সালমান শাহ’র মৃত্যু রহস্য: ৩০ বছরেও শেষ হয়নি তদন্ত
- আপডেট সময়ঃ ০৩:৪৫:৩১ অপরাহ্ন, রবিবার, ৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬
- / ১৪ বার পড়া হয়েছে
তিন দশক পেরিয়ে গেছে। তবে এখনই বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের জনপ্রিয় নায়ক সালমান শাহর মৃত্যুর রহস্যের জট এখনও কাটেনি। ১৯৯৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর রাজধানীর নিউ ইস্কাটনের ভাড়া বাসা থেকে উদ্ধার করা হয়েছিল তার মরদেহ। সেদিন তিনি আত্মহত্যা করেছিলেন, নাকি তাকে হত্যা করা হয়েছিল সেই প্রশ্নের উত্তর এখনও অজানা।
মৃত্যুর শুরু থেকেই সালমান শাহর পরিবার দাবি করে আসছে, তিনি আত্মহত্যা করেননি, তাকে হত্যা করা হয়েছে। সেই দাবিতে এখনো অনড় তার মা নীলা চৌধুরী। ছেলের মৃত্যুর ৩০ বছর পূর্তিতে ৬ সেপ্টেম্বরকে ‘মৃত্যু দিবস’ নয়, ‘হত্যা দিবস’ হিসেবে উল্লেখ করার দাবি জানিয়েছেন তিনি।
নীলা চৌধুরী দাবি করেন, আমি শুরু থেকেই বলে এসেছি, এটি হত্যা। আমার ছেলে মারা যায়নি, তাকে মেরে ফেলা হয়েছে। ৬ সেপ্টেম্বর আমার ছেলের মৃত্যু দিবস নয়, এটি সালমান শাহর হত্যা দিবস।
মৃত্যু থেকে হত্যা মামলা
১৯৯৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর সকালে নিউ ইস্কাটনের বাসায় সালমান শাহকে ঝুলন্ত অবস্থায় দেখতে পান তার স্ত্রী সামিরা হক। পরবর্তীতে তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসকেরা মৃত ঘোষণা করেন।
সেদিনই সালমান শাহর বাবা কমরউদ্দিন আহমদ চৌধুরী রমনা থানায় একটি অপমৃত্যু মামলা করেন। কিন্তু এক বছরের মধ্যে তার ধারণা বদলে যায়। ১৯৯৭ সালের ২৪ জুলাই ছেলেকে হত্যা করা হয়েছে অভিযোগ করে অপমৃত্যুর মামলাটি হত্যা মামলায় রূপান্তরের আবেদন করেন তিনি। এরপর থেকেই সালমান শাহর মৃত্যু ঘিরে শুরু হয় দীর্ঘ আইনি ও তদন্ত প্রক্রিয়া।
১৯৯৭ সালের নভেম্বরে মামলাটি তদন্ত করে সিআইডি আদালতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেয়। প্রতিবেদনে সালমান শাহর মৃত্যুকে আত্মহত্যা হিসেবে উল্লেখ করা হয়। ওই প্রতিবেদন প্রত্যাখ্যান করে তার বাবা রিভিশন মামলা করেন।
২০০৩ সালে মামলাটি বিচার বিভাগীয় তদন্তে পাঠানো হয়। প্রায় ১১ বছর পর ২০১৪ সালে দেওয়া সেই তদন্ত প্রতিবেদনেও সালমান শাহর মৃত্যুকে অপমৃত্যু হিসেবে উল্লেখ করা হয়। সেটিও প্রত্যাখ্যান করেন তার মা নীলা চৌধুরী।
পিবিআইয়ের প্রতিবেদনেও আত্মহত্যা
২০১৫ সালে নীলা চৌধুরী নারাজি আবেদন করলে মামলাটি তদন্তের দায়িত্ব র্যাবকে দেওয়ার নির্দেশ দেন আদালত। পরে রাষ্ট্রপক্ষের রিভিশনের পর ওই আদেশ বাতিল হয়। এরপর তদন্তের দায়িত্ব পায় পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)।
২০২০ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি পিবিআই আদালতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দাখিল করে। সেখানেও সালমান শাহ আত্মহত্যা করেছেন বলে উল্লেখ করা হয়। ২০২১ সালের ৩১ অক্টোবর আদালত ওই প্রতিবেদন গ্রহণ করে আসামিদের অব্যাহতি দেন। কিন্তু সালমান শাহর পরিবার তাতেও সন্তুষ্ট হয়নি।
২৯ বছর পর ফের হত্যা মামলা
দীর্ঘ আইনি লড়াইয়ের পর ২০২৫ সালের ২০ অক্টোবর ঢাকার ষষ্ঠ অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ আদালত পরিবারের রিভিশন আবেদন মঞ্জুর করেন। একই সঙ্গে সালমান শাহর মৃত্যুর ঘটনায় হত্যা মামলা হিসেবে এজাহার গ্রহণ ও তদন্তের নির্দেশ দেওয়া হয়।
