লোকোমোটিভ সচল রাখতে সার্ভিস কন্ট্রাক্ট, নাকি নতুন ঝুঁকি?
- আপডেট সময়ঃ ০৪:০৪:৪০ অপরাহ্ন, সোমবার, ১৭ অগাস্ট ২০২৬
- / ২৮ বার পড়া হয়েছে
রিপন চৌধুরী বিশেষ প্রতিনিধি: বাংলাদেশ রেলের নিরাপদ ও নিরবচ্ছিন্ন যাত্রীসেবার অন্যতম প্রধান শর্ত সচল লোকোমোটিভ। কিন্তু নতুন লোকোমোটিভের যন্ত্রাংশ সংগ্রহ ও রক্ষণাবেক্ষণ নিয়ে দীর্ঘসূত্রতা এবার সেই সক্ষমতাকেই প্রশ্নের মুখে ফেলেছে। বিশেষ করে ৩০০০ ও ৬৬০০ সিরিজের লোকোমোটিভের স্পেয়ার পার্টস সংগ্রহে প্রচলিত উন্মুক্ত প্রতিযোগিতামূলক দরপত্রের পরিবর্তে নির্মাতা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি ‘সার্ভিস কন্ট্রাক্ট’ করার উদ্যোগ নিয়ে আপত্তি তুলেছেন রেলের তালিকাভুক্ত স্থানীয় ও বিদেশি সরবরাহকারীদের একটি অংশ।
তাদের অভিযোগ, সার্ভিস কন্ট্রাক্টের আওতায় যন্ত্রাংশ ও রক্ষণাবেক্ষণসেবা পেতে দীর্ঘ সময় লাগতে পারে। অথচ স্থানীয় প্রতিনিধির মাধ্যমে আন্তর্জাতিক উৎস থেকে একই ধরনের অনেক যন্ত্রাংশ তুলনামূলক কম সময়ে সংগ্রহ করা সম্ভব। এতে জরুরি মেরামতের জন্য অপেক্ষমাণ লোকোমোটিভের সংখ্যা বাড়ার পাশাপাশি যাত্রীবাহী ট্রেন পরিচালনাতেও বিরূপ প্রভাব পড়তে পারে।
এ নিয়ে রেলপথ মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট পর্যায়ে একটি আনঅফিসিয়াল আবেদনও দেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে। আবেদনে প্রচলিত নিয়মে তালিকাভুক্ত সরবরাহকারীদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করে উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে যন্ত্রাংশ কেনার দাবি জানানো হয়েছে।
বাংলাদেশ রেলওয়ের প্রকাশিত তথ্য বলছে, ডিজেল-ইলেকট্রিক লোকোমোটিভের স্পেয়ার পার্টস সংগ্রহে উন্মুক্ত প্রতিযোগিতামূলক পদ্ধতি অনুসরণের নজির রয়েছে। ২০২৪ সালের ১৯ আগস্ট বাংলাদেশ রেলওয়ের চিফ কন্ট্রোলার অব স্টোরস, পাহাড়তলীর পক্ষ থেকে ‘Application for Selection and Approval of Qualified Potential Tenderer for the Procurement of Diesel Electric Locomotives Spare Parts’ শীর্ষক প্রি-কোয়ালিফিকেশন আহ্বান করা হয়। এর রেফারেন্স নম্বর 54.01.1543.455.07.037.24 এবং ক্রয়পদ্ধতি ছিল ICT Open Tendering Method।
অর্থাৎ, স্পেয়ার পার্টস সংগ্রহে প্রতিযোগিতামূলক বাজারকে ব্যবহার করার একটি প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো রেলওয়ের রয়েছে। প্রশ্ন উঠেছে—সেই কাঠামো বাদ দিয়ে নির্দিষ্ট নির্মাতা বা সরবরাহকারীর সঙ্গে সার্ভিস কন্ট্রাক্টে যাওয়ার যৌক্তিকতা কী এবং এতে সরকারের অতিরিক্ত আর্থিক দায় কতটা বাড়বে?
