ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬ | ই-পেপার

বিদেশি যন্ত্রাংশের নামে নকল মাল, রেলে কোটি কোটি টাকার কমিশন বাণিজ্য!

দৈনিক আইন বার্তা
  • আপডেট সময়ঃ ০৮:২৫:৪৫ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৪ জুন ২০২৬
  • / ২১ বার পড়া হয়েছে

রিপন চৌধুরী বিশেষ প্রতিনিধি: বাংলাদেশ রেলওয়ের নিরাপত্তা ও সেবার মান নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে বিদেশি অরিজিনাল যন্ত্রাংশ সরবরাহের আড়ালে নিম্নমানের ও নকল খুচরা যন্ত্রাংশ ব্যবহারের অভিযোগে। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, টেন্ডারে বিদেশি ব্র্যান্ডের অরিজিনাল যন্ত্রাংশ সরবরাহের শর্ত থাকলেও বাস্তবে মাত্র ১০ থেকে ২০ শতাংশ আসল যন্ত্রাংশ দেখিয়ে বাকি ৮০ শতাংশ নিম্নমানের বা স্থানীয়ভাবে তৈরি পণ্য সরবরাহ করা হচ্ছে। আর এই অনিয়মের আড়ালে কমিশন বাণিজ্যের মাধ্যমে হাতিয়ে নেওয়া হচ্ছে কোটি কোটি টাকা।

অভিযোগ রয়েছে, রেলওয়ের ইঞ্জিন, বগি, ব্রেকিং সিস্টেম, সিগন্যালিং, বিয়ারিং, কাপলিং ও বিভিন্ন বৈদ্যুতিক যন্ত্রাংশের মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতে বিদেশি পণ্যের নামে নকল বা নিম্নমানের মালামাল সরবরাহ করা হচ্ছে। এতে একদিকে সরকারের বিপুল অর্থ অপচয় হচ্ছে, অন্যদিকে যাত্রী নিরাপত্তা ও সেবার মানও মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়ছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, পাহাড়তলী সিসিএস দপ্তরে বিদেশি যন্ত্রাংশ সরবরাহের জন্য ৩৪টি প্রতিষ্ঠান তালিকাভুক্ত রয়েছে। তবে একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেট দীর্ঘদিন ধরে কমিশনের বিনিময়ে নিম্নমানের যন্ত্রাংশ সরবরাহ করে আসছে বলে অভিযোগ রয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে বাজারমূল্যের চেয়ে ১০ থেকে ১২ গুণ বেশি দামে এসব পণ্য ক্রয় করা হচ্ছে।

রেলওয়ের একাধিক কর্মকর্তা ও ঠিকাদার নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, বিদেশি অরিজিনাল যন্ত্রাংশের নামে নকল পণ্য সরবরাহের বিষয়টি নতুন নয়। বছরের পর বছর ধরে একটি চক্র বিভিন্ন পর্যায়ের অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীদের যোগসাজশে এই অনিয়ম চালিয়ে আসছে। অভিযোগ থাকলেও কার্যকর তদন্ত ও শাস্তির অভাবে তারা আরও বেপরোয়া হয়ে উঠেছে।

তাদের দাবি, মালামাল গ্রহণের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী বাধ্যতামূলক ‘পোর্ট ইন্সপেকশন’ না করায় অনিয়মের সুযোগ সৃষ্টি হচ্ছে। বরং অধিকাংশ ক্ষেত্রে শুধু ব্যবহারকারী বিভাগের মতামতের ওপর নির্ভর করে যন্ত্রাংশ গ্রহণ করা হয়। ফলে মোটা অঙ্কের কমিশনের বিনিময়ে নিম্নমানের যন্ত্রাংশকেও ‘মানসম্মত’ বলে প্রত্যয়ন দেওয়া হচ্ছে।