এরপর নীলা চৌধুরীর পক্ষে তার ভাই মোহাম্মদ আলমগীর কুমকুম বাদী হয়ে রমনা থানায় হত্যা মামলা করেন। মামলায় সালমান শাহর সাবেক স্ত্রী সামিরা হকসহ ১১ জনকে আসামি করা হয়।
আসামিদের মধ্যে রয়েছেন সামিরার মা লতিফা হক লুসি, ব্যবসায়ী আজিজ মোহাম্মদ ভাই, চলচ্চিত্র অভিনেতা আশরাফুল হক ওরফে ডনসহ আরও কয়েকজন।
একজন গ্রেপ্তার, তদন্ত এখনও শেষ হয়নি
নতুন করে করা হত্যা মামলায় গত ৯ আগস্ট ঢাকার হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে আশরাফুল হক ওরফে ডনকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে আদালত তাকে পাঁচ দিনের রিমান্ডে পাঠান। তিনিই এ মামলায় এখন পর্যন্ত গ্রেপ্তার একমাত্র আসামি।
মামলাটির তদন্ত করছে সিআইডি। গত ৩০ আগস্ট তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের দিন ধার্য থাকলেও তা জমা দিতে পারেনি তদন্ত সংস্থা। পরে ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মো. জুয়েল রানা আগামী ২৯ সেপ্টেম্বর প্রতিবেদন দাখিলের নতুন দিন ধার্য করেন। এ নিয়ে নবমবারের মতো সময় পেল তদন্তকারী সংস্থা।
তদন্ত কর্মকর্তা সিআইডির ঢাকা মেট্রো দক্ষিণের পরিদর্শক মজিবুর রহমান জানান, তদন্ত এখনও চলছে। এ মামলায় একজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাকে এখনও জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়নি। শিগগিরই তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হলে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যেতে পারে বলে আশা করছেন তিনি।
পরিবারের দাবি, সত্য বেরিয়ে আসুক
বাদীপক্ষের আইনজীবী মো. আবিদ হাসান বলেন, “দীর্ঘ ৩০ বছর ধরে সালমান শাহর পরিবার ন্যায়বিচারের অপেক্ষায় রয়েছে। সব আসামিকে গ্রেপ্তার করে জিজ্ঞাসাবাদ ও বিচারের মুখোমুখি করা হলে প্রকৃত ঘটনা বেরিয়ে আসবে।”
অন্যদিকে, গ্রেপ্তার ডনের আইনজীবীদের দাবি, সালমান শাহর মৃত্যুর সঙ্গে তার কোনো সম্পর্ক নেই। তিনি সম্পূর্ণ নির্দোষ এবং তাকে এই মামলায় ফাঁসানো হয়েছে।
সালমান শাহ‘র মামা আলমগীর কুমকুম জানান, আসামি ডনকে গ্রেপ্তারের পর সালমানের ভাই শাহরানকে হত্যার হুমকি দেওয়া হয়েছে। মৃত্যু নিয়ে বাড়াবাড়ি না করতে বলা হয়েছে। এত বছর পরও আসামিরা থেমে নেই। দ্রুত আসামিদের গ্রেপ্তার করে বিচারের আওতায় আনার দাবি জানান।
সালমান শাহ’র মা নীলা চৌধুরীকে মোবাইলে ফোনে বলেন, “আমি শুরু থেকেই বলে এসেছি, এটি হত্যা। আমার ছেলে মারা যায়নি, তাকে মেরে ফেলা হয়েছে। ৬ সেপ্টেম্বর আমার ছেলের মৃত্যু দিবস নয়, এটি সালমান শাহর হত্যা দিবস। সে মরে কীভাবে? ডন গ্রেপ্তার হয়েছে। সামিরাকে গ্রেপ্তার করে জিজ্ঞাসাবাদ করলে অনেক কিছু বের হয়ে যাবে। সামিরা, আজিজ মোহাম্মদ ভাই, রুবি- এদের গ্রেপ্তার করলে সব বের হয়ে আসবে। আমি চাই, বর্তমান সরকার যেন জাতির কথা চিন্তা করে এবং এই ঘটনার বিচার নিশ্চিত করে।”
তিনি আরও বলেন, “সালমানের মৃত্যুর পর তারা বহুদিন আমাদের হয়রানি করেছে। কাজের বুয়াকে দিয়ে ভুয়া মামলা দিয়েছে, আমার ছেলে শাহরানের গাড়িতে হামলা করেছে। সারাক্ষণ তারা আমাদের ওয়াচ করে রাখত। ৬ সেপ্টেম্বরের আগে ও পরে যেসব ঘটনা আমাদের সঙ্গে ঘটেছে, তা-ই প্রমাণ করে, এটি একটি হত্যা।”
এ সময় হত্যার পেছনে কারণ হিসেবে সামিরার সঙ্গে সম্পর্কের অবনতি ও সালমানকে বয়কটের ঘটনাও উল্লেখ করেন তিনি।
সেদিন কী ঘটেছিল?
