ঢাকা, বুধবার, ২৬ অগাস্ট ২০২৬ | ই-পেপার

বরাদ্দ আছে, তবু সারের জন্য কৃষকের হাহাকার: ভূরুঙ্গামারীতে ক্ষোভের নেপথ্যে বণ্টনব্যবস্থা

দৈনিক আইন বার্তা
  • আপডেট সময়ঃ ০১:২৭:০১ অপরাহ্ন, বুধবার, ২৬ অগাস্ট ২০২৬
  • / ৬ বার পড়া হয়েছে

প্রতিনিধি, কুড়িগ্রাম: কুড়িগ্রামের ভূরুঙ্গামারীতে সারের সংকট নিয়ে কৃষকদের ক্ষোভ চরমে উঠেছে। গত রোববার শিলখুড়ি ইউনিয়নের ধলডাঙ্গা বাজারে এক ডিলারের গুদামের বেড়া ভেঙে কৃষকেরা ২২৫ বস্তা সার নিয়ে যান। পরে প্রশাসনের আশ্বাসে সোমবার বিকেল পর্যন্ত ১১৫ বস্তা সার ফেরত দিয়েছেন তাঁরা। এ ঘটনায় পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটি করেছে উপজেলা প্রশাসন।

কৃষকদের অভিযোগ, চাহিদার তুলনায় সরবরাহ কম। আবার কোনো কোনো ডিলার নিয়মিত বিক্রয়কেন্দ্র খোলেন না। ফলে ধান রোপণের পর প্রয়োজনীয় সময়ে সার না পেয়ে খোলা বাজার থেকে বেশি দামে সার কিনতে হচ্ছে তাঁদের।

তবে কৃষি বিভাগের দাবি, উপজেলায় কৃষকের চাহিদা অনুযায়ী সার রয়েছে। শিলখুড়িতে যে সংকট তৈরি হয়েছে, তার অন্যতম কারণ ডিলারসংখ্যা ও ইউনিয়নভিত্তিক বরাদ্দে অসামঞ্জস্য। কৃষকদের বক্তব্য, বরাদ্দ থাকলেও প্রয়োজনের সময় তাঁরা সার পাচ্ছেন না। বিশেষ করে শিলখুড়িতে আবাদি জমির পরিমাণ বাড়লেও আগের কাঠামো অনুযায়ী বরাদ্দ দেওয়ায় সংকট তৈরি হয়েছে।

চাহিদার তুলনায় বরাদ্দে বড় ঘাটতি

ভূরুঙ্গামারীতে চলতি রোপা আমন মৌসুমে ১৬ হাজার ৯০০ হেক্টর জমিতে ধান চাষ হয়েছে। উপজেলায় কৃষক রয়েছেন ৬১ হাজার ১৯০ জন। তাঁদের জন্য ১০ জন বিসিআইসি ও ৭ জন বিএডিসি ডিলার রয়েছেন। উপজেলায় ইউরিয়া, টিএসপি, ডিএপি ও এমওপি মিলিয়ে মোট ১ হাজার ১২৪ দশমিক ৪৫ মেট্রিক টন সার বরাদ্দ রয়েছে। এর মধ্যে শিলখুড়ি ইউনিয়নে বরাদ্দ ১১৯ দশমিক ৯ মেট্রিক টন।

শিলখুড়িতে চলতি মৌসুমে ১ হাজার ৯৫০ হেক্টর জমিতে রোপা আমন চাষ হয়েছে। কৃষি বিভাগের নির্ধারিত মাত্রা অনুযায়ী, এসব জমিতে চার ধরনের সার মিলিয়ে প্রয়োজন প্রায় ১ হাজার ১৭০ মেট্রিক টন। এর বিপরীতে সরবরাহ করা হয়েছে মাত্র ১১৯ দশমিক ৯ মেট্রিক টন। অর্থাৎ চাহিদার তুলনায় সরবরাহ হয়েছে প্রায় ১০ দশমিক ২৫ শতাংশ। ঘাটতি প্রায় ১ হাজার ৫০ দশমিক ১ মেট্রিক টন।

ইউরিয়া সারের ঘাটতি আরও বেশি। ১ হাজার ৯৫০ হেক্টর জমির জন্য প্রতি বিঘায় ৩০ কেজি হিসাবে ইউরিয়া প্রয়োজন প্রায় ৪৩৮ দশমিক ৭৫ মেট্রিক টন। বিপরীতে সরবরাহ করা হয়েছে ৬৮ মেট্রিক টন। অর্থাৎ প্রয়োজনের তুলনায় সরবরাহ প্রায় ১৫ দশমিক ৫ শতাংশ। ঘাটতি ৩৭০ দশমিক ৭৫ মেট্রিক টন।