সূত্রগুলো আরও জানায়, অনেক ক্ষেত্রে পুরোনো এলসি, জাল সনদপত্র এবং ভুয়া কাগজপত্র ব্যবহার করে বিদেশি ব্র্যান্ডের পরিচয়ে স্থানীয় পণ্য সরবরাহ করা হয়। এসব যন্ত্রাংশ ব্যবহারের ফলে ইঞ্জিন ও কোচ নির্ধারিত সময়ের আগেই বিকল হয়ে পড়ছে। এতে রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় কয়েকগুণ বেড়ে যাচ্ছে এবং দুর্ঘটনার ঝুঁকিও বাড়ছে।
একাধিক ঠিকাদার অভিযোগ করে বলেন, যন্ত্রাংশ ক্রয় থেকে শুরু করে গ্রহণ পর্যন্ত প্রায় প্রতিটি ধাপেই ঘুষ দিতে হয়। ঘুষ না দিলে ভালো মানের পণ্যকেও বিভিন্ন অজুহাতে বাতিল বা হয়রানি করা হয়। আবার ঘুষ দিলে নিম্নমানের মালামালও সহজেই গ্রহণ করা হয়। ফলে অনেক সরবরাহকারী বাধ্য হয়ে দুর্নীতির এই চক্রের সঙ্গে আপস করেন।
পোর্ট ইন্সপেকশন না হওয়ার বিষয়টি স্বীকার করে জেলা সরঞ্জাম নিয়ন্ত্রক (ডিসিওএস-জি) এম এ মুহিত বলেন, “আমরা যন্ত্রাংশ গ্রহণের পর তা ব্যবহারকারী বিভাগের কাছে পাঠাই। ইউজার সন্তুষ্ট হলে পরবর্তী কার্যক্রম গ্রহণ করা হয়। নিম্নমানের যন্ত্রাংশকে ভালো বলে প্রত্যয়ন দিলে তার দায় ব্যবহারকারী বিভাগের।”

অন্যদিকে পাহাড়তলী ক্যারেজ অ্যান্ড ওয়াগন মেরামত কারখানার ম্যানেজার রাজিব দেবনাথ বলেন, “যন্ত্রাংশের নমুনা মেশিনের মাধ্যমে পরীক্ষা করা হয়। তবে এখানে ব্যবহৃত অধিকাংশ মালামালই দেশীয়, বিদেশি যন্ত্রাংশ তুলনামূলক কম।”

বিষয়টি নিয়ে জাতীয়তাবাদী রেলওয়ে শ্রমিক দলের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক এম আর মনজু বলেন, “বিদেশি যন্ত্রাংশের নামে নিম্নমানের পণ্য সরবরাহ করে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ দীর্ঘদিনের। বিষয়টি গুরুত্বসহকারে তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।”

খাতসংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রেলওয়ের মতো জননিরাপত্তা সংশ্লিষ্ট খাতে যন্ত্রাংশের মান নিয়ে কোনো ধরনের আপস করার সুযোগ নেই। উন্নত বিশ্বে প্রতিটি যন্ত্রাংশ কঠোর পরীক্ষার মাধ্যমে গ্রহণ করা হলেও বাংলাদেশে কাগজে-কলমে বিদেশি ব্র্যান্ড দেখিয়ে বাস্তবে নিম্নমানের পণ্য সরবরাহের অভিযোগ উদ্বেগজনক। তারা মনে করেন, ক্রয় প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত, বাধ্যতামূলক পোর্ট ইন্সপেকশন চালু, স্বাধীন তদন্ত এবং জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ ছাড়া এই অনিয়ম বন্ধ করা সম্ভব নয়।
সচেতন মহলের মতে, কমিশন বাণিজ্য ও দুর্নীতির এই চক্র ভাঙতে না পারলে শুধু রাষ্ট্রীয় অর্থের অপচয়ই নয়, ভবিষ্যতে বড় ধরনের দুর্ঘটনার ঝুঁকিও উড়িয়ে দেওয়া যাবে না।

ট্যাগস :

নিউজটি শেয়ার করুন

বিদেশি যন্ত্রাংশের নামে নকল মাল, রেলে কোটি কোটি টাকার কমিশন বাণিজ্য!

