পাহাড়তলী ডিজেল শপে ‘শফিক সিন্ডিকেট’-এর দাপট, ১৮ হাজার টাকার বিল ২–৩ হাজারের পার্টসের
- আপডেট সময়ঃ ০৫:৪৭:৪২ অপরাহ্ন, শনিবার, ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬
- / ৬ বার পড়া হয়েছে
রিপন চৌধুরী বিশেষ প্রতিনিধি: এক দফা নয়, কমিশন নেওয়া হয় তিন দফায়—যন্ত্রাংশের চাহিদাপত্র তৈরির সময়, কেনাকাটার ফাইলে স্বাক্ষরের সময় এবং নির্দিষ্ট উৎস থেকে যন্ত্রাংশ কেনার ক্ষেত্রে। অভিযোগ, সব মিলিয়ে ১০ থেকে ১২ শতাংশ পর্যন্ত কমিশন আদায় করা হয়। এর বাইরে ‘উপর মহল ম্যানেজ’ করার নামেও নেওয়া হয় অতিরিক্ত অর্থ। আর এই কমিশনের বোঝা গিয়ে পড়ে রাষ্ট্রীয় কোষাগারে। বেশি দামে কেনা হয় নিম্নমানের কিংবা নকল যন্ত্রাংশ। মেরামতের পর অল্প সময়ের মধ্যেই সেগুলো বিকল হয়ে আবার কারখানায় ফিরে আসে ইঞ্জিন।
বাংলাদেশ রেলওয়ের পূর্বাঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ পাহাড়তলী ডিজেল লোকোমোটিভ মেরামত কারখানাকে ঘিরে এমনই গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রের দাবি, দীর্ঘদিন ধরে একই দায়িত্বে থাকা কর্মব্যবস্থাপক এতেসাম মো. শফিককে ঘিরে গড়ে উঠেছে একটি সরবরাহকারী সিন্ডিকেট। অভিযোগ রয়েছে, এই সিন্ডিকেটের মাধ্যমে নিম্নমানের যন্ত্রাংশ সরবরাহ ও অতিরিক্ত দামে বিল করার সুযোগ তৈরি করা হচ্ছে।
ফলে একদিকে রেলের কোটি কোটি টাকার সম্পদ ও অর্থ ঝুঁকিতে পড়ছে, অন্যদিকে মেরামত শেষে দ্রুত বিকল হচ্ছে লোকোমোটিভ। এতে বাড়ছে ইঞ্জিন সংকট, ব্যাহত হচ্ছে ট্রেনের সময়সূচি এবং ভোগান্তিতে পড়ছেন যাত্রী ও পণ্য পরিবহন সংশ্লিষ্টরা।
সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র নাম প্রকাশ না করার শর্তে এসব তথ্য জানিয়েছে।
সূত্রগুলোর দাবি, পাহাড়তলী ডিজেল শপে খুচরা যন্ত্রাংশের চাহিদা তৈরির সময় থেকেই শুরু হয় কমিশন লেনদেনের প্রক্রিয়া। এরপর কেনাকাটার ফাইলে স্বাক্ষর এবং সর্বশেষ নির্দিষ্ট দোকান বা উৎস থেকে যন্ত্রাংশ কেনার সময়ও কমিশন নেওয়া হয়। তিন ধাপে মোট ১০ থেকে ১২ শতাংশ পর্যন্ত কমিশন আদায়ের অভিযোগ রয়েছে।
সূত্রের দাবি অনুযায়ী, সংশ্লিষ্ট সরবরাহকারীকে কোথা থেকে বিদেশি ব্র্যান্ডের যন্ত্রাংশের নকল বা নিম্নমানের কপি সংগ্রহ করা যাবে, সেই নির্দেশনাও দেওয়া হয়। কখনো কখনো নিজস্ব লোকের মাধ্যমে চট্টগ্রামের কদমতলী, সিডিএ মার্কেট এবং ঢাকার ধোলাইখাল থেকে এসব যন্ত্রাংশ সংগ্রহ করা হয়।
