ঢাকা, সোমবার, ২২ জুন ২০২৬ | ই-পেপার

জীবনমান নয়, রাষ্ট্রকে কী দিলেন—সেই প্রশ্ন জেলা প্রশাসকের

দৈনিক আইন বার্তা
  • আপডেট সময়ঃ ০৭:৩১:৩১ অপরাহ্ন, রবিবার, ২১ জুন ২০২৬
  • / ৩৩ বার পড়া হয়েছে

রিপন চৌধুরী বিশেষ প্রতিনিধি
“আমি কী পেলাম, আমার জীবনের কত উন্নতি হলো—সেটি বড় প্রশ্ন নয়; বরং আমি রাষ্ট্রকে কী দিলাম, সমাজের জন্য কী অবদান রাখলাম, সেটিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।” চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা-এর এই বক্তব্য শুধু একটি প্রশিক্ষণ কর্মসূচির আনুষ্ঠানিক বার্তা নয়, বরং স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার কার্যকারিতা, জবাবদিহি এবং জনসেবার মান নিয়ে দীর্ঘদিনের প্রশ্নকে নতুন করে সামনে নিয়ে এসেছে।
রোববার নগরীর প্রাইমারি টিচার্স ট্রেনিং ইনস্টিটিউট (পিটিআই)-এ ইউনিয়ন পরিষদের প্রশাসনিক কর্মকর্তা ও হিসাব সহকারী কাম কম্পিউটার অপারেটরদের জন্য আয়োজিত তিন দিনব্যাপী অফিস ও আর্থিক ব্যবস্থাপনা প্রশিক্ষণ কোর্সের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি সরকারি কর্মকর্তাদের আত্মসমালোচনা, নৈতিকতা ও দায়িত্ববোধের ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করেন।

স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশের ইউনিয়ন পরিষদগুলোতে নাগরিক সেবা, আর্থিক ব্যবস্থাপনা, ডিজিটাল রেকর্ড সংরক্ষণ, প্রকল্প বাস্তবায়ন এবং সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি পরিচালনায় দক্ষতার ঘাটতি ও জবাবদিহির প্রশ্ন প্রায়ই আলোচনায় আসে। বিভিন্ন সময়ে সেবাগ্রহীতাদের হয়রানি, ফাইল জট, তথ্যপ্রাপ্তির জটিলতা এবং প্রশাসনিক ধীরগতির অভিযোগও উঠে এসেছে।
এ প্রেক্ষাপটে জেলা প্রশাসকের বক্তব্যকে অনেকেই সরকারি সেবার মানোন্নয়ন ও দায়িত্বশীল প্রশাসন গঠনের একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা হিসেবে দেখছেন।

অনুষ্ঠানে জেলা প্রশাসক বলেন, সুন্দর সমাজ ও রাষ্ট্রের প্রত্যাশা সবাই করে, কিন্তু নিজের চিন্তা ও দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তনের ক্ষেত্রে অনেকেই অনাগ্রহী। তিনি সতর্ক করে বলেন, অন্যের পরিবর্তন চাওয়ার আগে নিজের মানসিকতা, দায়িত্ববোধ ও কর্মপদ্ধতিতে পরিবর্তন আনতে হবে।
বিশ্লেষকদের মতে, সরকারি সেবার ক্ষেত্রে প্রযুক্তিগত উন্নয়ন যতই হোক, সেবাদানকারী ব্যক্তির মানসিকতা ও আচরণ পরিবর্তন না হলে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া কঠিন। ফলে প্রশিক্ষণের পাশাপাশি নৈতিক নেতৃত্ব ও সেবামুখী প্রশাসনিক সংস্কৃতি গড়ে তোলাও জরুরি।

জেলা প্রশাসক প্রশিক্ষণার্থীদের উদ্দেশে বলেন, শেখা একটি চলমান প্রক্রিয়া এবং প্রশিক্ষণ থেকে অর্জিত জ্ঞান বাস্তব কাজে প্রয়োগ না হলে তার কোনো মূল্য নেই।
প্রশ্ন উঠছে, দেশে নিয়মিত প্রশিক্ষণ কর্মসূচি আয়োজন হলেও মাঠপর্যায়ে তার বাস্তব প্রতিফলন কতটা দেখা যায়? সংশ্লিষ্টদের মতে, প্রশিক্ষণের কার্যকারিতা মূল্যায়ন, অর্জিত দক্ষতার ব্যবহার এবং সেবার মানে দৃশ্যমান পরিবর্তন নিশ্চিত না হলে এসব উদ্যোগ অনেক সময় আনুষ্ঠানিকতার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে।
জেলা প্রশাসক বলেন, জনগণের করের অর্থে বেতন নিয়ে রাষ্ট্রের সুযোগ-সুবিধা ভোগ করা কর্মকর্তাদের উচিত সমাজ ও রাষ্ট্রের প্রতি নিজেদের অবদান নিয়ে আত্মসমালোচনা করা।
তিনি আরও বলেন, সরকারি চাকরি কেবল একটি পদ নয়, এটি জনগণের প্রতি অঙ্গীকার। সেবাগ্রহীতারা যেন কোনো সরকারি দপ্তরে গিয়ে হয়রানি, অবহেলা বা অপ্রয়োজনীয় ভোগান্তির শিকার না হন, সে বিষয়ে সবাইকে সচেতন থাকতে হবে।
সুশাসন নিয়ে কাজ করা বিভিন্ন মহলের মতে, নাগরিকবান্ধব প্রশাসন গড়ে তুলতে হলে সেবা প্রদান প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা, জবাবদিহি, ডিজিটাল নজরদারি এবং অভিযোগ নিষ্পত্তি ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করতে হবে।

