বিমানবন্দরের মাটি যাচ্ছে কোথায়?
- আপডেট সময়ঃ ০৪:৪৯:২২ অপরাহ্ন, বুধবার, ৭ অক্টোবর ২০২৬
- / ২৬ বার পড়া হয়েছে
রিপন চৌধুরী বিশেষ প্রতিনিধি:চট্টগ্রামের শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের ভেতরে মাছ চাষের জন্য পুকুর খননের নামে নির্বিচারে মাটি কেটে বাইরে বিক্রি করার অভিযোগ উঠেছে একটি চক্রের বিরুদ্ধে। অভিযোগ রয়েছে, বিমানবন্দরের সংশ্লিষ্ট কয়েকজন কর্মকর্তা ও ব্যবসায়ীর যোগসাজশে দীর্ঘদিন ধরে এভাবে মাটি সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে। মাছ চাষের জন্য ইজারা নেওয়া জায়গায় পুকুর খননের কথা বলা হলেও বিপুল পরিমাণ মাটি কোথায় যাচ্ছে, কে বা কারা এর বাণিজ্যিক সুবিধা নিচ্ছে এবং এর অনুমোদনই বা কতটা বৈধ—এসব প্রশ্নের কোনো স্পষ্ট জবাব মেলেনি।
সরেজমিনে দেখা গেছে, বিমানবন্দরের রানওয়ে ও অভ্যন্তরীণ সড়কের আশপাশে বড় বড় গর্ত সৃষ্টি হয়েছে। কোথাও পুকুরের আদলে বিশাল অংশ খনন করা হয়েছে, কোথাও আবার খননকাজের চিহ্ন স্পষ্ট। বিমানবন্দরের মূল সড়ক থেকে দেখা যায়, রানওয়েতে একটি উড়োজাহাজ উড্ডয়নের প্রস্তুতি নিচ্ছে; এর কাছাকাছিই একটি এক্সকাভেটর দিয়ে মাটি কাটার কাজ চলছে। বিমানবন্দরের ভেতরে প্রবেশের পর রাস্তার ডান পাশে কলাবাগান উজাড় করে বড় আকারের পুকুর খননের দৃশ্যও চোখে পড়ে। সেখানে একটি এক্সকাভেটরকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়। আশপাশে আরও কয়েকটি বড় গর্ত রয়েছে।
ঘটনাস্থলে থাকা কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, এনাম নামের একজনসহ বিমানবন্দরের কয়েকজন কর্মকর্তা ও ব্যবসায়ী মাছ চাষের জন্য ওই জায়গা ইজারা নিয়েছেন। পুকুর তৈরির জন্যই মাটি কাটা হচ্ছে বলে তাদের দাবি। তবে স্থানীয়ভাবে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, খনন করা মাটির একটি অংশ বিমানবন্দরের বাইরে বিভিন্ন এলাকায় বিক্রি করা হচ্ছে। স্থানীয় চেয়ারম্যান বাড়ি ও ১৪ নম্বর এলাকায়ও এসব মাটি বিক্রি করা হয়েছে বলে দাবি করেছে একাধিক সূত্র।
মাছ চাষের জন্য পুকুর খনন বৈধভাবে অনুমোদিত কি না, সেটি এক বিষয়। কিন্তু সেই খনন থেকে উত্তোলিত মাটি ব্যক্তিগতভাবে বিক্রি করা হচ্ছে কি না, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।
অভিযোগ রয়েছে, অতীতে সরকারি অর্থ ব্যয় করে বিমানবন্দরের বিভিন্ন নিচু জায়গা ভরাট করা হয়েছিল। সেই মাটি এখন আবার কেটে বাইরে বিক্রি করা হলে একদিকে সরকারি সম্পদের অপচয় হচ্ছে, অন্যদিকে ভবিষ্যতে একই জায়গা ভরাটের প্রয়োজন হলে সরকারকেই আবার অর্থ ব্যয় করে মাটি কিনতে হতে পারে। ফলে সরকারি অর্থে ভরাট করা মাটি ব্যক্তিগতভাবে বিক্রি করা হয়ে থাকলে তার দায় কার—এ প্রশ্নও উঠছে।
সরকারি সম্পত্তি থেকে মাটি উত্তোলন ও বিক্রির ক্ষেত্রে আইন ও অনুমোদনের নির্দিষ্ট প্রক্রিয়া রয়েছে। বালুমহাল ও মাটি ব্যবস্থাপনা আইন, ২০১০-এর বর্তমান বিধানে গুরুত্বপূর্ণ সরকারি ও বেসরকারি স্থাপনার ক্ষেত্রে বিক্রয়ের উদ্দেশ্যে মাটি উত্তোলনে নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। একই আইনে সরকারি কার্যক্রম বা উন্নয়ন প্রকল্পের জন্য মাটি উত্তোলনের ক্ষেত্রেও পূর্বানুমোদনের বিধান রয়েছে।
