কোটি টাকার জয়িতা ভবন অচল, দেড় কোটি টাকার সংস্কার প্রকল্পও থমকে
- আপডেট সময়ঃ ১১:৩৯:৩৪ অপরাহ্ন, শনিবার, ২৫ জুলাই ২০২৬
- / ৮ বার পড়া হয়েছে
মোঃ জুয়েল হোসাইন, বান্দরবান প্রতিনিধি: বান্দরবান শহরের প্রবেশমুখে বান্দরবান-কেরানীহাট সড়কের পাশে, মেঘলা পর্যটন কেন্দ্র সংলগ্ন পাঁচতলা ‘জয়িতা ভবন’ নারী উদ্যোক্তাদের স্বপ্নের বিপণিবিতান হওয়ার কথা ছিল। প্রায় ৫ কোটি টাকা ব্যয়ে ২০১৮ সালে নির্মিত এ ভবনটি আট বছর পেরিয়ে গেলেও আজও চালু হয়নি। ফলে কোটি কোটি টাকার সরকারি স্থাপনাটি এখন প্রায় পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে আছে। এরই মধ্যে ভবনটি সংস্কার ও চালুর জন্য প্রায় দেড় কোটি টাকার নতুন বরাদ্দ দেওয়া হলেও এখনো শুরু হয়নি সংস্কার কাজ।
স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) ভবনটি নির্মাণ করে। পাঁচতলা এই ভবনে রয়েছে ৪৫টি দোকান, দুটি ভিআইপি কক্ষ, একটি ফুড কোর্ট, কিডস কর্নারসহ বিভিন্ন আধুনিক সুযোগ-সুবিধা। প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য ছিল বান্দরবানের নারী উদ্যোক্তাদের জন্য একটি স্থায়ী ও আধুনিক বিপণিবিতান গড়ে তোলা, যেখানে তারা নিজস্ব উৎপাদিত পণ্য প্রদর্শন ও বিক্রির সুযোগ পাবেন। পাশাপাশি পর্যটননির্ভর এই জেলায় স্থানীয় ঐতিহ্যবাহী হস্তশিল্প ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের পণ্য বিক্রির মাধ্যমে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডও বৃদ্ধি পাবে।
কিন্তু বাস্তবে প্রশাসনিক জটিলতা, দায়িত্ব হস্তান্তরে বিলম্ব এবং সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর সমন্বয়হীনতার কারণে ভবনটি চালু করা সম্ভব হয়নি। নির্মাণ শেষ হওয়ার পর থেকে দীর্ঘদিন ধরে ভবনটি ব্যবহার না হওয়ায় বিভিন্ন স্থানে অবকাঠামোগত ক্ষয়ক্ষতি দেখা দিয়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, ভবনটি এখন গরু-ছাগলের বিচরণস্থলে পরিণত হয়েছে। রাতে অসামাজিক কর্মকাণ্ড ও মাদকসেবীদেরও আনাগোনা রয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দা মো. বাদশা বলেন, “বছরের পর বছর ভবনটি অব্যবহৃত থাকায় নষ্ট হচ্ছে। সরকারি এত বড় একটি সম্পদ এভাবে পড়ে থাকা খুবই দুঃখজনক। দ্রুত চালু করলে নারী উদ্যোক্তারা যেমন উপকৃত হবেন, তেমনি ভবনটিও সঠিকভাবে ব্যবহৃত হবে।”
আরেক বাসিন্দা মো. সবুর বলেন, “এত টাকা ব্যয়ে ভবন নির্মাণ করা হলেও জনগণ কোনো সুফল পাচ্ছে না। এটি দ্রুত চালু করে নারী উদ্যোক্তাদের হাতে দোকান বরাদ্দ দেওয়া প্রয়োজন।”
গুংগুরু পাড়া উপজাতীয় মহিলা উন্নয়ন সংস্থার সভাপতি লাক্রাই খেয়াং বলেন, “পার্বত্য এলাকার অনেক নারী নিজস্ব হস্তশিল্প, তাঁতের কাপড়, বাঁশ ও বেতের তৈরি পণ্য উৎপাদন করেন। কিন্তু বিক্রির জন্য স্থায়ী কোনো জায়গা নেই। জয়িতা ভবন চালু হলে এসব নারী স্বাবলম্বী হওয়ার বড় সুযোগ পাবেন।”
লেমুঝিড়ি আগাপাড়া মহিলা সমিতির সভাপতি বলেন, “নারীদের অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নের জন্য এই ভবনটি একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ ছিল। দীর্ঘদিনেও চালু না হওয়ায় নারী উদ্যোক্তারা হতাশ।”
জয় একতা মহিলা কল্যাণ সমিতির সভাপতি উম্মে কুলসুম খুখী (সাথী) বলেন, “জয়িতা ভবনটি নারী উদ্যোক্তাদের জন্য অত্যন্ত সম্ভাবনাময় একটি উদ্যোগ ছিল। কিন্তু আট বছর ধরে ভবনটি চালু না হওয়ায় আমরা হতাশ। বান্দরবানের অসংখ্য নারী নিজেদের তৈরি হস্তশিল্প, তাঁতের কাপড়, খাদ্যপণ্য ও অন্যান্য সামগ্রী বিক্রির জন্য একটি স্থায়ী বিপণিবিতানের অপেক্ষায় আছেন। দ্রুত সংস্কার কাজ শেষ করে ভবনটি চালু করা হলে নারীরা স্বাবলম্বী হওয়ার বড় সুযোগ পাবেন এবং জেলার অর্থনীতিতেও ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।”