কৃষি বিভাগের উপপরিচালক আবদুল্লাহ আল মামুন বলেন, আগে সব ডিলারকে সমানভাবে সার বরাদ্দ দেওয়ার নিয়ম থাকায় শিলখুড়িতে প্রয়োজনের তুলনায় কম সার পৌঁছাত। ফলে সেখানে সংকট তৈরি হয়েছে। অন্য ইউনিয়ন থেকে সার সমন্বয় করে শিলখুড়িতে বিতরণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

পাগলার হাট এলাকার কৃষক মোহাম্মদ আলী বলেন, তিনি ১২ বিঘা জমিতে ধান চাষ করেছেন। ধান রোপণের ২১ দিনের মধ্যে সার দেওয়ার কথা থাকলেও ২৬ দিনেও তিনি সার পাননি। সরকারি মূল্যের চেয়ে বেশি দামে তাঁকে খোলা বাজার থেকে সার কিনতে হচ্ছে।

শিলখুড়ির কৃষক আজিজুল হক সোহেল বলেন, ‘ধান চাষ করে নিজের বিপদ নিজেই এনেছি। এখন সারের জন্য ঘুরব, নাকি জমিতে ধানের পরিচর্যা করব?’

ইউনিয়নের বাইরে ডিলারদের গুদাম

সারের সংকটের পেছনে ডিলারদের গুদাম ব্যবস্থাপনাও ভূমিকা রাখছে বলে অভিযোগ করেছেন কৃষকেরা। তাঁদের অভিযোগ, কোনো কোনো ডিলারের মূল গুদাম ইউনিয়নের বাইরে উপজেলা সদর বা নিজ এলাকায়। ফলে বরাদ্দ করা সার ইউনিয়নের বিক্রয়কেন্দ্রে নিয়মিত না থাকায় কৃষকেরা সময়মতো সার পাচ্ছেন না।

সোমবার উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়ন ঘুরে দেখা যায়, পাথরডুবি ও তিলাই ইউনিয়নের ডিলার সইদুল ইসলাম ব্যাপারী ও তাঁর স্ত্রী ডেইজি বেগমের সারগুদাম উপজেলা সদরের সাদ্দাম মোড়ে। আন্ধারীঝাড়, চর ভূরুঙ্গামারী ও বঙ্গ সোনাহাট ইউনিয়নের ডিলার জনার্দন সাহা, নিতাই সাহা ও মন্টেন্ড সাহার মূল গুদাম বাঘভাণ্ডার সড়কের পাশে তাঁদের বসতবাড়ির এলাকায় বলে স্থানীয়রা জানান। শিলখুড়ির ডিলার শাহ আমানত ট্রেডার্সের স্বত্বাধিকারী তাইফুর রহমান মুকুলের গুদামও ইউনিয়নের বাইরে বলে জানা গেছে।

কৃষকদের অভিযোগ, ইউনিয়নের বিক্রয়কেন্দ্র নিয়মিত খোলা না থাকায় একসঙ্গে কয়েক শ কৃষক সেখানে ভিড় করেন। এতে মজুতের তুলনায় কৃষকের সংখ্যা বেশি হওয়ায় সংকট ও উত্তেজনা তৈরি হয়।

শিলখুড়ির উত্তর ধলডাঙ্গা গ্রামের কৃষক মিজানুর রহমান বলেন, গত এক সপ্তাহ ধরে প্রতিদিন ডিলার পয়েন্টে গিয়ে ঘুরেছেন। এক দিনও বিক্রয়কেন্দ্র খোলা পাননি। রোববার জাতীয় পরিচয়পত্র নিয়ে সকাল আটটায় লাইনে দাঁড়িয়েও সাড়ে নয়টার আগে ডিলার আসেননি। পরে সার সংকটের কথা বলে বিতরণ বন্ধ রাখা হয়। একপর্যায়ে কৃষকেরা গুদাম থেকে সার নিয়ে যান।

মিজানুর রহমান বলেন, ‘লুট করা সার জমিতে দিলে ওই ফসল হালাল হবে না। তাই আমি বস্তা নিইনি। আজ খোলা বাজারে সার কিনতে এসেছি। কিন্তু ধলডাঙ্গা বাজারের সব দোকান বন্ধ।’