আইন অনুযায়ী নিষিদ্ধ এলাকায় বা অনুমতি ছাড়া মাটি উত্তোলন করলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের নির্বাহী ব্যক্তিবর্গ ও সহায়তাকারীদের সর্বোচ্চ দুই বছর কারাদণ্ড অথবা ৫০ হাজার থেকে ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত জরিমানা, অথবা উভয় দণ্ড হতে পারে। অপরাধে ব্যবহৃত ড্রেজার, মাটিবাহী যানবাহন বা সংশ্লিষ্ট সামগ্রী বাজেয়াপ্ত করারও বিধান রয়েছে।
শুধু বালুমহাল ও মাটি ব্যবস্থাপনা আইন নয়, ভূমি ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ ও কৃষিভূমি সুরক্ষা আইন, ২০২৬-এও মাটি অপসারণের বিষয়ে কঠোর বিধান রয়েছে। আইনে কৃষিভূমি, জলাধার ও জলাভূমি থেকে মাটি অপসারণকে শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। একই সঙ্গে অবৈধভাবে অপসারিত মাটি পুনঃস্থাপনের নির্দেশ দেওয়ার ক্ষমতাও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে দেওয়া হয়েছে।
এ আইনে কৃষিভূমির উপরিভাগের মাটি, পাহাড়-টিলা বা জলাধারের পাড়ের মাটি ক্রয়-বিক্রয়, অপসারণ, পরিবহন বা ব্যবহারের ওপরও নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। সংশ্লিষ্ট অপরাধে সর্বোচ্চ দুই বছর কারাদণ্ড অথবা দুই লাখ টাকা অর্থদণ্ড কিংবা উভয় দণ্ড এবং যন্ত্রপাতি জব্দের বিধান রয়েছে।
এখানে উল্লেখ্য, ২০২৬ সালের শুরুতে জারি হওয়া ‘ভূমি ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ ও কৃষিভূমি সুরক্ষা অধ্যাদেশ’ পরে ১০ এপ্রিল ২০২৬ প্রণীত ‘ভূমি ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ ও কৃষিভূমি সুরক্ষা আইন, ২০২৬’ দ্বারা রহিত হয়েছে। ফলে বর্তমান প্রতিবেদনে আইনি অবস্থান হিসেবে নতুন আইনটিই প্রযোজ্য।
শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম বিমানবন্দর এবং এটি বাংলাদেশ বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (সিএএবি) অধীন পরিচালিত। সিএএবির তথ্য অনুযায়ী, বিমানবন্দরটিতে রানওয়ে, ট্যাক্সিওয়ে ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো উন্নয়ন ও শক্তিশালীকরণে বিভিন্ন প্রকল্প বাস্তবায়িত হয়েছে।
এমন একটি সংবেদনশীল স্থাপনার রানওয়ের কাছাকাছি ভারী খননযন্ত্র দিয়ে মাটি কাটার ঘটনা তাই শুধু মাটি বিক্রির অভিযোগেই সীমাবদ্ধ নয়; এর সঙ্গে অবকাঠামোগত নিরাপত্তা, ভূমির স্থিতিশীলতা এবং বিমানবন্দরের সামগ্রিক নিরাপত্তা ব্যবস্থার প্রশ্নও জড়িয়ে আছে।
সরেজমিনে রানওয়ের কাছাকাছি খননযন্ত্র চলতে দেখা গেলেও এ কাজের জন্য কী ধরনের অনুমোদন নেওয়া হয়েছে, কতটুকু জায়গায় পুকুর খননের অনুমতি দেওয়া হয়েছে, উত্তোলিত মাটির পরিমাণ কত এবং সেই মাটি কোথায় নেওয়া হচ্ছে—এসব বিষয়ে কোনো অনুমোদনপত্র বা নথি প্রকাশ্যে পাওয়া যায়নি।
