূর্বের একাধিক মামলার তথ্যও তুলে ধরা হয়েছে। একদিকে পুরোনো মামলা- সংক্রান্ত নথির অস্তিত্বের কথা বলা হলেও অন্যদিকে বর্তমান পুলিশি তথ্যভান্ডারে সেসব তথ্য না থাকার অভিযোগ নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে। তার বিরুদ্ধে বেশ কয়েকটি ঘটনার বর্ণনা তুলে ধরা হলে।
প্রায় পাঁচ-ছয় বছর আগে মতিহার থানা এলাকার মাদককারবারি হিসেবে পরিচিত এক ব্যক্তিকে পুলিশের মাধ্যমে গ্রেপ্তার করিয়ে পরে মোটা অঙ্কের টাকা আদায়ের চেষ্টা করা হয়েছিল। এ ঘটনায় একটি অডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে। ওই অডিওতে রাব্বানীর সহযোগী হিসেবে পরিচিত মিজানুর রহমান টনির সঙ্গে পুলিশের টাকা লেনদেন নিয়ে কথোপকথন এবং আটক ব্যক্তিকে টাকা নিয়ে ছেড়ে দেওয়ার প্রসঙ্গ শোনা যায়। তবে ওই অডিওর উৎস এবং কথোপকথনে থাকা ব্যক্তিদের পরিচয় স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
২০২৪ সালের ৩ সেপ্টেম্বর আরএমপি বোয়ালিয়া মডেল থানায় দায়ের করা একটি রাজনৈতিক মামলায় রাব্বানীর ভূমিকা নিয়েও অভিযোগ রয়েছে। সেই মামলায় তার প্রতিপক্ষ সাংবাদিক ও বিরোধীপক্ষের কয়েকজনের নাম এজাহারভুক্ত করা হয়। উক্ত মামলার ৪৮ নম্বর আসামির নাম বাদ দেওয়ার কথা বলে অর্থ দাবি করা হচ্ছে, এমন একটি অডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। অবশ্য ভাইরাল হওয়া সেই অডিও প্রশাসনের নিকট পাঠানো হয়েছে।
এরপর ২০২৪ সালের ২৮ নভেম্বর দায়ের হওয়া আরেকটি রাজনৈতিক মামলা হয়। সেই মামলাটি বাদীকে দিয়ে জোর করে করানো হয়েছে বলে দাবি করেছেন মামলার বাদি নিজেই। শুধু তাই নয়, এজাহারভুক্ত অসংখ্য আসামিকে মাসলা থেকে রেহায় দেওয়ার কথা বলে অর্থ নেওয়ার অভিযোগ করা হয়েছে। এ ঘটনায় বাদীর কথোপকথনের একটি ভিডিও সংরক্ষিত রয়েছে প্রতিবেদকের কাছে।
বাদীর ভাষ্য, ওই সময় মামলার তদন্তের সঙ্গে যুক্ত তৎকালীন ডিবি কর্মকর্তা এসআই মিজানের সঙ্গে রাব্বানীর ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ ছিল এবং তাদের মধ্যে যোগসাজশে মামলা ও আসামির নাম নিয়ে বাণিজ্য চলত। এ অভিযোগের পক্ষে অডিও, মামলার নথি ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের যাচাই করা জরুরি। অভিযোগ রয়েছে, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে রাব্বানী রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বজায় রাখতেন। তৎকালীন সময়ে জামায়াত-শিবির, বিএনপি ও ছাত্রদলের অসংখ্য নেতাকর্মীদের পুলিশের মাধ্যমে গ্রেপ্তার করানো এবং বানিজ্যের অভিযোগ রয়েছে।
২০২৩ সালের রাজশাহী সিটি করপোরেশন নির্বাচনকে ঘিরে তার একটি ভিডিও প্রাকাশ হয়েছে। যেখানে তাকে তৎকালীন মেয়র ও আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য এএইচএম খায়রুজ্জামান লিটনের পক্ষে প্রচারে অংশ নিতে দেখা যায়।
বর্তমানে এই রাব্বানী রাজশাহীর ঐতিহাসিক প্রেসক্লাব এবং কয়েকজন সাংবাদিককে নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভিন্ন বিরূপ মন্তব্য ও অপপ্রচার চালাচ্ছেন বলেও অভিযোগ উঠেছে। রাজশাহী প্রেসক্লাবের দাবি, তার অতীত কর্মকাণ্ড, মামলা ও পুলিশের সঙ্গে যোগাযোগের অভিযোগ নিয়ে প্রশ্ন ওঠার পরই সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে এসব প্রচারণা চালানো হচ্ছে।
এব্যাপারে রাজশাহী প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক গোলাম মোস্তফা মামুন বলেন, ঐতিহ্যবাহী এই প্রেসক্লাব নিয়ে কঠিন ষড়যন্ত্র চলছে। তাতে কোন লাভ করতে না পেরে বিভিন্ন ভুয়া ফেসবুক আইডি খুলে রাজশাহী প্রেসক্লাবের সাংবাদিকদের নিয়ে আপত্তিকর মন্তব্য ও অপপ্রচার করা হচ্ছে। এব্যাটারে আইডি সনাক্তকরণে পুলিশকে অবগত করা হয়েছে। তাদের ব্যাপারে আগামীতে আরও বড় ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া হবে। তবে আমরা জানি কারা করছে এই ধরনের অপপ্রচার। তাদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ শুধু সময়ের ব্যাপার।
CDMS থেকে মামলার তথ্য গায়েব হওয়া নিয়ে কথা হয় আরএমপি পুলিশ কমিশনার (ডিআইজি) মোহাম্মদ ফয়েজুল কবির এর সাথে। তিনি সাংবাদিকদের জানান, আমরা মামলার তথ্য এন্ট্রি করতে পারি কিন্তু ডিলেট বা রিমুভ করতে পারিনা। যদি এমন ঘটনা ঘটে থাকে তাহলে অবশ্যই খতিয়ে দেখা হবে। তবে কেউ একজন আইজিপি বরাবর লিখিত অভিযোগ দিয়েছে, বিষয়টি নিয়ে তদন্ত চলছে। ঘটনার সত্যতা পেলে অবশ্যই আইনগত ব্যবস্থা গ্রহন করা হবে।






