শুধু তা-ই নয়, অভিযোগ রয়েছে, যেসব দোকান বা উৎস থেকে যন্ত্রাংশ সংগ্রহের ব্যবস্থা করে দেওয়া হয়, সেখান থেকেও আলাদা কমিশন নেওয়া হয়।
ফলে বাজারে যে যন্ত্রাংশের দাম কয়েক হাজার টাকা, সেটিই সরকারি ক্রয়ের ক্ষেত্রে কয়েক গুণ বেশি দামে দেখানোর সুযোগ তৈরি হচ্ছে বলে দাবি সূত্রের।
অনুসন্ধানে উঠে এসেছে আরও চাঞ্চল্যকর অভিযোগ। ‘উইক এসএ’ নামের ছোট একটি পার্টসের প্রকৃত বাজারমূল্য সর্বোচ্চ ২ থেকে ৩ হাজার টাকা হলেও সেটির বিপরীতে প্রায় ১৮ হাজার টাকা পর্যন্ত বিল করার অভিযোগ রয়েছে।
সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য, বড় ও ব্যয়বহুল যন্ত্রাংশের পাশাপাশি এ ধরনের ছোট ছোট পার্টসেও অতিরিক্ত মূল্য দেখিয়ে সরকারি অর্থ ব্যয়ের সুযোগ নেওয়া হচ্ছে।
অভিযোগ রয়েছে, এসব ক্রয়ের কার্যাদেশও ঘুরেফিরে একই সরবরাহকারী গোষ্ঠীর হাতে যাচ্ছে।
বাংলাদেশ রেলওয়ের মিটারগেজ লোকোমোটিভের ওজন মডেল ও ধরনভেদে প্রায় ৭০ থেকে ১০০ টন। একটি ইঞ্জিনের সঙ্গে ১২ থেকে ১৮টি কোচ ও পাওয়ার কার যুক্ত হয়ে প্রায় এক হাজার থেকে ১ হাজার ২০০ যাত্রী পরিবহন করতে পারে।
এ ধরনের ভারী ও গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রে নিম্নমানের পার্টস ব্যবহারের পরিণতি ভয়াবহ হতে পারে। সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলীদের মতে, গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রাংশের মান খারাপ হলে শুধু রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয়ই বাড়ে না, চলন্ত অবস্থায় ইঞ্জিন বিকল হয়ে বড় ধরনের অপারেশনাল ঝুঁকিও তৈরি হতে পারে।
সূত্রের দাবি, পাহাড়তলী কারখানায় নিম্নমানের যন্ত্রাংশ ব্যবহারের কারণে মেরামতের অল্প সময়ের মধ্যেই বিভিন্ন ইঞ্জিনে ত্রুটি দেখা দিচ্ছে। সম্প্রতি কয়েকটি ইঞ্জিন ব্লকের ক্র্যাঙ্কশাফটের মেইন বিয়ারিং নষ্ট হওয়ার তথ্যও পাওয়া গেছে।
গত বছরের জুন মাসে শুধু চট্টগ্রাম বিভাগেই চলন্ত অবস্থায় ১৮টি ইঞ্জিন বিকলের তথ্য পাওয়া যায় বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি। এসব ঘটনায় কোনো কোনো ট্রেনের গন্তব্যে পৌঁছাতে দুই থেকে তিন ঘণ্টা পর্যন্ত বিলম্ব হয়েছে।
২০২৫-২৬ অর্থবছরে পাহাড়তলী কারখানায় ৩৪টি সিডিউলড ইঞ্জিন ডেলিভারি দেওয়ার কথা থাকলেও ২২টির কাজ সম্পন্ন হয়েছে বলে জানা গেছে। সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, মেরামত শেষে যেসব ইঞ্জিন রেলের বহরে পাঠানো হচ্ছে, তার কিছু অল্প সময়ের মধ্যেই নতুন ত্রুটি নিয়ে আবার কারখানায় ফিরে আসছে।
