নিলামে পণ্য বিক্রি করে প্রায় ৬০০ কোটি টাকা আয় কাস্টমসের
- আপডেট সময়ঃ ০৯:৪৭:১৫ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬
- / ১৫ বার পড়া হয়েছে
রিপন চৌধুরী বিশেষ প্রতিনিধি: চট্টগ্রাম বন্দরে দীর্ঘদিন পড়ে থাকা আমদানি করা পণ্য ও কনটেইনার নিলামে তুলে রাজস্ব আদায়ে বড় ধরনের সাফল্য দেখিয়েছে চট্টগ্রাম কাস্টমস। ২০২১ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত সাড়ে পাঁচ বছরে অনলাইন ও প্রকাশ্য নিলামের মাধ্যমে পণ্য বিক্রি করে রাজস্ব এসেছে প্রায় ৫৯৯ কোটি ৫৯ লাখ টাকা। এর মধ্যে শুধু ২০২৫ সাল থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত দেড় বছরেই আয় হয়েছে ২৮৫ কোটি ১৫ লাখ টাকা।
কাস্টমসের নিলাম-সংক্রান্ত তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, সাম্প্রতিক সময়ে নিলামের সংখ্যা ও বিক্রি হওয়া পণ্যের পরিমাণের পাশাপাশি রাজস্ব আদায়েও বড় উল্লম্ফন ঘটেছে। বিশেষ করে ২০২৫ সাল এবং চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসের আয় আগের কয়েক বছরের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি।
তবে বিপুল অঙ্কের এই রাজস্ব আদায়ের পাশাপাশি প্রশ্ন উঠেছে—কেন বছরের পর বছর বিপুল পরিমাণ পণ্য বন্দরে পড়ে থাকছে, কেন সেগুলো দ্রুত খালাস বা নিষ্পত্তি হচ্ছে না এবং নিলামের আগে এসব পণ্যের মূল্যায়ন ও তালিকা তৈরির প্রক্রিয়া কতটা স্বচ্ছ? সংশ্লিষ্টরা বলছেন, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) বিশেষ উদ্যোগে দীর্ঘদিন পড়ে থাকা কনটেইনার দ্রুত খালি করার কাজ চলছে।
চট্টগ্রাম কাস্টমসের তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ সালে ২৪টি নিলামে ১ হাজার ৮১৪টি লট বিক্রি করে ১১৫ কোটি ৬৪ লাখ টাকা রাজস্ব আদায় হয়। পরের বছর ৪২টি নিলামের মাধ্যমে ১ হাজার ৩৮১টি লট বিক্রি করে আয় হয় ১৩০ কোটি ৩৭ লাখ টাকা।
তবে এরপর নিলাম ও রাজস্ব আদায়ে কিছুটা নিম্নমুখী প্রবণতা দেখা যায়। ২০২৩ সালে ২৩টি নিলামে ৬৩২টি লট বিক্রি করে আয় হয় ৪১ কোটি ১৩ লাখ টাকা। ২০২৪ সালে ৫৫টি নিলামের মাধ্যমে ৫১১টি লট বিক্রি করে রাজস্ব আসে মাত্র ২৭ কোটি ২৯ লাখ টাকা।
এরপর পরিস্থিতি পাল্টে যায়। ২০২৫ সালে ৬০টি নিলামে ১ হাজার ৪০টি লট বিক্রি করে ১২৭ কোটি ৬৭ লাখ টাকা আয় করে চট্টগ্রাম কাস্টমস।
চলতি বছরের জুন পর্যন্ত মাত্র ছয় মাসে অনুষ্ঠিত হয়েছে ৪৫টি অনলাইন ও প্রকাশ্য নিলাম। এসব নিলামে ৩৮৩টি লট বিক্রি করে আয় হয়েছে ১৫৭ কোটি ৪৮ লাখ টাকা।
অর্থাৎ, ২০২৫ সালের পুরো বছরের তুলনায় চলতি বছরের মাত্র ছয় মাসেই নিলাম থেকে প্রায় ৩০ কোটি টাকা বেশি রাজস্ব এসেছে।
নিলামের পেছনে মূল কারণ দীর্ঘদিন পড়ে থাকা পণ্য কাস্টমস কর্মকর্তারা জানান, দীর্ঘদিন ধরে চট্টগ্রাম বন্দরে পড়ে থাকা কনটেইনারের কারণে বন্দরের ইয়ার্ডে জায়গার সংকট তৈরি হয়। এসব পণ্য নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে আমদানিকারকরা খালাস না করলে আইন অনুযায়ী নিলামযোগ্য পণ্য নিলামে তোলা হয়।
এনবিআর দীর্ঘদিন পড়ে থাকা কনটেইনার দ্রুত খালি করার জন্য বিশেষ উদ্যোগ নিয়েছে। এর আওতায় নিলামযোগ্য পণ্য নিলামে বিক্রি এবং নিলামের উপযোগী নয় এমন পণ্য ধ্বংস করা হচ্ছে।
চট্টগ্রাম কাস্টমসের নিলাম শাখার সহকারী কমিশনার আবু সুফিয়ান বলেন, এনবিআরের নির্দেশনা অনুযায়ী খালাস না হওয়া পণ্য অনলাইন ও প্রকাশ্য নিলামের মাধ্যমে বিক্রি করা হচ্ছে। নিলামের সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে রাজস্ব আয়ও বেড়েছে।
তিনি জানান, নিলামের উপযোগী নয়—এমন পণ্যও সরিয়ে বন্দরের ইয়ার্ড খালি করার প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।
বছর
নিলামের সংখ্যা
বিক্রি হওয়া লট
রাজস্ব
২০২১
২৪