জাতীয় স্থানীয় সরকার ইনস্টিটিউট-এর আয়োজনে এবং চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসনের বাস্তবায়নে অনুষ্ঠিত এই প্রশিক্ষণে জেলার বিভিন্ন ইউনিয়ন পরিষদের ১৬০ জন কর্মকর্তা অংশগ্রহণ করেন।
অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) মো. শরীফ উদ্দিন-এর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন এস এম আমিরুল মোস্তফা এবং আতিয়া চৌধুরী।

অনুষ্ঠানে জেলা প্রশাসকের বক্তব্যের মূল সুর ছিল আত্মকেন্দ্রিক উন্নয়ন নয়, বরং জনকল্যাণ ও রাষ্ট্রীয় দায়িত্ববোধ। তিনি বলেন, মানুষ পৃথিবীতে দ্বিতীয়বার আসার সুযোগ পায় না। কর্মজীবন শেষে যেন এই আফসোস না থাকে যে সমাজ ও রাষ্ট্রের জন্য আরও ভালো কিছু করা যেত।
তার ভাষায়, “কোনো প্রশিক্ষণ, কোনো নির্দেশনা কিংবা কোনো আইন একা পরিবর্তন আনতে পারে না। পরিবর্তন আসে তখনই, যখন মানুষের ভেতরে দায়িত্ববোধ, নৈতিকতা, মানবিকতা ও বিবেক জাগ্রত হয়।”
প্রশাসনের মাঠপর্যায়ে বাস্তবতা, নাগরিক সেবার মান এবং জবাবদিহির বর্তমান চিত্র বিবেচনায় জেলা প্রশাসকের এই বক্তব্য এখন শুধু একটি প্রশিক্ষণ কর্মসূচির বার্তা নয়; বরং স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়ে নতুন করে আত্মসমালোচনার আহ্বান হিসেবেই দেখা হচ্ছে।

ট্যাগস :

নিউজটি শেয়ার করুন

জীবনমান নয়, রাষ্ট্রকে কী দিলেন—সেই প্রশ্ন জেলা প্রশাসকের

আপডেট সময়ঃ ০৭:৩১:৩১ অপরাহ্ন, রবিবার, ২১ জুন ২০২৬

রিপন চৌধুরী বিশেষ প্রতিনিধি
“আমি কী পেলাম, আমার জীবনের কত উন্নতি হলো—সেটি বড় প্রশ্ন নয়; বরং আমি রাষ্ট্রকে কী দিলাম, সমাজের জন্য কী অবদান রাখলাম, সেটিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।” চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা-এর এই বক্তব্য শুধু একটি প্রশিক্ষণ কর্মসূচির আনুষ্ঠানিক বার্তা নয়, বরং স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার কার্যকারিতা, জবাবদিহি এবং জনসেবার মান নিয়ে দীর্ঘদিনের প্রশ্নকে নতুন করে সামনে নিয়ে এসেছে।
রোববার নগরীর প্রাইমারি টিচার্স ট্রেনিং ইনস্টিটিউট (পিটিআই)-এ ইউনিয়ন পরিষদের প্রশাসনিক কর্মকর্তা ও হিসাব সহকারী কাম কম্পিউটার অপারেটরদের জন্য আয়োজিত তিন দিনব্যাপী অফিস ও আর্থিক ব্যবস্থাপনা প্রশিক্ষণ কোর্সের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি সরকারি কর্মকর্তাদের আত্মসমালোচনা, নৈতিকতা ও দায়িত্ববোধের ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করেন।

স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশের ইউনিয়ন পরিষদগুলোতে নাগরিক সেবা, আর্থিক ব্যবস্থাপনা, ডিজিটাল রেকর্ড সংরক্ষণ, প্রকল্প বাস্তবায়ন এবং সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি পরিচালনায় দক্ষতার ঘাটতি ও জবাবদিহির প্রশ্ন প্রায়ই আলোচনায় আসে। বিভিন্ন সময়ে সেবাগ্রহীতাদের হয়রানি, ফাইল জট, তথ্যপ্রাপ্তির জটিলতা এবং প্রশাসনিক ধীরগতির অভিযোগও উঠে এসেছে।
এ প্রেক্ষাপটে জেলা প্রশাসকের বক্তব্যকে অনেকেই সরকারি সেবার মানোন্নয়ন ও দায়িত্বশীল প্রশাসন গঠনের একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা হিসেবে দেখছেন।

