ঢাকা, সোমবার, ০৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ই-পেপার

২৪ ঘণ্টায় তিস্তার গর্ভে শতাধিক বসতঘর, আতঙ্কে আরও ২০০ পরিবার

দৈনিক আইন বার্তা
  • আপডেট সময়ঃ ০৮:৪২:১৫ অপরাহ্ন, শনিবার, ৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬
  • / ২৯ বার পড়া হয়েছে

বিশেষ প্রতিনিধি: সুন্দরগঞ্জের কাপাসিয়া ইউনিয়নে ভয়াবহ নদীভাঙন; স্কুলের পর এবার গ্রাম গিলে খাচ্ছে তিস্তা, পানি উন্নয়ন বোর্ডের বিরুদ্ধে অবহেলার অভিযোগ
তিস্তার ভয়াবহ ভাঙনে শতাধিক বসতঘর বিলীন

‘ঘর তোলার এখন কোথায় যাইয়া ঠাঁই নিমু? ঘর তোলার শেষ সম্বলটুকুও কেড়ে নিল রাক্ষুসী তিস্তা। গত দুই বছরে ছয়বার নদীভাঙনের শিকার হওয়ার পর এই জায়গায় কোনোমতে মাথা গুঁজে ছিলাম। সেটাও আজ চলে গেল। চোখের সামনে দুইটা ঘর নদীতে ভেসে গেল, কিছুই করতে পারলাম না। এখন কী খাব, কোথায় যাব—কোনো দিশা নাই।’

কান্নাজড়িত কণ্ঠে কথাগুলো বলছিলেন গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ উপজেলার কাপাসিয়া ইউনিয়নের ভোরের পাখি চরের সিংগীজানী গ্রামের বাসিন্দা আব্দুল করিম। একইভাবে আহাজারি করছিলেন আজিভান বেগম ও কোমেরন বেওয়া। তাদের মতো শতাধিক পরিবার এখন সর্বস্ব হারিয়ে খোলা আকাশের নিচে মানবেতর জীবন কাটানোর শঙ্কায় দিন পার করছে।

গত ২৪ ঘণ্টার ব্যবধানে তিস্তা নদীর ভয়াবহ ভাঙনে সুন্দরগঞ্জ উপজেলার কাপাসিয়া ইউনিয়নের ভোরের পাখি চর ও সিংগীজানী গ্রামের শতাধিক বসতঘর নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। ভাঙনের মুখে রয়েছে আরও প্রায় ২০০ বসতঘর এবং শতাধিক একর আবাদি জমি। স্থানীয়দের অভিযোগ, পানি উন্নয়ন বোর্ডের দীর্ঘদিনের গাফিলতি ও অবহেলার কারণেই ভয়াবহ এই ক্ষয়ক্ষতির ঘটনা ঘটেছে।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, বৃহস্পতিবার বিকেল থেকে নদীর তীব্র স্রোত ও ভাঙন শুরু হয়। মুহূর্তের মধ্যে একের পর এক বসতঘর তিস্তার গর্ভে হারিয়ে যেতে থাকে। অনেক পরিবার ঘরের মালামাল সরিয়ে নেওয়ারও সুযোগ পায়নি। আতঙ্কে নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে ছুটতে থাকে চরবাসী।

খবর পেয়ে শুক্রবার সকাল ১০টার দিকে ভাঙনকবলিত এলাকা পরিদর্শন করেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ইফফাত জাহান তুলি। এ সময় উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা মো. মশিয়ার রহমান, উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা নূর মোহাম্মদ, উপজেলা বিএনপির সদস্য সচিব মো. মাহমুদুল ইসলাম প্রামাণিক, কাপাসিয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. মঞ্জু মিয়া এবং পানি উন্নয়ন বোর্ডের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।

উল্লেখ্য, গত ১৮ আগস্ট একই স্থানে তিস্তার ভাঙনে ভোরের পাখি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যায়। বিদ্যালয়টি হারানোর রেশ কাটতে না কাটতেই নতুন করে বসতভিটা হারিয়ে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন চরবাসী।

স্থানীয় বাসিন্দা মো. আতোয়ার রহমান ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “যখন ভাঙন শুরু হয় তখনই শুধু পানি উন্নয়ন বোর্ডের ঘুম ভাঙে। ভাঙন থেমে গেলে তারা আবার নিশ্চুপ হয়ে যায়। ভোরের পাখি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়সহ শতাধিক বসতঘর ও শত শত একর ফসলি জমি নদীতে বিলীন হওয়ার পরও কার্যকর কোনো স্থায়ী উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।”

উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা মো. মশিয়ার রহমান জানান, ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের তালিকা প্রস্তুতের কাজ চলছে। ইতোমধ্যে কিছু শুকনো খাবার বিতরণ করা হয়েছে এবং প্রয়োজনীয় সহায়তার জন্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ অব্যাহত রয়েছে।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ইফফাত জাহান তুলি বলেন, “ভাঙনকবলিত এলাকা সরেজমিনে পরিদর্শন করা হয়েছে। তাৎক্ষণিকভাবে পানি উন্নয়ন বোর্ডের সহযোগিতায় জিও ব্যাগ ফেলার কাজ শুরু হয়েছে। বিষয়টি জেলা প্রশাসক ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়কে অবহিত করা হয়েছে। বরাদ্দ পাওয়া সাপেক্ষে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের মধ্যে সহায়তা বিতরণ করা হবে।”

গাইবান্ধা পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. শরিফুল ইসলাম বলেন, “খবর পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই ভাঙন এলাকায় জিও ব্যাগ ফেলার কাজ শুরু করা হয়েছে। তবে শুধু জিও ব্যাগ বা জিও টিউব দিয়ে তিস্তার ভাঙন স্থায়ীভাবে রোধ করা সম্ভব নয়। নদী খনন, ড্রেজিং, নদীশাসন এবং প্রয়োজনীয় প্রকৌশলগত ব্যবস্থা গ্রহণ ছাড়া এই সমস্যার দীর্ঘমেয়াদি সমাধান সম্ভব নয়।”

এদিকে নদীভাঙনের তীব্রতা বাড়তে থাকায় চরাঞ্চলের মানুষ চরম আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন। তাদের দাবি, প্রতি বছর একইভাবে ঘরবাড়ি ও ফসলি জমি হারালেও স্থায়ীভাবে ভাঙন রোধে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে না। দ্রুত টেকসই বাঁধ নির্মাণ ও নদীশাসনের ব্যবস্থা না নিলে তিস্তার ভয়াল গ্রাসে আরও বিস্তীর্ণ জনপদ বিলীন হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

ট্যাগস :

নিউজটি শেয়ার করুন

২৪ ঘণ্টায় তিস্তার গর্ভে শতাধিক বসতঘর, আতঙ্কে আরও ২০০ পরিবার

আপডেট সময়ঃ ০৮:৪২:১৫ অপরাহ্ন, শনিবার, ৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬

বিশেষ প্রতিনিধি: সুন্দরগঞ্জের কাপাসিয়া ইউনিয়নে ভয়াবহ নদীভাঙন; স্কুলের পর এবার গ্রাম গিলে খাচ্ছে তিস্তা, পানি উন্নয়ন বোর্ডের বিরুদ্ধে অবহেলার অভিযোগ
তিস্তার ভয়াবহ ভাঙনে শতাধিক বসতঘর বিলীন

‘ঘর তোলার এখন কোথায় যাইয়া ঠাঁই নিমু? ঘর তোলার শেষ সম্বলটুকুও কেড়ে নিল রাক্ষুসী তিস্তা। গত দুই বছরে ছয়বার নদীভাঙনের শিকার হওয়ার পর এই জায়গায় কোনোমতে মাথা গুঁজে ছিলাম। সেটাও আজ চলে গেল। চোখের সামনে দুইটা ঘর নদীতে ভেসে গেল, কিছুই করতে পারলাম না। এখন কী খাব, কোথায় যাব—কোনো দিশা নাই।’

কান্নাজড়িত কণ্ঠে কথাগুলো বলছিলেন গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ উপজেলার কাপাসিয়া ইউনিয়নের ভোরের পাখি চরের সিংগীজানী গ্রামের বাসিন্দা আব্দুল করিম। একইভাবে আহাজারি করছিলেন আজিভান বেগম ও কোমেরন বেওয়া। তাদের মতো শতাধিক পরিবার এখন সর্বস্ব হারিয়ে খোলা আকাশের নিচে মানবেতর জীবন কাটানোর শঙ্কায় দিন পার করছে।

