নজরদারি এড়িয়ে মার্কিন ব্যাংকিং ব্যবস্থার মাধ্যমে ৯ বিলিয়ন ডলার স্থানান্তর ইরানের
- আপডেট সময়ঃ ০৩:৪৯:১১ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬
- / ১৮ বার পড়া হয়েছে
ইরানের ওপর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা কতটা কার্যকর তা নিয়ে বড়সড় প্রশ্ন তুলেছে নতুন একটি আন্তর্জাতিক বিশ্লেষণ। ওয়াশিংটনের একের পর এক আইনি বেড়াজাল সত্ত্বেও প্রতি বছর শত শত কোটি ডলারের ইরানি অর্থ লেনদেন হচ্ছে মার্কিন ব্যাংকিং ব্যবস্থার মাধ্যমেই। অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ২০২৪ সালেই মার্কিন ট্রেজারি বিভাগ তাদের নিজস্ব ব্যাংকগুলোর মাধ্যমে লেনদেন হওয়া প্রায় ৯ বিলিয়ন ডলারের ইরানি তহবিলের সন্ধান পেয়েছে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠান, ভুয়া কোম্পানি ও মুদ্রা বিনিময় কেন্দ্রের হাত ঘুরে কীভাবে এ অর্থ মার্কিন ব্যাংকে ঢুকছে তা মার্কিন নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোকেও অবাক করেছে।
দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের একটি প্রতিবেদন অনুযায়ী, সরাসরি না হলেও মূলত বিভিন্ন বিদেশি ব্যাংকের মাধ্যমে এ কাজ করছে ইরান। যেসব ব্যাংকের সঙ্গে মার্কিন ব্যাংকগুলোর বাণিজ্যিক লেনদেনের যোগাযোগ রয়েছে, সেগুলোকে মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। অথচ ট্রাম্প প্রশাসন ইরানের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা জোরদার করার কথা জানিয়ে আসছে। যেসব দেশ বা প্রতিষ্ঠান তেহরানের সঙ্গে কোনো ধরনের ব্যবসা করবে, তাদের মার্কিন ব্যাংকিং সুবিধা থেকে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন করার সুস্পষ্ট হুঁশিয়ারিও দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু বাস্তবে সে হুমকিকে একপ্রকার ফাঁকি দিয়েই নিজেদের নগদ অর্থের প্রবাহ সচল রাখছে তেহরান।
ইরানের এ আয়ের প্রধান উৎস জ্বালানি তেল। আন্তর্জাতিক মহলের নজর এড়িয়ে আয় ধরে রাখতে দেশটি কৌশলী সব পন্থা অবলম্বন করছে। মার্কিন চাপের কারণে সরাসরি তেল বিক্রি বাধাগ্রস্ত হলেও সমুদ্রের বুকে ভাসমান ট্যাংকারে বিপুল পরিমাণ অপরিশোধিত তেল জমিয়ে রাখা হচ্ছে। এসব তেলের বড় অংশ রাখা আছে এশিয়ার উপকূলীয় এলাকায়। বিশেষ করে মালয়েশিয়ার আশপাশের সমুদ্রে। ভর্টেক্সার হিসাব অনুযায়ী, প্রায় ৮ কোটি ব্যারেল ইরানি অপরিশোধিত তেল এখন এশীয় জলসীমায় ভাসমান অবস্থায় রয়েছে। এর বাজারমূল্য শত শত কোটি ডলার।
ইরানি তেলের সবচেয়ে বড় ক্রেতা চীন। তাদের মোট রপ্তানি হওয়া তেলের ৮০ শতাংশের বেশি একাই কিনে নেয় বেইজিং। শিপিং তথ্য সংস্থা কেপলারের বরাতে জানা যায়, আগস্ট মাসেই চীন প্রতিদিন গড়ে ৫ লাখ ব্যারেলের বেশি ইরানি তেল আমদানি করেছে। আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা এড়াতে সমুদ্রে এক জাহাজ থেকে অন্য জাহাজে তেল বদল করা হয়। এরপর অন্য দেশের কাগজ বানিয়ে সে তেল চীনে পাঠানো হয়, যাতে এর আসল উৎস ধরা না পড়ে। শুধু তা-ই নয়, ডলারের নির্ভরতা এড়াতে চীনা ক্রেতাদের সঙ্গে তেলের লেনদেন হচ্ছে ইউয়ানে। কখনও বা তেলের সরাসরি বিনিময়ে চীনা কোম্পানি দিয়ে দেশের ভেতরের বড় বড় অবকাঠামোগত উন্নয়ন করছে ইরান।
ডলারের ওপর নির্ভরতা কমাতে চীনা মুদ্রার পাশাপাশি ক্রিপ্টোকারেন্সির দিকেও ব্যাপকভাবে ঝুঁকেছে দেশটি। ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) থেকে শুরু করে বিভিন্ন ব্যবসায়ী নেটওয়ার্ক অস্ত্র কেনাবেচা, আন্তর্জাতিক পণ্য সংগ্রহ এবং তেলের মূল্য পরিশোধের জন্য শত শত কোটি ডলার সমপরিমাণ ক্রিপ্টোকারেন্সি ব্যবহার করছে। কিন্তু তা সত্ত্বেও, সামরিক সরঞ্জাম কেনা, প্রয়োজনীয় পণ্য আমদানি এবং আঞ্চলিক মিত্রদের অর্থ জোগাতে ইরানের আজও ডলার, ইউরো বা দিরহামের মতো শক্তিশালী মুদ্রার প্রয়োজন হয়। এ চাহিদা মেটাতে তারা হংকং ও দুবাইয়ের মতো বৈশ্বিক অর্থকেন্দ্রে ভুয়া কোম্পানি ও এক্সচেঞ্জ হাউসের এক বিশাল নেটওয়ার্ক তৈরি করেছে।
এ ছায়া কোম্পানিগুলো অত্যন্ত গোপনে তেলের আয় ও অন্যান্য রপ্তানি আয়কে মার্কিন ডলার বা দিরহামে রূপান্তর করে নেয়। এর ফলে টাকার আসল উৎস যে ইরান তা নজরদারির বাইরেই থেকে যায়। যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেজারি বিভাগ একের পর এক ব্যাংক ও প্রতিষ্ঠানের ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা চাপিয়ে এ অর্থের প্রবেশ ঠেকানোর চেষ্টা করছে। কিন্তু একটি ভুয়া প্রতিষ্ঠান বন্ধ হতে না হতেই গজিয়ে উঠছে নতুন আরেকটি। ফলে একের পর এক নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও ইরানের এ জটিল ও কৌশলগত অর্থনৈতিক জালকে পুরোপুরি ছিন্ন করা ওয়াশিংটনের জন্য এক বিশাল চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সূত্র: এনডিটিভি