বিএডিসি ডিলারকে সার দেওয়ার অভিযোগ

ভূরুঙ্গামারীতে ১০ জন বিসিআইসি ও ৭ জন বিএডিসি ডিলার রয়েছেন। বিসিআইসি ডিলাররা ইউরিয়াসহ সব ধরনের সার বিক্রি করতে পারেন। বিএডিসি ডিলাররা ইউরিয়া ছাড়া টিএসপি, ডিএপি ও এমওপি বিক্রি করেন।

শিলখুড়ির বিসিআইসি ডিলারের প্রতিনিধি সহিদুল ইসলামের অভিযোগ, উপজেলা কৃষি কর্মকর্তার নির্দেশে প্রতি চালানে বিসিআইসি ডিলারের কাছ থেকে ১০০ বস্তা করে সার বিএডিসি ডিলার নুর ইসলামকে দেওয়া হয়েছে। নুর ইসলামের তিনটি ওয়ার্ডের কৃষকদের সার দেওয়ার কথা থাকলেও সেখানে বিতরণ না হওয়ায় নয়টি ওয়ার্ডের কৃষকের চাপ সামলাতে হচ্ছে বিসিআইসি ডিলারকে।

নুর ইসলাম অভিযোগটি স্বীকার করে বলেন, তাঁর কাছে আসা সার খোলা বাজারে ৫ ও ১০ কেজি করে বিক্রি করেন। সরকারি নির্ধারিত দামেই সার বিক্রি করেন বলে দাবি তাঁর। তবে রোববার পাগলার হাটে খোলা বাজারে সার বিক্রির অভিযোগে তাঁকে জরিমানা করেছে উপজেলা প্রশাসন।

কৃষি বিভাগের উপপরিচালক আবদুল্লাহ আল মামুন বলেন, বিসিআইসি ডিলারের কাছ থেকে সার কেটে বিএডিসি ডিলারের কেন্দ্রে দেওয়ার সুযোগ নেই। উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা এ কাজ করে থাকলে তদন্ত করে দেখা হবে।

রাজনৈতিক বিরোধের অভিযোগ

সার বিতরণকে কেন্দ্র করে স্থানীয় রাজনৈতিক বিরোধের বিষয়টিও সামনে এসেছে। ডিলার তাইফুর রহমান মুকুলের অভিযোগ, স্থানীয় বিএনপির নেতা মোহাম্মদ আলীর উসকানিতে কৃষকেরা গুদাম থেকে সার নিয়ে যান। এ ঘটনায় তিনি ভূরুঙ্গামারী থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেছেন।

তবে বিএনপির অপর পক্ষের নেতা আবদুল লতিফের দাবি, ডিলারের সঙ্গে থাকা কয়েকজন বিএনপি নেতা সার বিক্রিতে পার্সেন্টেজ নেন এবং বাইরে সার বিক্রি করেন। রোববার কৃষকেরা তাঁদের দেখে উত্তেজিত হয়ে পড়লে তিনি ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি শান্ত করেন।

কৃষকদের উসকানি দেওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করে আবদুল লতিফ প্রতিনিধিকে বলেন, ‘আমি কাউকে সার নেওয়ার জন্য উসকানি দিইনি। সরকারের ভাবমূর্তি যাতে নষ্ট না হয়, সে জন্য সার বিতরণের সময় ঘটনাস্থলে গিয়েছিলাম।’

সারের সংকটের ঘটনায় রোববার রাতে উপজেলা সহকারী কমিশনারকে (ভূমি) সভাপতি করে পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটি করা হয়। কমিটির সদস্যসচিব উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা। অন্য সদস্যরা হলেন উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা, উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তা ও উপজেলা একাডেমিক সুপারভাইজার। কমিটিকে সোমবার বিকেলের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে।

ভূরুঙ্গামারী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. আবদুল আজিম বলেন, রোববার রাতে ডিলার জিডি করেছেন। সোমবার বিকেল চারটা পর্যন্ত ১১৫ বস্তা সার পাওয়া গেছে। অন্য সার উদ্ধারের চেষ্টা চলছে।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা অমৃত দেবনাথ প্রতিনিধিকে বলেন, ‘তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন এখনো হাতে আসেনি। প্রতিবেদন পাওয়ার পর প্রকৃত ঘটনা জানা যাবে। এখন পর্যন্ত ১১৫ বস্তা সারের হদিস পাওয়া গেছে।’

