ব্যবসা, সমাজসেবা ও আধ্যাত্মিক সাধনায় এক অনন্য আলোকবর্তিকা
- আপডেট সময়ঃ ০৭:২৭:০৩ অপরাহ্ন, রবিবার, ২১ জুন ২০২৬
- / ৫৯ বার পড়া হয়েছে
রিপন চৌধুরী, বিশেষ প্রতিনিধি
চট্টগ্রামের বোয়ালখালী উপজেলার গোমদণ্ডী বহদ্দার পাড়ার কৃতী সন্তান, বিশিষ্ট আধ্যাত্মিক সাধক, গবেষক, গীতিকার, অর্থনীতিবিদ, সমাজসেবক ও সফল ব্যবসায়ী আবুল কালাম (ভোলা) ছিলেন এমন এক বহুমাত্রিক ব্যক্তিত্ব, যিনি কর্মজীবন, সমাজসেবা ও আধ্যাত্মিক সাধনাকে একই সূত্রে গেঁথে মানুষের হৃদয়ে স্থায়ী আসন করে নিয়েছেন। তাঁর মৃত্যু এক দশকেরও বেশি সময় অতিক্রম করলেও সমাজ ও আধ্যাত্মিক অঙ্গনে তাঁর অবদান আজও আলোচিত এবং অনুসৃত।
অনুসন্ধানে জানা যায়, ১৯৪৩ সালের ১৫ জানুয়ারি গোমদণ্ডীর বহদ্দার পাড়ার একটি ধর্মপ্রাণ ও সম্ভ্রান্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন আবুল কালাম (ভোলা)। পারিবারিকভাবে সুফিবাদ ও আধ্যাত্মিক চর্চার পরিবেশে বেড়ে ওঠার ফলে শৈশব থেকেই তাঁর মধ্যে মানবকল্যাণ, নৈতিকতা ও আত্মশুদ্ধির বীজ রোপিত হয়।
অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও তিনি ১৯৬০ সালে মেট্রিকুলেশন পাস করেন এবং চট্টগ্রাম পোর্ট হজ অফিসে অস্থায়ী করণিক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। পরবর্তীতে বিভিন্ন ব্যাংক, শিপিং কোম্পানি ও শিল্পপ্রতিষ্ঠানে দায়িত্ব পালন করেন। চাকরির পাশাপাশি উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করে বি.কম ডিগ্রি অর্জন করেন, যা তাঁর আত্মপ্রত্যয় ও অধ্যবসায়ের অনন্য দৃষ্টান্ত।
বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর তিনি ব্যবসায় আত্মনিয়োগ করেন। ব্যবসায়িক দক্ষতা, সততা ও দূরদর্শিতার কারণে অল্প সময়ের মধ্যেই তিনি একজন সফল ব্যবসায়ী হিসেবে প্রতিষ্ঠা লাভ করেন। তবে ব্যবসায়িক সফলতা তাঁর জীবনবোধকে সীমাবদ্ধ করতে পারেনি। বরং সমাজকল্যাণ ও মানবসেবাকে তিনি জীবনের অন্যতম ব্রত হিসেবে গ্রহণ করেন।
তাঁর কর্মজীবনের বিস্তৃতি ছিল নানা ক্ষেত্রে। তিনি বাংলাদেশ হার্ডওয়ার অ্যান্ড মেশিনারী মার্চেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের কেন্দ্রীয় কমিটির প্রাক্তন সদস্য ছিলেন। পাশাপাশি চট্টগ্রাম চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির বিভিন্ন উপদেষ্টা কমিটিতে দায়িত্ব পালন করেন। এছাড়া বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি চট্টগ্রাম জেলা ইউনিটের কার্যকরী কমিটির সদস্য, চট্টগ্রাম মা ও শিশু হাসপাতাল এবং বাংলাদেশ ডায়াবেটিক অ্যাসোসিয়েশনের আজীবন সদস্য হিসেবে জনকল্যাণমূলক কর্মকাণ্ডে সক্রিয় ভূমিকা রাখেন।
স্থানীয় শিক্ষা উন্নয়নেও তাঁর অবদান ছিল গুরুত্বপূর্ণ। গোমদণ্ডী পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়ের পরিচালনা কমিটির ভাইস চেয়ারম্যান হিসেবে তিনি শিক্ষা বিস্তার এবং শিক্ষার মানোন্নয়নে কাজ করেন। সংশ্লিষ্টদের মতে, শিক্ষাকে তিনি সমাজ পরিবর্তনের প্রধান হাতিয়ার হিসেবে দেখতেন।
তবে আবুল কালাম (ভোলা) সাহেবের সবচেয়ে উজ্জ্বল পরিচয় ছিল তাঁর আধ্যাত্মিক জীবন ও সুফি দর্শনচর্চা। খায়ের মঞ্জিল দরবার শরীফ ওয়াক্ফ এস্টেট পরিচালনা কমিটির সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দীর্ঘ ১৮ বছর দায়িত্ব পালন করেন। পরবর্তীতে সভাপতির দায়িত্ব গ্রহণ করে ২০১৫ সালের ১৯ ডিসেম্বর মৃত্যুর আগ পর্যন্ত দরবারের উন্নয়ন, সম্প্রসারণ ও আধ্যাত্মিক শিক্ষার প্রসারে কাজ করে যান।