বান্দরবান সার্বজনীন কেন্দ্রীয় বৌদ্ধ বিহার মহিলা কল্যাণ সমিতির সভাপতি বলেন, “পর্যটকদের কাছে স্থানীয় নারীদের তৈরি পণ্য তুলে ধরার জন্য এটি একটি আদর্শ স্থান হতে পারত। কিন্তু অব্যবস্থাপনার কারণে সম্ভাবনাময় প্রকল্পটি এখন অচল হয়ে আছে।”
বান্দরবান সদর উপজেলার বিভিন্ন মহিলা সংগঠনের নেতৃবৃন্দ বলেন, জয়িতা ভবন দ্রুত চালু হলে জেলার শত শত নারী উদ্যোক্তার কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে এবং নতুন নারী উদ্যোক্তা তৈরিতেও এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
জানা গেছে, বান্দরবান সদর উপজেলায় নিবন্ধিত অন্তত ৬৪টি মহিলা সমিতির প্রায় দুই হাজার নারী উদ্যোক্তা একটি স্থায়ী বিপণিবিতানের অপেক্ষায় রয়েছেন। তাদের অনেকেই বর্তমানে বিভিন্ন মেলা বা অস্থায়ী স্টলে পণ্য বিক্রি করেন। স্থায়ী বিপণিবিতান চালু হলে তাদের ব্যবসা আরও সম্প্রসারিত হবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
এদিকে ভবনটি সংস্কার ও চালুর জন্য পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ড প্রায় দেড় কোটি টাকার নতুন প্রকল্প গ্রহণ করেছে। প্রকল্পটির মেয়াদ নির্ধারণ করা হয়েছে ২০২৫-২৬ অর্থবছর থেকে ২০২৭-২৮ অর্থবছর পর্যন্ত। তবে বরাদ্দ অনুমোদনের পরও এখনো সংস্কারকাজ শুরু হয়নি।
এ বিষয়ে জানতে পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ডের বান্দরবান জেলার নির্বাহী প্রকৌশলী আবু বিন মোহাম্মদ ইয়াছির আরাফাতের সঙ্গে একাধিকবার মোবাইল ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁর বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
বান্দরবান জেলা মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তরের উপপরিচালক সুপন চাকমা বলেন,তিনি বলেন জয়িতা ভবন চালুর জন্য প্রয়োজনীয় সব প্রস্তুতি ইতোমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে। স্বেচ্ছাসেবী মহিলা সমিতির নারী উদ্যোক্তাদের মাধ্যমে বিপণিবিতানটি পরিচালনার পরিকল্পনা থাকলেও বিভিন্ন জটিলতার কারণে সেটি বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি। তবে উদ্ভূত সমস্যাগুলো সমাধানে পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ডের সহযোগিতায় প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। সম্প্রতি জেলা প্রশাসক জয়িতা ভবন পরিদর্শন করে দ্রুত চালুর বিষয়ে গুরুত্বারোপ করেন। এ লক্ষ্যে তিনি পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ডের ভাইস চেয়ারম্যানের সঙ্গে আলোচনা করেছেন। খুব শিগগিরই জয়িতা ভবন চালু করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ সমন্বিতভাবে কাজ করছে।
তিনি আরও বলেন,এটি চালু হলে বান্দরবানের নারী উদ্যোক্তারা ব্যাপকভাবে উপকৃত হবেন। তাদের উৎপাদিত পণ্য বিক্রির একটি স্থায়ী প্ল্যাটফর্ম তৈরি হবে এবং নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন আরও এগিয়ে যাবে।”
স্থানীয়দের মতে, দীর্ঘদিনের অচলাবস্থার অবসান ঘটিয়ে দ্রুত জয়িতা ভবন চালু করা হলে শুধু নারী উদ্যোক্তারাই নয়, পর্যটননির্ভর বান্দরবানের অর্থনীতিতেও নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচিত হবে। কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত সরকারি এই স্থাপনাটি আর অবহেলায় পড়ে না থেকে নারীর ক্ষমতায়ন ও স্থানীয় অর্থনীতির উন্নয়নে কার্যকর ভূমিকা রাখবে—এমন প্রত্যাশাই এখন জেলার সর্বস্তরের মানুষের।