অনুষ্ঠানে জেলা প্রশাসক বলেন, সুন্দর সমাজ ও রাষ্ট্রের প্রত্যাশা সবাই করে, কিন্তু নিজের চিন্তা ও দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তনের ক্ষেত্রে অনেকেই অনাগ্রহী। তিনি সতর্ক করে বলেন, অন্যের পরিবর্তন চাওয়ার আগে নিজের মানসিকতা, দায়িত্ববোধ ও কর্মপদ্ধতিতে পরিবর্তন আনতে হবে।
বিশ্লেষকদের মতে, সরকারি সেবার ক্ষেত্রে প্রযুক্তিগত উন্নয়ন যতই হোক, সেবাদানকারী ব্যক্তির মানসিকতা ও আচরণ পরিবর্তন না হলে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া কঠিন। ফলে প্রশিক্ষণের পাশাপাশি নৈতিক নেতৃত্ব ও সেবামুখী প্রশাসনিক সংস্কৃতি গড়ে তোলাও জরুরি।

জেলা প্রশাসক প্রশিক্ষণার্থীদের উদ্দেশে বলেন, শেখা একটি চলমান প্রক্রিয়া এবং প্রশিক্ষণ থেকে অর্জিত জ্ঞান বাস্তব কাজে প্রয়োগ না হলে তার কোনো মূল্য নেই।
প্রশ্ন উঠছে, দেশে নিয়মিত প্রশিক্ষণ কর্মসূচি আয়োজন হলেও মাঠপর্যায়ে তার বাস্তব প্রতিফলন কতটা দেখা যায়? সংশ্লিষ্টদের মতে, প্রশিক্ষণের কার্যকারিতা মূল্যায়ন, অর্জিত দক্ষতার ব্যবহার এবং সেবার মানে দৃশ্যমান পরিবর্তন নিশ্চিত না হলে এসব উদ্যোগ অনেক সময় আনুষ্ঠানিকতার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে।
জেলা প্রশাসক বলেন, জনগণের করের অর্থে বেতন নিয়ে রাষ্ট্রের সুযোগ-সুবিধা ভোগ করা কর্মকর্তাদের উচিত সমাজ ও রাষ্ট্রের প্রতি নিজেদের অবদান নিয়ে আত্মসমালোচনা করা।
তিনি আরও বলেন, সরকারি চাকরি কেবল একটি পদ নয়, এটি জনগণের প্রতি অঙ্গীকার। সেবাগ্রহীতারা যেন কোনো সরকারি দপ্তরে গিয়ে হয়রানি, অবহেলা বা অপ্রয়োজনীয় ভোগান্তির শিকার না হন, সে বিষয়ে সবাইকে সচেতন থাকতে হবে।
সুশাসন নিয়ে কাজ করা বিভিন্ন মহলের মতে, নাগরিকবান্ধব প্রশাসন গড়ে তুলতে হলে সেবা প্রদান প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা, জবাবদিহি, ডিজিটাল নজরদারি এবং অভিযোগ নিষ্পত্তি ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করতে হবে।

জাতীয় স্থানীয় সরকার ইনস্টিটিউট-এর আয়োজনে এবং চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসনের বাস্তবায়নে অনুষ্ঠিত এই প্রশিক্ষণে জেলার বিভিন্ন ইউনিয়ন পরিষদের ১৬০ জন কর্মকর্তা অংশগ্রহণ করেন।
অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) মো. শরীফ উদ্দিন-এর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন এস এম আমিরুল মোস্তফা এবং আতিয়া চৌধুরী।

অনুষ্ঠানে জেলা প্রশাসকের বক্তব্যের মূল সুর ছিল আত্মকেন্দ্রিক উন্নয়ন নয়, বরং জনকল্যাণ ও রাষ্ট্রীয় দায়িত্ববোধ। তিনি বলেন, মানুষ পৃথিবীতে দ্বিতীয়বার আসার সুযোগ পায় না। কর্মজীবন শেষে যেন এই আফসোস না থাকে যে সমাজ ও রাষ্ট্রের জন্য আরও ভালো কিছু করা যেত।
তার ভাষায়, “কোনো প্রশিক্ষণ, কোনো নির্দেশনা কিংবা কোনো আইন একা পরিবর্তন আনতে পারে না। পরিবর্তন আসে তখনই, যখন মানুষের ভেতরে দায়িত্ববোধ, নৈতিকতা, মানবিকতা ও বিবেক জাগ্রত হয়।”
প্রশাসনের মাঠপর্যায়ে বাস্তবতা, নাগরিক সেবার মান এবং জবাবদিহির বর্তমান চিত্র বিবেচনায় জেলা প্রশাসকের এই বক্তব্য এখন শুধু একটি প্রশিক্ষণ কর্মসূচির বার্তা নয়; বরং স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়ে নতুন করে আত্মসমালোচনার আহ্বান হিসেবেই দেখা হচ্ছে।