এর ফলে নির্ধারিত সময়ে ইঞ্জিন ডেলিভারি দেওয়া যাচ্ছে না। একদিকে মেরামতের চাপ বাড়ছে, অন্যদিকে সচল ইঞ্জিনের সংখ্যা কমে যাচ্ছে।
রেলওয়ের পূর্বাঞ্চলে প্রতিদিন প্রায় ১১৯টি ইঞ্জিনের প্রয়োজন হলেও পাওয়া যাচ্ছে ৭০ থেকে ৭৫টি। ইঞ্জিন সংকটের কারণে পণ্যবাহী ট্রেনের সংখ্যা কোনো কোনো ক্ষেত্রে ৮০ শতাংশ পর্যন্ত কমে গেছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি।
অর্থাৎ একটি নিম্নমানের পার্টস কেনার পেছনে কমিশনের অভিযোগ শুধু সরকারি অর্থের অপচয়েই সীমাবদ্ধ থাকছে না; এর প্রভাব পড়ছে পুরো রেল পরিচালনা ব্যবস্থায়।
এতেসাম মো. শফিকের বিরুদ্ধে কেনাকাটায় অনিয়ম ও সরকারি অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) মামলা চলমান রয়েছে।
দুদক সূত্রে জানা যায়, মালামালের পরিমাণ ও কাগজপত্র পরিবর্তন করে ক্রয়ের ভুয়া রেকর্ডপত্র তৈরির মাধ্যমে সরকারের ২৪ লাখ ১৮ হাজার ৭২৩ টাকা আত্মসাতের অভিযোগে ২০২৪ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর দুদকের প্রধান কার্যালয়ের উপপরিচালক মোহাম্মদ আহসানুল কবির পলাশ বাদী হয়ে তার বিরুদ্ধে মামলা করেন।
তবে মামলা চলমান থাকা অবস্থাতেই তিনি একই ধরনের অনিয়মে জড়িয়ে পড়েছেন—এমন অভিযোগই এখন নতুন করে সামনে এসেছে।
অবশ্য মামলা হওয়া মানেই অভিযোগ প্রমাণিত হওয়া নয়। আদালতের চূড়ান্ত রায়ের আগে তাকে দোষী বলার সুযোগ নেই।
সূত্রের দাবি, গত ১২ আগস্টের এক আদেশে এতেসাম মো. শফিককে পার্বতীপুরে বদলি করা হয়েছে। কিন্তু সেখানে যোগ না দিয়ে পাহাড়তলীতেই থাকার জন্য তিনি বিভিন্ন মহলে তদবির করছেন।
অভিযোগ রয়েছে, অতিরিক্ত ও চলতি দায়িত্ব মিলিয়ে প্রায় পাঁচ বছর ধরে একই পদে থাকার কারণে তার চারপাশে একটি শক্তিশালী সরবরাহকারী নেটওয়ার্ক তৈরি হয়েছে। আগে অন্য কর্মকর্তাকে দায়িত্ব দেওয়া হলেও তদবিরের মাধ্যমে আবারও তিনি একই দায়িত্বে ফিরে আসেন বলে সংশ্লিষ্টদের দাবি।
দীর্ঘ সময় একই দায়িত্বে থাকার সুযোগই অনিয়মের পরিধি বাড়িয়েছে কি না—এখন সেই প্রশ্নও উঠেছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকজন সরবরাহকারী দাবি করেন, যন্ত্রাংশের মান ভালো হোক বা খারাপ—কর্মকর্তাদের কমিশন না দিলে ব্যবসা করা কঠিন।
তাদের ভাষ্য, কমিশনের অর্থ জোগাড় করতে গিয়ে অনেক সময় বাজারদরের চেয়ে বেশি দামে যন্ত্রাংশ সরবরাহের বিল করতে হয়। আর সেই বাড়তি অর্থের একটি অংশ কমিশন হিসেবে দিতে হয়।