আপডেট সময়ঃ ০৮:২৫:৪৫ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৪ জুন ২০২৬

রিপন চৌধুরী বিশেষ প্রতিনিধি: বাংলাদেশ রেলওয়ের নিরাপত্তা ও সেবার মান নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে বিদেশি অরিজিনাল যন্ত্রাংশ সরবরাহের আড়ালে নিম্নমানের ও নকল খুচরা যন্ত্রাংশ ব্যবহারের অভিযোগে। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, টেন্ডারে বিদেশি ব্র্যান্ডের অরিজিনাল যন্ত্রাংশ সরবরাহের শর্ত থাকলেও বাস্তবে মাত্র ১০ থেকে ২০ শতাংশ আসল যন্ত্রাংশ দেখিয়ে বাকি ৮০ শতাংশ নিম্নমানের বা স্থানীয়ভাবে তৈরি পণ্য সরবরাহ করা হচ্ছে। আর এই অনিয়মের আড়ালে কমিশন বাণিজ্যের মাধ্যমে হাতিয়ে নেওয়া হচ্ছে কোটি কোটি টাকা।

অভিযোগ রয়েছে, রেলওয়ের ইঞ্জিন, বগি, ব্রেকিং সিস্টেম, সিগন্যালিং, বিয়ারিং, কাপলিং ও বিভিন্ন বৈদ্যুতিক যন্ত্রাংশের মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতে বিদেশি পণ্যের নামে নকল বা নিম্নমানের মালামাল সরবরাহ করা হচ্ছে। এতে একদিকে সরকারের বিপুল অর্থ অপচয় হচ্ছে, অন্যদিকে যাত্রী নিরাপত্তা ও সেবার মানও মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়ছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, পাহাড়তলী সিসিএস দপ্তরে বিদেশি যন্ত্রাংশ সরবরাহের জন্য ৩৪টি প্রতিষ্ঠান তালিকাভুক্ত রয়েছে। তবে একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেট দীর্ঘদিন ধরে কমিশনের বিনিময়ে নিম্নমানের যন্ত্রাংশ সরবরাহ করে আসছে বলে অভিযোগ রয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে বাজারমূল্যের চেয়ে ১০ থেকে ১২ গুণ বেশি দামে এসব পণ্য ক্রয় করা হচ্ছে।

রেলওয়ের একাধিক কর্মকর্তা ও ঠিকাদার নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, বিদেশি অরিজিনাল যন্ত্রাংশের নামে নকল পণ্য সরবরাহের বিষয়টি নতুন নয়। বছরের পর বছর ধরে একটি চক্র বিভিন্ন পর্যায়ের অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীদের যোগসাজশে এই অনিয়ম চালিয়ে আসছে। অভিযোগ থাকলেও কার্যকর তদন্ত ও শাস্তির অভাবে তারা আরও বেপরোয়া হয়ে উঠেছে।

তাদের দাবি, মালামাল গ্রহণের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী বাধ্যতামূলক ‘পোর্ট ইন্সপেকশন’ না করায় অনিয়মের সুযোগ সৃষ্টি হচ্ছে। বরং অধিকাংশ ক্ষেত্রে শুধু ব্যবহারকারী বিভাগের মতামতের ওপর নির্ভর করে যন্ত্রাংশ গ্রহণ করা হয়। ফলে মোটা অঙ্কের কমিশনের বিনিময়ে নিম্নমানের যন্ত্রাংশকেও ‘মানসম্মত’ বলে প্রত্যয়ন দেওয়া হচ্ছে।