১৯৯৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর। ঢাকায় সিনেমায় সালমান শাহ’র জনপ্রিয়তা ও খ্যাতি তখন মধ্যগগনে। সেদিন সকালে রাজধানীর নিউ ইস্কাটন গার্ডেন এলাকায় তার ভাড়া বাসায় পাওয়া যায় সালমান শাহর লাশ। স্ত্রী সামিরা হক পুলিশকে জানান, ড্রেসিংরুমের সিলিং ফ্যানের সাথে ঝুলন্ত অবস্থায় সালমানকে দেখে তারা দেহটি নামিয়ে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিলে চিকিৎসকেরা তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
ওই দিনই রাজধানীর রমনা থানায় প্রথম অপমৃত্যু মামলা করেন সালমান শাহের বাবা কমর উদ্দিন আহমেদ চৌধুরী।
সেই অপমৃত্যুর মামলায় তিনি উল্লেখ করেন, ঘটনার দিন সকাল সাড়ে নয়টার দিকে সালমানের বাসায় ছেলের সঙ্গে দেখা করতে যান। কিন্তু সালমানের ব্যক্তিগত সহকারী আবুল ও তার স্ত্রী সামিরা বলেন, “সালমান রাত জেগে কাজ করেছে। এখন তাকে ঘুম থেকে ডাকা যাবে না।” তিনি প্রায় এক ঘণ্টা অপেক্ষা করে বাসায় ফিরে আসেন। বেলা সাড়ে ১১টার দিকে সেলিম নামের একজন ফোন করে জানান, সালমানের কী যেন হয়েছে। সালমানের বাবা, মা ও ভাই সালমানের বাসা ছুটে গেলে তার শয়নকক্ষে সালমানের নিথর দেহ দেখতে পান তারা।
কুমকুমের করা হত্যা মামলায় বলা হয়, বাদীর বোন ও বোন জামাই গ্রিন রোডের বাসায় পৃথকভাবে বসবাস করতেন। তারা সালমানের ইস্কাটনের বাসায় যাওয়ার পর স্ত্রী সামিরা এবং কর্মচারী আবুল জানান, সালমান ঘুমাচ্ছেন। ওই সময় চলচ্চিত্র প্রযোজক সিদ্দিকও সালমান শাহর সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিলেন।
সালমান শাহ ঘুমাচ্ছেন শুনে তার বাবা-মা স্ত্রী সামিরাকে বলে আসেন যে, তারা সিলেটে যাওয়ার পথে সালমানের সঙ্গে দেখা করে যাবেন। এরপর তারা এবং প্রযোজক সিদ্দিক ইস্কাটনের বাসা ত্যাগ করেন। ঘটনার দিন বেলা সাড়ে ১১টার দিকে প্রোডাকশন ম্যানেজার সেলিম ফোন করে সালমান শাহর বাবাকে জানান, সালমানের ‘যেন কী হয়েছে’। খবর পেয়েই তারা দ্রুত বাসায় ছুটে যান। সেখানে গিয়ে দেখতে পান, সালমান তার শোবার ঘরে পড়ে আছেন।
অভিযোগে আরও বলা হয়, সে সময় দুই-একজন বহিরাগত নারী সালমানের হাতে-পায়ে তেল মালিশ করছিলেন এবং রুবী নামে একটি মেয়ে সেখানে বসে ছিলেন। তখন সামিরা সালমানের মাকে বাসা থেকে বেরিয়ে যেতে বলেন। পরে সালমানের বাবা-মা তাকে নিয়ে হলি ফ্যামিলি হাসপাতালে যাওয়ার পথে তার গলায় দড়ির দাগ এবং মুখমণ্ডল ও পা নীলবর্ণ ধারণ করতে দেখেন। অবস্থার গুরুত্ব বুঝে দ্রুত তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে কর্তব্যরত চিকিৎসক জানান, বেশ কিছুক্ষণ আগেই সালমান শাহ মারা গেছেন বলে অভিযোগ উল্লেখ করা হয়।























