ঢাকা, সোমবার, ২৯ জুন ২০২৬ | ই-পেপার

ব্লু-ইকোনমির সম্ভাবনা উন্মোচনে গভীর সমুদ্রে বিনিয়োগের আহ্বান বিশেষজ্ঞদের

দৈনিক আইন বার্তা
  • আপডেট সময়ঃ ০৫:১০:৩৯ অপরাহ্ন, সোমবার, ২৯ জুন ২০২৬
  • / ১৩ বার পড়া হয়েছে

সমন্বিত নীতি ও বেসরকারি খাতের অংশগ্রহণের মাধ্যমে বাংলাদেশ বছরে প্রায় ১৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলার মূল্যের ব্লু-ইকোনমি বা সুনীল অর্থনীতির সম্ভাবনা উন্মোচন করতে পারে উল্লেখ করে আজ সামুদ্রিক বিশেষজ্ঞ ও নীতি-নির্ধারকরা গভীর সমুদ্রে মৎস্য আহরণ, সামুদ্রিক বায়োটেকনোলজি এবং মূল্য সংযোজিত সি-ফুড প্রক্রিয়াজাতকরণে কৌশলগত বিনিয়োগের আহ্বান জানিয়েছেন।

সুনীল অর্থনীতির ওপর আয়োজিত এক সেমিনারে মহেশখালী সমন্বিত উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (মিডা) নির্বাহী চেয়ারম্যান চৌধুরী আশিক মাহমুদ বিন হারুন বলেন, বাংলাদেশকে ভূমি-কেন্দ্রিক উন্নয়ন মডেল থেকে সরে এসে বঙ্গোপসাগরকে ভবিষ্যতের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে স্বীকৃতি দিতে হবে।

তিনি বলেন, ‘মৎস্য, সি-ফুড প্রক্রিয়াজাতকরণ, লজিস্টিকস এবং রপ্তানি একটি একক সমন্বিত মূল্য শৃঙ্খলের অংশ। এ খাতগুলোর উন্নয়নে সরকারি বিভিন্ন সংস্থার সমন্বিত সহযোগিতা প্রয়োজন।’

মিডা এবং জাইকা বাংলাদেশ যৌথভাবে রাজধানীর একটি হোটেলে ‘বাংলাদেশে মৎস্য ও সামুদ্রিক অর্থনীতিতে বিনিয়োগের সম্ভাবনা’ শীর্ষক এই সেমিনারের আয়োজন করে।

মাতারবাড়ি ও মহেশখালীকে ভবিষ্যতের সামুদ্রিক শিল্প উন্নয়নের কৌশলগত কেন্দ্র হিসেবে বর্ণনা করে আশিক চৌধুরী বলেন, বেসরকারি খাতের চাহিদা অনুযায়ী একটি সমন্বিত বিনিয়োগ প্যাকেজ তৈরি করতে মিডা সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোর নীতিমালার মধ্যে সমন্বয় সাধনে কাজ করছে।

তিনি বলেন, সরকারের সমন্বিত পদক্ষেপ এবং বেসরকারি বিনিয়োগের মাধ্যমে আগামী তিন থেকে পাঁচ বছরের মধ্যে বাংলাদেশ বিশ্বের একটি অন্যতম প্রধান মৎস্য রপ্তানিকারক দেশ হিসেবে আবির্ভূত হতে পারে।

মূল প্রবন্ধ উপস্থাপনকালে অবসরপ্রাপ্ত রিয়ার অ্যাডমিরাল খুরশেদ আলম বলেন, বর্তমানে বাংলাদেশ সামুদ্রিক সম্পদ থেকে বছরে প্রায় ৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলার আয় করছে। তবে সমুদ্র সম্পদের টেকসই ব্যবহারের মাধ্যমে এ আয় দ্বিগুণ, এমনকি তিনগুণ পর্যন্ত বাড়ানোর সম্ভাবনা রয়েছে।

তিনি বলেন, দেশের ভবিষ্যৎ ব্লু-ইকোনমি চারটি স্তম্ভের ওপর গড়ে তোলা উচিত প্রকৃতির সাথে সাদৃশ্য, জলবায়ু নিরপেক্ষতা, টেকসই উপকূলীয় জনগোষ্ঠী এবং সমন্বিত শাসন ব্যবস্থা।

বাংলাদেশের অব্যবহৃত সামুদ্রিক সম্পদের কথা তুলে ধরে খুরশেদ আলম বলেন, দেশের বিশাল সমুদ্রসীমা থাকা সত্ত্বেও মৎস্য উৎপাদনের মাত্র ১৫-১৬ শতাংশ আসে সামুদ্রিক মৎস্য খাত থেকে।