সূত্রগুলো আরও জানায়, অনেক ক্ষেত্রে পুরোনো এলসি, জাল সনদপত্র এবং ভুয়া কাগজপত্র ব্যবহার করে বিদেশি ব্র্যান্ডের পরিচয়ে স্থানীয় পণ্য সরবরাহ করা হয়। এসব যন্ত্রাংশ ব্যবহারের ফলে ইঞ্জিন ও কোচ নির্ধারিত সময়ের আগেই বিকল হয়ে পড়ছে। এতে রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় কয়েকগুণ বেড়ে যাচ্ছে এবং দুর্ঘটনার ঝুঁকিও বাড়ছে।
একাধিক ঠিকাদার অভিযোগ করে বলেন, যন্ত্রাংশ ক্রয় থেকে শুরু করে গ্রহণ পর্যন্ত প্রায় প্রতিটি ধাপেই ঘুষ দিতে হয়। ঘুষ না দিলে ভালো মানের পণ্যকেও বিভিন্ন অজুহাতে বাতিল বা হয়রানি করা হয়। আবার ঘুষ দিলে নিম্নমানের মালামালও সহজেই গ্রহণ করা হয়। ফলে অনেক সরবরাহকারী বাধ্য হয়ে দুর্নীতির এই চক্রের সঙ্গে আপস করেন।
পোর্ট ইন্সপেকশন না হওয়ার বিষয়টি স্বীকার করে জেলা সরঞ্জাম নিয়ন্ত্রক (ডিসিওএস-জি) এম এ মুহিত বলেন, “আমরা যন্ত্রাংশ গ্রহণের পর তা ব্যবহারকারী বিভাগের কাছে পাঠাই। ইউজার সন্তুষ্ট হলে পরবর্তী কার্যক্রম গ্রহণ করা হয়। নিম্নমানের যন্ত্রাংশকে ভালো বলে প্রত্যয়ন দিলে তার দায় ব্যবহারকারী বিভাগের।”

অন্যদিকে পাহাড়তলী ক্যারেজ অ্যান্ড ওয়াগন মেরামত কারখানার ম্যানেজার রাজিব দেবনাথ বলেন, “যন্ত্রাংশের নমুনা মেশিনের মাধ্যমে পরীক্ষা করা হয়। তবে এখানে ব্যবহৃত অধিকাংশ মালামালই দেশীয়, বিদেশি যন্ত্রাংশ তুলনামূলক কম।”

বিষয়টি নিয়ে জাতীয়তাবাদী রেলওয়ে শ্রমিক দলের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক এম আর মনজু বলেন, “বিদেশি যন্ত্রাংশের নামে নিম্নমানের পণ্য সরবরাহ করে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ দীর্ঘদিনের। বিষয়টি গুরুত্বসহকারে তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।”

খাতসংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রেলওয়ের মতো জননিরাপত্তা সংশ্লিষ্ট খাতে যন্ত্রাংশের মান নিয়ে কোনো ধরনের আপস করার সুযোগ নেই। উন্নত বিশ্বে প্রতিটি যন্ত্রাংশ কঠোর পরীক্ষার মাধ্যমে গ্রহণ করা হলেও বাংলাদেশে কাগজে-কলমে বিদেশি ব্র্যান্ড দেখিয়ে বাস্তবে নিম্নমানের পণ্য সরবরাহের অভিযোগ উদ্বেগজনক। তারা মনে করেন, ক্রয় প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত, বাধ্যতামূলক পোর্ট ইন্সপেকশন চালু, স্বাধীন তদন্ত এবং জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ ছাড়া এই অনিয়ম বন্ধ করা সম্ভব নয়।
সচেতন মহলের মতে, কমিশন বাণিজ্য ও দুর্নীতির এই চক্র ভাঙতে না পারলে শুধু রাষ্ট্রীয় অর্থের অপচয়ই নয়, ভবিষ্যতে বড় ধরনের দুর্ঘটনার ঝুঁকিও উড়িয়ে দেওয়া যাবে না।