ট্যাগস :

নিউজটি শেয়ার করুন

বরাদ্দ আছে, তবু সারের জন্য কৃষকের হাহাকার: ভূরুঙ্গামারীতে ক্ষোভের নেপথ্যে বণ্টনব্যবস্থা

আপডেট সময়ঃ ০১:২৭:০১ অপরাহ্ন, বুধবার, ২৬ অগাস্ট ২০২৬

প্রতিনিধি, কুড়িগ্রাম: কুড়িগ্রামের ভূরুঙ্গামারীতে সারের সংকট নিয়ে কৃষকদের ক্ষোভ চরমে উঠেছে। গত রোববার শিলখুড়ি ইউনিয়নের ধলডাঙ্গা বাজারে এক ডিলারের গুদামের বেড়া ভেঙে কৃষকেরা ২২৫ বস্তা সার নিয়ে যান। পরে প্রশাসনের আশ্বাসে সোমবার বিকেল পর্যন্ত ১১৫ বস্তা সার ফেরত দিয়েছেন তাঁরা। এ ঘটনায় পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটি করেছে উপজেলা প্রশাসন।

কৃষকদের অভিযোগ, চাহিদার তুলনায় সরবরাহ কম। আবার কোনো কোনো ডিলার নিয়মিত বিক্রয়কেন্দ্র খোলেন না। ফলে ধান রোপণের পর প্রয়োজনীয় সময়ে সার না পেয়ে খোলা বাজার থেকে বেশি দামে সার কিনতে হচ্ছে তাঁদের।

তবে কৃষি বিভাগের দাবি, উপজেলায় কৃষকের চাহিদা অনুযায়ী সার রয়েছে। শিলখুড়িতে যে সংকট তৈরি হয়েছে, তার অন্যতম কারণ ডিলারসংখ্যা ও ইউনিয়নভিত্তিক বরাদ্দে অসামঞ্জস্য। কৃষকদের বক্তব্য, বরাদ্দ থাকলেও প্রয়োজনের সময় তাঁরা সার পাচ্ছেন না। বিশেষ করে শিলখুড়িতে আবাদি জমির পরিমাণ বাড়লেও আগের কাঠামো অনুযায়ী বরাদ্দ দেওয়ায় সংকট তৈরি হয়েছে।

চাহিদার তুলনায় বরাদ্দে বড় ঘাটতি

ভূরুঙ্গামারীতে চলতি রোপা আমন মৌসুমে ১৬ হাজার ৯০০ হেক্টর জমিতে ধান চাষ হয়েছে। উপজেলায় কৃষক রয়েছেন ৬১ হাজার ১৯০ জন। তাঁদের জন্য ১০ জন বিসিআইসি ও ৭ জন বিএডিসি ডিলার রয়েছেন। উপজেলায় ইউরিয়া, টিএসপি, ডিএপি ও এমওপি মিলিয়ে মোট ১ হাজার ১২৪ দশমিক ৪৫ মেট্রিক টন সার বরাদ্দ রয়েছে। এর মধ্যে শিলখুড়ি ইউনিয়নে বরাদ্দ ১১৯ দশমিক ৯ মেট্রিক টন।

শিলখুড়িতে চলতি মৌসুমে ১ হাজার ৯৫০ হেক্টর জমিতে রোপা আমন চাষ হয়েছে। কৃষি বিভাগের নির্ধারিত মাত্রা অনুযায়ী, এসব জমিতে চার ধরনের সার মিলিয়ে প্রয়োজন প্রায় ১ হাজার ১৭০ মেট্রিক টন। এর বিপরীতে সরবরাহ করা হয়েছে মাত্র ১১৯ দশমিক ৯ মেট্রিক টন। অর্থাৎ চাহিদার তুলনায় সরবরাহ হয়েছে প্রায় ১০ দশমিক ২৫ শতাংশ। ঘাটতি প্রায় ১ হাজার ৫০ দশমিক ১ মেট্রিক টন।

ইউরিয়া সারের ঘাটতি আরও বেশি। ১ হাজার ৯৫০ হেক্টর জমির জন্য প্রতি বিঘায় ৩০ কেজি হিসাবে ইউরিয়া প্রয়োজন প্রায় ৪৩৮ দশমিক ৭৫ মেট্রিক টন। বিপরীতে সরবরাহ করা হয়েছে ৬৮ মেট্রিক টন। অর্থাৎ প্রয়োজনের তুলনায় সরবরাহ প্রায় ১৫ দশমিক ৫ শতাংশ। ঘাটতি ৩৭০ দশমিক ৭৫ মেট্রিক টন।