এই বিষয়ে জানতে শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের পরিচালক গ্রুপ ক্যাপ্টেন মোহাম্মদ নূর হোসেনের বক্তব্যের জানতে একাধিকবার মোবাইল ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। মাটি কাটার ছবি হোয়াটসঅ্যাপে পাঠিয়েও তাঁর কোনো জবাব পাওয়া যায়নি।
অন্যদিকে বিমানবন্দরের নিরাপত্তায় নিয়োজিত এয়ারপোর্ট আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়নের সহ-অধিনায়ক (এসপি) মোহাম্মদ নাজির আহমেদ খান এর বক্তব্যের জানতে একাধিকবার মোবাইল ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করেও তাকে পাওয়া যায়নি , অনুসন্ধানে এখন মূল প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে— পুকুর খননের অনুমতি কে দিয়েছে? ইজারার শর্তে কি পুকুর খননের অনুমতি রয়েছে? খননকৃত মাটি বিক্রি বা বাইরে সরিয়ে নেওয়ার অনুমতি রয়েছে কি না? মাটি বিক্রি হয়ে থাকলে তার রাজস্ব সরকারি কোষাগারে জমা হয়েছে কি না? কত ঘনমিটার মাটি কাটা হয়েছে এবং কতটি ট্রাকে তা বিমানবন্দরের বাইরে গেছে?রানওয়ে ও অন্যান্য অবকাঠামোর কতটা কাছে খনন করা হয়েছে? আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন—সরকারি অর্থে আগে ভরাট করা জায়গা আবার কেটে মাটি বাইরে বিক্রি করা হয়ে থাকলে এর দায় কার? বালুমহাল ও মাটি ব্যবস্থাপনা আইন অনুযায়ী গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকলে বালুমহাল বিলুপ্তির উদ্যোগ নেওয়ার সুযোগও রয়েছে। একই সঙ্গে সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পে উত্তোলিত মাটি বা বালুর ব্যবহার ও বিক্রয়ের ক্ষেত্রেও সরকারি প্রক্রিয়ার বিধান রয়েছে। তাই শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের ভেতরে পুকুর খননের নামে ঠিক কত পরিমাণ মাটি কাটা হয়েছে, তার প্রকৃত ব্যবহার কী এবং বাইরে বিক্রির অভিযোগের সত্যতা কতটুকু—তা তদন্ত করে দেখা জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।বিমানবন্দরের মতো রাষ্ট্রীয়ভাবে গুরুত্বপূর্ণ একটি স্থাপনার ভেতরে দিনের বেলায় এক্সকাভেটর দিয়ে বড় আকারের পুকুর খনন এবং সেই মাটি বাইরে বিক্রির অভিযোগ উঠলেও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নীরবতা নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। এখন প্রয়োজন বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ, সিএএবি, জেলা প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সমন্বিত তদন্ত। একই সঙ্গে ইজারা চুক্তি, পুকুর খননের অনুমোদন, মাটি কাটার পরিমাণ, পরিবহন রেকর্ড, মাটি বিক্রির হিসাব এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভূমিকা খতিয়ে দেখা দরকার। কারণ, এটি যদি নিছক মাছ চাষের জন্য অনুমোদিত পুকুর খনন হয়, তাহলে তার নথিপত্র প্রকাশ করলেই অভিযোগের অবসান ঘটতে পারে। আর যদি মাছ চাষের আড়ালে সরকারি জমি থেকে মাটি কেটে ব্যক্তিগতভাবে বিক্রির ঘটনা ঘটে থাকে, তাহলে তা শুধু সম্পদ লুটের অভিযোগ নয়—সরকারি সম্পদ ব্যবস্থাপনা, আইন প্রয়োগ এবং একটি সংবেদনশীল বিমানবন্দরের নিরাপত্তা নিয়েও গুরুতর প্রশ্ন তৈরি করবে।





