তিনি বলেন, প্রচলিত মাছ ধরার নৌকাগুলো উপকূল থেকে মাত্র ২০ থেকে ৪০ কিলোমিটার দূর পর্যন্ত যেতে পারে। ফলে বাংলাদেশের এক্সক্লুসিভ ইকোনমিক জোন (ইইজেড)-এর বড় অংশই কার্যত অব্যবহৃত থেকে যায়।

তিনি আধুনিক গভীর সমুদ্রগামী মাছ ধরার জাহাজে বিনিয়োগের জন্য উদ্যোক্তাদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, বাংলাদেশের সমুদ্রসীমায় বাণিজ্যিকভাবে অত্যন্ত মূল্যবান টুনাসহ বড় আকারের বিভিন্ন মাছের প্রজাতি এখনও পর্যাপ্তভাবে আহরণ করা হয় না।

খুরশেদ আলম সামুদ্রিক জৈবপ্রযুক্তির সম্ভাবনার ওপরও গুরুত্বারোপ করে বলেন, সমুদ্রভিত্তিক সম্পদ ব্যবহার করে ওষুধ, ওমেগা-৩ খাদ্য-পরিপূরক, প্রসাধনী, সামুদ্রিক শৈবাল থেকে অ্যাগার এবং গবাদিপশু ও মাছের খাদ্য উৎপাদন সম্ভব। এর মাধ্যমে নতুন রপ্তানি বাজার সৃষ্টি হবে এবং আমদানিনির্ভরতা কমবে।

আইসল্যান্ডের মৎস্য খাতের উদাহরণ তুলে ধরে তিনি বলেন, মাছের প্রতিটি অংশের সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করে উচ্চমূল্যের শিল্প ও ওষুধ শিল্পের কাঁচামাল উৎপাদনের মাধ্যমে বাংলাদেশও রপ্তানি আয় উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়াতে পারে।

তিনি সামুদ্রিক শিল্পে আর্থিক প্রণোদনা, উপকূলীয় ও দ্বীপাঞ্চলে উন্নত অবকাঠামো, গভীর সমুদ্রে মাছ আহরণ কার্যক্রম দ্রুত বাস্তবায়ন এবং দেশের সামুদ্রিক অর্থনীতি সম্পর্কে গণমাধ্যমে আরো বেশি গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানান।

সেমিনারে বিশেষজ্ঞ, নীতিনির্ধারক, উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা এবং ব্যবসায়ী প্রতিনিধিরা অংশ নেন। তারা বাংলাদেশের সুনীল অর্থনীতিতে সামুদ্রিক সম্পদের টেকসই ব্যবহার এবং বিনিয়োগের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা করেন।

ট্যাগস :

নিউজটি শেয়ার করুন

ব্লু-ইকোনমির সম্ভাবনা উন্মোচনে গভীর সমুদ্রে বিনিয়োগের আহ্বান বিশেষজ্ঞদের

আপডেট সময়ঃ ০৫:১০:৩৯ অপরাহ্ন, সোমবার, ২৯ জুন ২০২৬

সমন্বিত নীতি ও বেসরকারি খাতের অংশগ্রহণের মাধ্যমে বাংলাদেশ বছরে প্রায় ১৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলার মূল্যের ব্লু-ইকোনমি বা সুনীল অর্থনীতির সম্ভাবনা উন্মোচন করতে পারে উল্লেখ করে আজ সামুদ্রিক বিশেষজ্ঞ ও নীতি-নির্ধারকরা গভীর সমুদ্রে মৎস্য আহরণ, সামুদ্রিক বায়োটেকনোলজি এবং মূল্য সংযোজিত সি-ফুড প্রক্রিয়াজাতকরণে কৌশলগত বিনিয়োগের আহ্বান জানিয়েছেন।

সুনীল অর্থনীতির ওপর আয়োজিত এক সেমিনারে মহেশখালী সমন্বিত উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (মিডা) নির্বাহী চেয়ারম্যান চৌধুরী আশিক মাহমুদ বিন হারুন বলেন, বাংলাদেশকে ভূমি-কেন্দ্রিক উন্নয়ন মডেল থেকে সরে এসে বঙ্গোপসাগরকে ভবিষ্যতের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে স্বীকৃতি দিতে হবে।

তিনি বলেন, ‘মৎস্য, সি-ফুড প্রক্রিয়াজাতকরণ, লজিস্টিকস এবং রপ্তানি একটি একক সমন্বিত মূল্য শৃঙ্খলের অংশ। এ খাতগুলোর উন্নয়নে সরকারি বিভিন্ন সংস্থার সমন্বিত সহযোগিতা প্রয়োজন।’

মিডা এবং জাইকা বাংলাদেশ যৌথভাবে রাজধানীর একটি হোটেলে ‘বাংলাদেশে মৎস্য ও সামুদ্রিক অর্থনীতিতে বিনিয়োগের সম্ভাবনা’ শীর্ষক এই সেমিনারের আয়োজন করে।