কৃষি বিভাগের উপপরিচালক আবদুল্লাহ আল মামুন বলেন, আগে সব ডিলারকে সমানভাবে সার বরাদ্দ দেওয়ার নিয়ম থাকায় শিলখুড়িতে প্রয়োজনের তুলনায় কম সার পৌঁছাত। ফলে সেখানে সংকট তৈরি হয়েছে। অন্য ইউনিয়ন থেকে সার সমন্বয় করে শিলখুড়িতে বিতরণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

পাগলার হাট এলাকার কৃষক মোহাম্মদ আলী বলেন, তিনি ১২ বিঘা জমিতে ধান চাষ করেছেন। ধান রোপণের ২১ দিনের মধ্যে সার দেওয়ার কথা থাকলেও ২৬ দিনেও তিনি সার পাননি। সরকারি মূল্যের চেয়ে বেশি দামে তাঁকে খোলা বাজার থেকে সার কিনতে হচ্ছে।

শিলখুড়ির কৃষক আজিজুল হক সোহেল বলেন, ‘ধান চাষ করে নিজের বিপদ নিজেই এনেছি। এখন সারের জন্য ঘুরব, নাকি জমিতে ধানের পরিচর্যা করব?’

ইউনিয়নের বাইরে ডিলারদের গুদাম

সারের সংকটের পেছনে ডিলারদের গুদাম ব্যবস্থাপনাও ভূমিকা রাখছে বলে অভিযোগ করেছেন কৃষকেরা। তাঁদের অভিযোগ, কোনো কোনো ডিলারের মূল গুদাম ইউনিয়নের বাইরে উপজেলা সদর বা নিজ এলাকায়। ফলে বরাদ্দ করা সার ইউনিয়নের বিক্রয়কেন্দ্রে নিয়মিত না থাকায় কৃষকেরা সময়মতো সার পাচ্ছেন না।

সোমবার উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়ন ঘুরে দেখা যায়, পাথরডুবি ও তিলাই ইউনিয়নের ডিলার সইদুল ইসলাম ব্যাপারী ও তাঁর স্ত্রী ডেইজি বেগমের সারগুদাম উপজেলা সদরের সাদ্দাম মোড়ে। আন্ধারীঝাড়, চর ভূরুঙ্গামারী ও বঙ্গ সোনাহাট ইউনিয়নের ডিলার জনার্দন সাহা, নিতাই সাহা ও মন্টেন্ড সাহার মূল গুদাম বাঘভাণ্ডার সড়কের পাশে তাঁদের বসতবাড়ির এলাকায় বলে স্থানীয়রা জানান। শিলখুড়ির ডিলার শাহ আমানত ট্রেডার্সের স্বত্বাধিকারী তাইফুর রহমান মুকুলের গুদামও ইউনিয়নের বাইরে বলে জানা গেছে।

কৃষকদের অভিযোগ, ইউনিয়নের বিক্রয়কেন্দ্র নিয়মিত খোলা না থাকায় একসঙ্গে কয়েক শ কৃষক সেখানে ভিড় করেন। এতে মজুতের তুলনায় কৃষকের সংখ্যা বেশি হওয়ায় সংকট ও উত্তেজনা তৈরি হয়।

শিলখুড়ির উত্তর ধলডাঙ্গা গ্রামের কৃষক মিজানুর রহমান বলেন, গত এক সপ্তাহ ধরে প্রতিদিন ডিলার পয়েন্টে গিয়ে ঘুরেছেন। এক দিনও বিক্রয়কেন্দ্র খোলা পাননি। রোববার জাতীয় পরিচয়পত্র নিয়ে সকাল আটটায় লাইনে দাঁড়িয়েও সাড়ে নয়টার আগে ডিলার আসেননি। পরে সার সংকটের কথা বলে বিতরণ বন্ধ রাখা হয়। একপর্যায়ে কৃষকেরা গুদাম থেকে সার নিয়ে যান।

মিজানুর রহমান বলেন, ‘লুট করা সার জমিতে দিলে ওই ফসল হালাল হবে না। তাই আমি বস্তা নিইনি। আজ খোলা বাজারে সার কিনতে এসেছি। কিন্তু ধলডাঙ্গা বাজারের সব দোকান বন্ধ।’