১,৮১৪
১১৫.৬৪ কোটি টাকা
২০২২
৪২
১,৩৮১
১৩০.৩৭ কোটি টাকা
২০২৩
২৩
৬৩২
৪১.১৩ কোটি টাকা
২০২৪
৫৫
৫১১
২৭.২৯ কোটি টাকা
২০২৫
৬০
১,০৪০
১২৭.৬৭ কোটি টাকা
২০২৬ (জুন পর্যন্ত)
৪৫
৩৮৩
১৫৭.৪৮ কোটি টাকা
নিলামের তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, নিলামের সংখ্যা বাড়লেই যে রাজস্ব বাড়বে—এমন সরল সম্পর্ক নেই। ২০২৪ সালে ৫৫টি নিলামে ৫১১টি লট বিক্রি হলেও রাজস্ব ছিল মাত্র ২৭ কোটি ২৯ লাখ টাকা। বিপরীতে ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে ৪৫টি নিলামেই আয় হয়েছে ১৫৭ কোটি ৪৮ লাখ টাকা।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো প্রতি লটে গড়ে কত মূল্যের পণ্য বিক্রি হয়েছে। ২০২৪ সালে প্রতি বিক্রি হওয়া লটে গড় রাজস্ব ছিল প্রায় ৫ লাখ ৩৪ হাজার টাকা। আর ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে তা দাঁড়িয়েছে প্রায় ৪১ লাখ ১২ হাজার টাকা। অর্থাৎ শুধু নিলামের সংখ্যা নয়, সাম্প্রতিক সময়ে উচ্চমূল্যের পণ্য নিলামে ওঠার বিষয়টিও রাজস্ব বৃদ্ধির অন্যতম কারণ বলে পরিসংখ্যান থেকে ধারণা পাওয়া যায়।
এ কারণে নিলাম ব্যবস্থার স্বচ্ছতা, পণ্যের মূল্যায়ন এবং লট তৈরির পদ্ধতি আরও নিবিড়ভাবে পর্যালোচনার দাবি রাখে।
চট্টগ্রাম কাস্টমসের নিলাম ব্যবস্থাপনা ও শ্রমিক ঠিকাদার হিসেবে দায়িত্ব পালন করছে কে এম করপোরেশন। প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপক মোহাম্মদ মোরশেদ জানান, কাস্টমস কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা অনুযায়ী তাদের প্রতিষ্ঠান দীর্ঘদিন ধরে নিলাম ব্যবস্থাপনা, পণ্যের তালিকা বা ইনভেন্টরি তৈরি এবং নিলামে বিক্রি হওয়া পণ্য ক্রেতার কাছে বুঝিয়ে দেওয়ার কাজে যুক্ত।
তার দাবি, ২০২৫ সাল থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত নিলামের মাধ্যমে ২৮৫ কোটি ১৫ লাখ টাকা আয় হয়েছে, যা স্বল্প সময়ে নিলাম থেকে রাজস্ব আদায়ের ক্ষেত্রে একটি রেকর্ড।
নিলামে বিপুল রাজস্ব আদায় সরকারের জন্য ইতিবাচক হলেও এর আরেকটি দিকও রয়েছে। বছরের পর বছর আমদানিকারকদের খালাস না করা পণ্য বন্দরে পড়ে থাকার অর্থ হলো—বন্দর ইয়ার্ডের জায়গা দীর্ঘ সময় আটকে রাখা এবং বন্দরের স্বাভাবিক কার্যক্রমে চাপ সৃষ্টি করা।
প্রশ্ন হচ্ছে, নিলামে বিক্রির মাধ্যমে যদি বিপুল রাজস্ব আদায় সম্ভব হয়, তাহলে এসব পণ্য এত দীর্ঘ সময় বন্দরে পড়ে থাকার কারণ কী? নিলামযোগ্য হওয়ার আগেই পণ্য শনাক্তকরণ ও নিষ্পত্তির প্রক্রিয়া আরও দ্রুত করা যায় কি না, সেটিও এখন আলোচনার বিষয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, নিলামকে শুধু রাজস্ব আদায়ের মাধ্যম হিসেবে দেখলে হবে না; এর অন্যতম লক্ষ্য হওয়া উচিত বন্দরের জায়গা দ্রুত খালি করা, আমদানি পণ্যের জট কমানো এবং সরকারি সম্পদের কার্যকর ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা।
চট্টগ্রাম কাস্টমসের সাম্প্রতিক নিলাম রাজস্বের পরিসংখ্যান বলছে, দীর্ঘদিন পড়ে থাকা পণ্য দ্রুত নিষ্পত্তির মাধ্যমে সরকার বড় অঙ্কের রাজস্ব আদায় করতে পারে। একই সঙ্গে বন্দরের ইয়ার্ডও খালি করা সম্ভব।
তবে নিলামের পরিমাণ ও রাজস্ব যত বাড়বে, নিলাম প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা, পণ্যের সঠিক মূল্যায়ন, লট তৈরির যৌক্তিকতা, ক্রেতা নির্বাচনের প্রক্রিয়া এবং নিলাম-পরবর্তী পণ্য হস্তান্তর—এসব বিষয়ে নজরদারিও তত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
কারণ, ২০২৬ সালের মাত্র ছয় মাসে ১৫৭ কোটি ৪৮ লাখ টাকা রাজস্ব আদায়ের ঘটনা যেমন চট্টগ্রাম কাস্টমসের সক্ষমতার নতুন দৃষ্টান্ত, তেমনি বন্দরে দীর্ঘদিন পড়ে থাকা পণ্যের বিশাল জটেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত।



