মাতারবাড়ি ও মহেশখালীকে ভবিষ্যতের সামুদ্রিক শিল্প উন্নয়নের কৌশলগত কেন্দ্র হিসেবে বর্ণনা করে আশিক চৌধুরী বলেন, বেসরকারি খাতের চাহিদা অনুযায়ী একটি সমন্বিত বিনিয়োগ প্যাকেজ তৈরি করতে মিডা সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোর নীতিমালার মধ্যে সমন্বয় সাধনে কাজ করছে।

তিনি বলেন, সরকারের সমন্বিত পদক্ষেপ এবং বেসরকারি বিনিয়োগের মাধ্যমে আগামী তিন থেকে পাঁচ বছরের মধ্যে বাংলাদেশ বিশ্বের একটি অন্যতম প্রধান মৎস্য রপ্তানিকারক দেশ হিসেবে আবির্ভূত হতে পারে।

মূল প্রবন্ধ উপস্থাপনকালে অবসরপ্রাপ্ত রিয়ার অ্যাডমিরাল খুরশেদ আলম বলেন, বর্তমানে বাংলাদেশ সামুদ্রিক সম্পদ থেকে বছরে প্রায় ৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলার আয় করছে। তবে সমুদ্র সম্পদের টেকসই ব্যবহারের মাধ্যমে এ আয় দ্বিগুণ, এমনকি তিনগুণ পর্যন্ত বাড়ানোর সম্ভাবনা রয়েছে।

তিনি বলেন, দেশের ভবিষ্যৎ ব্লু-ইকোনমি চারটি স্তম্ভের ওপর গড়ে তোলা উচিত প্রকৃতির সাথে সাদৃশ্য, জলবায়ু নিরপেক্ষতা, টেকসই উপকূলীয় জনগোষ্ঠী এবং সমন্বিত শাসন ব্যবস্থা।

বাংলাদেশের অব্যবহৃত সামুদ্রিক সম্পদের কথা তুলে ধরে খুরশেদ আলম বলেন, দেশের বিশাল সমুদ্রসীমা থাকা সত্ত্বেও মৎস্য উৎপাদনের মাত্র ১৫-১৬ শতাংশ আসে সামুদ্রিক মৎস্য খাত থেকে।

তিনি বলেন, প্রচলিত মাছ ধরার নৌকাগুলো উপকূল থেকে মাত্র ২০ থেকে ৪০ কিলোমিটার দূর পর্যন্ত যেতে পারে। ফলে বাংলাদেশের এক্সক্লুসিভ ইকোনমিক জোন (ইইজেড)-এর বড় অংশই কার্যত অব্যবহৃত থেকে যায়।

তিনি আধুনিক গভীর সমুদ্রগামী মাছ ধরার জাহাজে বিনিয়োগের জন্য উদ্যোক্তাদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, বাংলাদেশের সমুদ্রসীমায় বাণিজ্যিকভাবে অত্যন্ত মূল্যবান টুনাসহ বড় আকারের বিভিন্ন মাছের প্রজাতি এখনও পর্যাপ্তভাবে আহরণ করা হয় না।

খুরশেদ আলম সামুদ্রিক জৈবপ্রযুক্তির সম্ভাবনার ওপরও গুরুত্বারোপ করে বলেন, সমুদ্রভিত্তিক সম্পদ ব্যবহার করে ওষুধ, ওমেগা-৩ খাদ্য-পরিপূরক, প্রসাধনী, সামুদ্রিক শৈবাল থেকে অ্যাগার এবং গবাদিপশু ও মাছের খাদ্য উৎপাদন সম্ভব। এর মাধ্যমে নতুন রপ্তানি বাজার সৃষ্টি হবে এবং আমদানিনির্ভরতা কমবে।

আইসল্যান্ডের মৎস্য খাতের উদাহরণ তুলে ধরে তিনি বলেন, মাছের প্রতিটি অংশের সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করে উচ্চমূল্যের শিল্প ও ওষুধ শিল্পের কাঁচামাল উৎপাদনের মাধ্যমে বাংলাদেশও রপ্তানি আয় উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়াতে পারে।

তিনি সামুদ্রিক শিল্পে আর্থিক প্রণোদনা, উপকূলীয় ও দ্বীপাঞ্চলে উন্নত অবকাঠামো, গভীর সমুদ্রে মাছ আহরণ কার্যক্রম দ্রুত বাস্তবায়ন এবং দেশের সামুদ্রিক অর্থনীতি সম্পর্কে গণমাধ্যমে আরো বেশি গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানান।

সেমিনারে বিশেষজ্ঞ, নীতিনির্ধারক, উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা এবং ব্যবসায়ী প্রতিনিধিরা অংশ নেন। তারা বাংলাদেশের সুনীল অর্থনীতিতে সামুদ্রিক সম্পদের টেকসই ব্যবহার এবং বিনিয়োগের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা করেন।