বিএডিসি ডিলারকে সার দেওয়ার অভিযোগ

ভূরুঙ্গামারীতে ১০ জন বিসিআইসি ও ৭ জন বিএডিসি ডিলার রয়েছেন। বিসিআইসি ডিলাররা ইউরিয়াসহ সব ধরনের সার বিক্রি করতে পারেন। বিএডিসি ডিলাররা ইউরিয়া ছাড়া টিএসপি, ডিএপি ও এমওপি বিক্রি করেন।

শিলখুড়ির বিসিআইসি ডিলারের প্রতিনিধি সহিদুল ইসলামের অভিযোগ, উপজেলা কৃষি কর্মকর্তার নির্দেশে প্রতি চালানে বিসিআইসি ডিলারের কাছ থেকে ১০০ বস্তা করে সার বিএডিসি ডিলার নুর ইসলামকে দেওয়া হয়েছে। নুর ইসলামের তিনটি ওয়ার্ডের কৃষকদের সার দেওয়ার কথা থাকলেও সেখানে বিতরণ না হওয়ায় নয়টি ওয়ার্ডের কৃষকের চাপ সামলাতে হচ্ছে বিসিআইসি ডিলারকে।

নুর ইসলাম অভিযোগটি স্বীকার করে বলেন, তাঁর কাছে আসা সার খোলা বাজারে ৫ ও ১০ কেজি করে বিক্রি করেন। সরকারি নির্ধারিত দামেই সার বিক্রি করেন বলে দাবি তাঁর। তবে রোববার পাগলার হাটে খোলা বাজারে সার বিক্রির অভিযোগে তাঁকে জরিমানা করেছে উপজেলা প্রশাসন।

কৃষি বিভাগের উপপরিচালক আবদুল্লাহ আল মামুন বলেন, বিসিআইসি ডিলারের কাছ থেকে সার কেটে বিএডিসি ডিলারের কেন্দ্রে দেওয়ার সুযোগ নেই। উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা এ কাজ করে থাকলে তদন্ত করে দেখা হবে।

রাজনৈতিক বিরোধের অভিযোগ

সার বিতরণকে কেন্দ্র করে স্থানীয় রাজনৈতিক বিরোধের বিষয়টিও সামনে এসেছে। ডিলার তাইফুর রহমান মুকুলের অভিযোগ, স্থানীয় বিএনপির নেতা মোহাম্মদ আলীর উসকানিতে কৃষকেরা গুদাম থেকে সার নিয়ে যান। এ ঘটনায় তিনি ভূরুঙ্গামারী থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেছেন।

তবে বিএনপির অপর পক্ষের নেতা আবদুল লতিফের দাবি, ডিলারের সঙ্গে থাকা কয়েকজন বিএনপি নেতা সার বিক্রিতে পার্সেন্টেজ নেন এবং বাইরে সার বিক্রি করেন। রোববার কৃষকেরা তাঁদের দেখে উত্তেজিত হয়ে পড়লে তিনি ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি শান্ত করেন।

কৃষকদের উসকানি দেওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করে আবদুল লতিফ প্রতিনিধিকে বলেন, ‘আমি কাউকে সার নেওয়ার জন্য উসকানি দিইনি। সরকারের ভাবমূর্তি যাতে নষ্ট না হয়, সে জন্য সার বিতরণের সময় ঘটনাস্থলে গিয়েছিলাম।’

সারের সংকটের ঘটনায় রোববার রাতে উপজেলা সহকারী কমিশনারকে (ভূমি) সভাপতি করে পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটি করা হয়। কমিটির সদস্যসচিব উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা। অন্য সদস্যরা হলেন উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা, উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তা ও উপজেলা একাডেমিক সুপারভাইজার। কমিটিকে সোমবার বিকেলের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে।

ভূরুঙ্গামারী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. আবদুল আজিম বলেন, রোববার রাতে ডিলার জিডি করেছেন। সোমবার বিকেল চারটা পর্যন্ত ১১৫ বস্তা সার পাওয়া গেছে। অন্য সার উদ্ধারের চেষ্টা চলছে।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা অমৃত দেবনাথ প্রতিনিধিকে বলেন, ‘তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন এখনো হাতে আসেনি। প্রতিবেদন পাওয়ার পর প্রকৃত ঘটনা জানা যাবে। এখন পর্যন্ত ১১৫ বস্তা সারের হদিস পাওয়া গেছে।’