দরবার সংশ্লিষ্টরা জানান, তাঁর নেতৃত্বে খায়ের মঞ্জিল দরবার শরীফে অবকাঠামোগত উন্নয়ন, ধর্মীয় শিক্ষা কার্যক্রম এবং আধ্যাত্মিক সাহিত্যচর্চার নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হয়। ফলে তিনি ভক্ত ও অনুসারীদের কাছে একজন দূরদর্শী সংগঠক হিসেবে বিশেষ মর্যাদা লাভ করেন।
শুধু আধ্যাত্মিক চর্চাই নয়, অর্থনীতি ও জাতীয় উন্নয়ন নিয়েও ছিল তাঁর গভীর গবেষণা। শিল্পায়ন, জাতীয় রাজস্ব, কর্মসংস্থান, কৃষিভিত্তিক শিল্প, দারিদ্র্য বিমোচন এবং চট্টগ্রামকেন্দ্রিক উন্নয়ন পরিকল্পনা নিয়ে তাঁর অসংখ্য গবেষণামূলক প্রবন্ধ বিভিন্ন জাতীয় ও আঞ্চলিক পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে। বিমানবন্দর সম্প্রসারণ, সেতু নির্মাণ, উপকূলীয় উন্নয়ন এবং আঞ্চলিক অর্থনৈতিক সম্ভাবনা নিয়ে তাঁর বিশ্লেষণধর্মী লেখাগুলো সে সময় নীতিনির্ধারক মহলেও আলোচনার জন্ম দেয়। এসব লেখার সংকলন পরবর্তীতে ‘বিকল্প ভাবনা’ গ্রন্থ হিসেবে প্রকাশিত হয়।
আধ্যাত্মিক গবেষণার ক্ষেত্রেও তিনি রেখে গেছেন মূল্যবান অবদান। দীর্ঘ সাধনা, ধ্যান ও গবেষণার ফল হিসেবে তিনি রচনা করেন ‘আত্মদর্শন’ নামক তাত্ত্বিক গ্রন্থ। ইসলামি দর্শন, তাসাউফ, আত্মশুদ্ধি ও মানবজীবনের আধ্যাত্মিক উপলব্ধি নিয়ে রচিত এ গ্রন্থ পাঠকমহলে প্রশংসিত হয়। এছাড়া তাঁর রচিত ভাববাদী গানের সংকলন ‘সুরতি’ আধ্যাত্মিক সংগীতপ্রেমীদের মধ্যে বিশেষ সমাদৃত।
বাংলাদেশ বেতার ও বাংলাদেশ টেলিভিশনের নিবন্ধিত গীতিকার হিসেবে তিনি বহু জনপ্রিয় গান রচনা করেন। দেশের খ্যাতিমান শিল্পীদের কণ্ঠে তাঁর গান পরিবেশিত হয়েছে। সাহিত্য, গবেষণা, সমাজসেবা ও আধ্যাত্মিক অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন থেকে সম্মাননা ও ক্রেস্ট লাভ করেন।
ব্যক্তিগত জীবনে ১৯৭৪ সালের ১৪ এপ্রিল হোসনে আরা লুসার সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন তিনি। তাঁদের তিন পুত্র ও দুই কন্যা সন্তান রয়েছে। বর্তমানে তাঁর জ্যেষ্ঠ পুত্র মোস্তফা কামাল মানিক খায়ের মঞ্জিল দরবার শরীফের দায়িত্ব পালন করছেন।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, আবুল কালাম (ভোলা) সাহেবের আদর্শকে ধারণ করে বর্তমানে খায়ের মঞ্জিল দরবার শরীফের কার্যক্রম আরও সম্প্রসারিত হচ্ছে। মোস্তফা কামাল মানিকের নেতৃত্বে দরবারকে আধুনিক ও নান্দনিক রূপ দিতে একটি বৃহৎ মাজার কমপ্লেক্স নির্মাণের কাজ চলমান রয়েছে। সংশ্লিষ্টরা আশা করছেন, এটি সম্পন্ন হলে চট্টগ্রামের অন্যতম আকর্ষণীয় ধর্মীয় ও আধ্যাত্মিক কেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হবে।
শুধু ধর্মীয় কর্মকাণ্ড নয়, পরিবারের পক্ষ থেকে নিয়মিতভাবে গরিব, অসহায় ও সুবিধাবঞ্চিত মানুষের সহায়তায় বিভিন্ন উদ্যোগ পরিচালিত হচ্ছে। শিক্ষা সহায়তা, চিকিৎসা সহযোগিতা, খাদ্যসামগ্রী বিতরণ এবং আর্থিক অনুদানের মাধ্যমে মানবসেবার ধারাবাহিকতা বজায় রাখা হয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের মতে, এলাকার মানুষের সুখ-দুঃখে পাশে থাকার সংস্কৃতি আজও পরিবারটির অন্যতম বৈশিষ্ট্য।
বিশ্লেষকদের মতে, ব্যবসা, সমাজসেবা, গবেষণা, সাহিত্যচর্চা এবং আধ্যাত্মিক সাধনাকে একসঙ্গে ধারণ করা মানুষের সংখ্যা খুবই সীমিত। সেই বিচারে আবুল কালাম (ভোলা) ছিলেন ব্যতিক্রমী এক ব্যক্তিত্ব। তাঁর জীবন ও কর্ম শুধু একটি পরিবারের নয়, বরং বৃহত্তর সমাজের জন্যও অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে থাকবে।
মানবকল্যাণ, সততা, আত্মশুদ্ধি এবং সেবার যে দর্শন তিনি রেখে গেছেন, তা আগামী প্রজন্মের জন্য এক মূল্যবান উত্তরাধিকার হিসেবেই বিবেচিত হবে।



















