সরকারকে সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভূতে ধরেছে: মিয়া গোলাম পরওয়ার
- আপডেট সময়ঃ ০৫:৫১:২৯ অপরাহ্ন, সোমবার, ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬
- / ৪ বার পড়া হয়েছে
বর্তমান সরকারের মধ্যে ‘সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভূত’ ভর করেছে বলে মন্তব্য করেছেন জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার। তার অভিযোগ, সংখ্যাগরিষ্ঠতার শক্তি ব্যবহার করে জনগণের মতামত উপেক্ষা করে সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রবণতা তৈরি হয়েছে। এভাবে চললে অতীতের বিভিন্ন সরকারের মতো বর্তমান সরকারও ফ্যাসিবাদী ও কর্তৃত্ববাদী হয়ে উঠতে পারে বলে সতর্ক করেন তিনি।
সোমবার (২১ সেপ্টেম্বর) সকালে জাতীয় প্রেসক্লাবে জামায়াতে ইসলামীর তথ্য ও সম্প্রচার বিভাগের আয়োজনে ‘সাইবার সুরক্ষা আইন ২০২৬: নিরাপত্তা, নিয়ন্ত্রণ নাকি বাকস্বাধীনতা দমন?’ শীর্ষক সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন গোলাম পরওয়ার।
তিনি বলেন, আগে বিরোধী দলকে ‘ভূতে ধরেছে’ বলা হলেও এখন মনে হচ্ছে সরকারকেই ভূতে ধরেছে। সরকারের মধ্যে অস্থিরতা ও দ্বিধাদ্বন্দ্ব দেখা দিয়েছে। সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে জনগণের রায়কে পাশ কাটিয়ে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া গ্রহণযোগ্য নয় বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
সাইবার আইন নিয়ে গোলাম পরওয়ার বলেন, প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ার সঙ্গে সাইবার অপরাধও বৃদ্ধি পেয়েছে। তাই প্রয়োজন অনুযায়ী আইন প্রণয়ন বা সংশোধনের প্রয়োজন হতে পারে। তবে ২০২৫ সালে জারি করা সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশকে ২০২৬ সালে আইনে রূপ দেওয়ার কয়েক মাসের মধ্যেই আবার সংশোধনের উদ্যোগ কেন নেওয়া হচ্ছে, সে বিষয়ে সরকারের ব্যাখ্যা প্রয়োজন।
তার ভাষ্য, আগের সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশে বেশ কিছু বিতর্কিত বিধান বাতিল ও পরিবর্তন করা হয়েছিল। অথচ আইনটি কার্যকর হওয়ার অল্প সময়ের মধ্যেই নতুন সংশোধনীর প্রস্তাব এসেছে। এত কম সময়ের ব্যবধানে আবার কী কারণে সংশোধনের প্রয়োজন হলো, সরকারকে তা স্পষ্ট করতে হবে।
প্রস্তাবিত সংশোধনীর বিভিন্ন ধারা নিয়ে উদ্বেগ জানিয়ে জামায়াতের এই নেতা বলেন, মানহানি, গুজব, অসত্য তথ্য, তল্লাশি ও জব্দের মতো বিষয়ে আইনে অস্পষ্টতা থাকলে তার অপব্যবহারের সুযোগ তৈরি হতে পারে। এর ফলে সাংবাদিক ও রাজনৈতিক নেতাদের বিরুদ্ধে এসব বিধান ব্যবহারের আশঙ্কা রয়েছে। বিশেষ করে জামিন অযোগ্য ধারাগুলো বাতিলের দাবি জানান তিনি।
গোলাম পরওয়ার আরও বলেন, ‘গুজব’, ‘অপতথ্য’ ও ‘ভুল তথ্য’-এর মতো শব্দের সুনির্দিষ্ট সংজ্ঞা থাকা জরুরি। তা না হলে আইনের অপব্যবহারের মাধ্যমে বিরোধী রাজনৈতিক নেতা-কর্মীদের আটকের সুযোগ তৈরি হতে পারে।