গত ২৪ ঘণ্টার ব্যবধানে তিস্তা নদীর ভয়াবহ ভাঙনে সুন্দরগঞ্জ উপজেলার কাপাসিয়া ইউনিয়নের ভোরের পাখি চর ও সিংগীজানী গ্রামের শতাধিক বসতঘর নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। ভাঙনের মুখে রয়েছে আরও প্রায় ২০০ বসতঘর এবং শতাধিক একর আবাদি জমি। স্থানীয়দের অভিযোগ, পানি উন্নয়ন বোর্ডের দীর্ঘদিনের গাফিলতি ও অবহেলার কারণেই ভয়াবহ এই ক্ষয়ক্ষতির ঘটনা ঘটেছে।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, বৃহস্পতিবার বিকেল থেকে নদীর তীব্র স্রোত ও ভাঙন শুরু হয়। মুহূর্তের মধ্যে একের পর এক বসতঘর তিস্তার গর্ভে হারিয়ে যেতে থাকে। অনেক পরিবার ঘরের মালামাল সরিয়ে নেওয়ারও সুযোগ পায়নি। আতঙ্কে নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে ছুটতে থাকে চরবাসী।

খবর পেয়ে শুক্রবার সকাল ১০টার দিকে ভাঙনকবলিত এলাকা পরিদর্শন করেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ইফফাত জাহান তুলি। এ সময় উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা মো. মশিয়ার রহমান, উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা নূর মোহাম্মদ, উপজেলা বিএনপির সদস্য সচিব মো. মাহমুদুল ইসলাম প্রামাণিক, কাপাসিয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. মঞ্জু মিয়া এবং পানি উন্নয়ন বোর্ডের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।

উল্লেখ্য, গত ১৮ আগস্ট একই স্থানে তিস্তার ভাঙনে ভোরের পাখি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যায়। বিদ্যালয়টি হারানোর রেশ কাটতে না কাটতেই নতুন করে বসতভিটা হারিয়ে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন চরবাসী।

স্থানীয় বাসিন্দা মো. আতোয়ার রহমান ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “যখন ভাঙন শুরু হয় তখনই শুধু পানি উন্নয়ন বোর্ডের ঘুম ভাঙে। ভাঙন থেমে গেলে তারা আবার নিশ্চুপ হয়ে যায়। ভোরের পাখি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়সহ শতাধিক বসতঘর ও শত শত একর ফসলি জমি নদীতে বিলীন হওয়ার পরও কার্যকর কোনো স্থায়ী উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।”

উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা মো. মশিয়ার রহমান জানান, ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের তালিকা প্রস্তুতের কাজ চলছে। ইতোমধ্যে কিছু শুকনো খাবার বিতরণ করা হয়েছে এবং প্রয়োজনীয় সহায়তার জন্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ অব্যাহত রয়েছে।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ইফফাত জাহান তুলি বলেন, “ভাঙনকবলিত এলাকা সরেজমিনে পরিদর্শন করা হয়েছে। তাৎক্ষণিকভাবে পানি উন্নয়ন বোর্ডের সহযোগিতায় জিও ব্যাগ ফেলার কাজ শুরু হয়েছে। বিষয়টি জেলা প্রশাসক ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়কে অবহিত করা হয়েছে। বরাদ্দ পাওয়া সাপেক্ষে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের মধ্যে সহায়তা বিতরণ করা হবে।”

গাইবান্ধা পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. শরিফুল ইসলাম বলেন, “খবর পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই ভাঙন এলাকায় জিও ব্যাগ ফেলার কাজ শুরু করা হয়েছে। তবে শুধু জিও ব্যাগ বা জিও টিউব দিয়ে তিস্তার ভাঙন স্থায়ীভাবে রোধ করা সম্ভব নয়। নদী খনন, ড্রেজিং, নদীশাসন এবং প্রয়োজনীয় প্রকৌশলগত ব্যবস্থা গ্রহণ ছাড়া এই সমস্যার দীর্ঘমেয়াদি সমাধান সম্ভব নয়।”

এদিকে নদীভাঙনের তীব্রতা বাড়তে থাকায় চরাঞ্চলের মানুষ চরম আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন। তাদের দাবি, প্রতি বছর একইভাবে ঘরবাড়ি ও ফসলি জমি হারালেও স্থায়ীভাবে ভাঙন রোধে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে না। দ্রুত টেকসই বাঁধ নির্মাণ ও নদীশাসনের ব্যবস্থা না নিলে তিস্তার ভয়াল গ্রাসে আরও বিস্তীর্ণ জনপদ বিলীন হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।