বিদ্যমান সাইবার সুরক্ষা আইন বহাল রেখে প্রস্তাবিত সংশোধনীগুলো আপাতত প্রত্যাহারের আহ্বান জানান তিনি। তার মতে, আইনের খুঁটিনাটি নিয়ে ব্যস্ত না থেকে সরকারের উচিত জনগণের মনোভাব বোঝা। রাজপথের মিছিলের স্লোগান, পোস্টার ও দেয়াললিখনের মাধ্যমেও জনগণের মতামত প্রকাশ পায় বলে উল্লেখ করেন তিনি।
জনগণের রায়ের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করলে সরকার জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়বে বলেও মন্তব্য করেন গোলাম পরওয়ার। তার ভাষ্য, সাইবার সুরক্ষা আইন সংশোধনের মাধ্যমে রাজনৈতিক নেতা ও সাংবাদিকদের ওপর ‘কালাকানুন’ চাপিয়ে দেওয়া হলে তা সরকারের জন্য আরও জটিল পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে।
আইন প্রণয়নের পাশাপাশি এর প্রয়োগকারী ব্যক্তিদের ভূমিকার ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি। গোলাম পরওয়ার বলেন, ইংরেজিতে একটি কথা আছে—‘ম্যান বিহাইন্ড দ্য মেশিন’। কোনো শাসকের চরিত্র কর্তৃত্ববাদী হলে আইনকে অপব্যাখ্যা, অপব্যবহার ও ভুল প্রয়োগের মাধ্যমে নিরপরাধ মানুষকেও শাস্তির মুখে পড়তে হতে পারে।
সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন মানারাত ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির জার্নালিজম অ্যান্ড মিডিয়া স্টাডিজ বিভাগের বিভাগীয় প্রধান রফিকুজ্জামান রুমান। তিনি সাইবার সুরক্ষা আইন ২০২৬-এর বিভিন্ন ধারা, সম্ভাব্য প্রভাব এবং নাগরিকের মতপ্রকাশের স্বাধীনতার সঙ্গে আইনের সম্পর্ক তুলে ধরেন।
প্রবন্ধে সাইবার নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি নাগরিক অধিকার, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও আইনের শাসন সমুন্নত রাখার লক্ষ্যে ১৬টি সুপারিশ দেওয়া হয়। এতে প্রকৃত সাইবার অপরাধকে আইনের মূল বিষয় হিসেবে নির্ধারণ, মতপ্রকাশ ও সাইবার অপরাধকে আলাদাভাবে বিবেচনা, অস্পষ্ট ও ব্যাপক অর্থবোধক শব্দের ব্যবহার কমানো এবং মানহানিকে সাইবার অপরাধের আওতায় না আনার প্রস্তাব করা হয়েছে। পাশাপাশি গুজব ও অপতথ্যের ক্ষেত্রে ইচ্ছাকৃত ক্ষতির বিষয়টি প্রমাণের বাধ্যবাধকতার কথাও বলা হয়।
এ ছাড়া গুজব শনাক্তে স্বাধীন ও যাচাইযোগ্য ব্যবস্থা, ১০ বছরের কারাদণ্ড ও ৪০ লাখ টাকা জরিমানার বিধান পুনর্বিবেচনা, কনটেন্ট ব্লকের কারণ প্রকাশ এবং গ্রেপ্তার ও তল্লাশির ক্ষেত্রে আদালতের অনুমতির গুরুত্ব বাড়ানোর সুপারিশ করা হয়েছে। জামিনের সুযোগ নিশ্চিত করা এবং সাংবাদিকদের বিশেষ সুরক্ষা দেওয়ার বিষয়টিও প্রস্তাবে রয়েছে।
প্রস্তাবনায় কোম্পানির লাইসেন্স বাতিলের বিধান সীমিত করা, ডিজিটাল কনটেন্ট অপসারণে স্বচ্ছ প্রক্রিয়া চালু, সাইবার অপরাধ তদন্তে দক্ষতা বাড়ানো, আইনের রাজনৈতিক অপব্যবহার বন্ধ এবং সাইবার সচেতনতা বৃদ্ধির ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।



