রেলওয়ের বর্তমান দরপত্র তালিকাতেও বিভিন্ন ধরনের লোকোমোটিভের যন্ত্রাংশ সরাসরি প্রতিযোগিতামূলক দরপত্রে কেনার উদাহরণ পাওয়া যায়। যেমন ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে ১০টি ডিজেল স্পেয়ার পার্টস কেনার জন্য একধাপ দুই খাম পদ্ধতিতে দরপত্র আহ্বান করা হয়েছিল।
অনুসন্ধানে সংশ্লিষ্টদের কাছ থেকে সবচেয়ে গুরুতর যে অভিযোগটি পাওয়া গেছে, তা হলো—২০২০ সালে সরবরাহ করা ৩০০০ সিরিজের লোকোমোটিভের প্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশের ড্রয়িং ও পার্ট নম্বর নিয়ে এখনো জটিলতা রয়েছে।
রেলের সংশ্লিষ্ট কয়েকজন কর্মকর্তা ও সরবরাহকারীর দাবি, লোকোমোটিভ সরবরাহের প্রায় ছয় বছর পরও প্রয়োজনীয় ড্রয়িং ও পার্ট নম্বরের পূর্ণাঙ্গ তথ্য না পাওয়ায় বিকল্প উৎস থেকে যন্ত্রাংশ সংগ্রহ কঠিন হয়ে পড়েছে। ফলে নির্মাতা-নির্ভরতা আরও বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
তবে এ অভিযোগের বিপরীতে নির্মাতা প্রতিষ্ঠানের বক্তব্য এবং রেলওয়ের কাছে ঠিক কোন কোন ড্রয়িং বা পার্ট নম্বর সরবরাহ করা হয়নি—তা স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
৩০০০ সিরিজের লোকোমোটিভ নিয়ে এর আগেও যন্ত্রাংশ ও রক্ষণাবেক্ষণসংক্রান্ত সংকটের খবর প্রকাশিত হয়েছে। গত বছর প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে ৩০০০ সিরিজের কয়েকটি লোকোমোটিভ অচল হয়ে পড়ার পেছনে স্পেয়ার পার্টসের সংকটের কথা উঠে আসে।
৬৬০০ সিরিজের ৪০টি ব্রডগেজ লোকোমোটিভের জন্য বাংলাদেশ রেলওয়ে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক Progress Rail Locomotive Inc.-এর সঙ্গে চুক্তি করেছিল। সরকারি চুক্তি-তথ্য অনুযায়ী, ৪০টি ব্রডগেজ ডিজেল-ইলেকট্রিক লোকোমোটিভসহ ক্যাপিটাল স্পেয়ার্স, মেইনটেন্যান্স ও কনজ্যুমেবল স্পেয়ার্স, বিশেষ সরঞ্জাম, ড্রয়িং, ইনস্ট্রাকশন বুক, পার্টস ক্যাটালগসহ বিভিন্ন সরঞ্জাম ও সেবা ছিল ওই চুক্তির অংশ। চুক্তিমূল্য ছিল ১৩ কোটি ৫৩ লাখ ৪০ হাজার ৩৪৪ দশমিক ৪১ মার্কিন ডলার। সরকারি নথিতে চুক্তিটি সর্বনিম্ন দরদাতার সঙ্গে সম্পাদিত হয়েছিল বলেও উল্লেখ রয়েছে।
Progress Rail নিজস্ব ওয়েবসাইটেও বাংলাদেশ রেলওয়ের জন্য ৪০টি EMD GT Series লোকোমোটিভ সরবরাহের চুক্তির কথা জানিয়েছে।
এখন প্রশ্ন হচ্ছে—প্রাথমিক সরবরাহ চুক্তির বাইরে ওয়ারেন্টি-পরবর্তী সময়ে একই নির্মাতা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি সার্ভিস কন্ট্রাক্ট করলে প্রতিযোগিতামূলক বাজারের সুবিধা থেকে রেল কতটা বঞ্চিত হবে?
রেলের তালিকাভুক্ত কয়েকজন সরবরাহকারীর দাবি, জরুরি প্রয়োজনের অনেক যন্ত্রাংশ বিদেশি প্রস্তুতকারকের অনুমোদিত উৎস বা আন্তর্জাতিক সরবরাহ চ্যানেলের মাধ্যমে সংগ্রহ করে দুই থেকে তিন মাসের মধ্যে সরবরাহ করা সম্ভব। কিন্তু প্রস্তাবিত সার্ভিস কন্ট্রাক্টে কিছু ক্ষেত্রে প্রায় ১৮ মাস পর্যন্ত সময় লাগার আশঙ্কা রয়েছে বলে তারা দাবি করছেন।
তাদের ভাষ্য, লোকোমোটিভ মেরামতের জন্য যদি কোনো যন্ত্রাংশের প্রয়োজন হয় এবং সেটি পেতে এক বছরের বেশি সময় লাগে, তাহলে মেরামতাধীন ইঞ্জিন দ্রুত আউটটার্ন দেওয়া সম্ভব হবে না। এতে একদিকে রেলের কর্মক্ষম লোকোমোটিভের সংখ্যা কমবে, অন্যদিকে বিকল্প ইঞ্জিনের ওপর চাপ বাড়বে।
রেলওয়ের মতো গণপরিবহন ব্যবস্থায় এ ধরনের বিলম্বের প্রভাব শুধু একটি ইঞ্জিনের মেরামতে সীমাবদ্ধ থাকে না। একটি লোকোমোটিভ দীর্ঘদিন কর্মক্ষমতার বাইরে থাকলে নির্ধারিত ট্রেন পরিচালনা, রেক ব্যবস্থাপনা এবং রিজার্ভ ইঞ্জিনের ওপরও চাপ তৈরি হয়।
সরবরাহকারীদের অভিযোগ, একদিকে নতুন সার্ভিস কন্ট্রাক্টের উদ্যোগ, অন্যদিকে ডিজেল স্পেয়ার্সের তালিকাভুক্তি-সংক্রান্ত দরপত্র দীর্ঘদিন ঝুলে আছে।
রেফারেন্স নম্বর 54.01.1543.455.07.037.24-এর দরপত্রটি ২০২৪ সালের আগস্টে প্রি-কোয়ালিফিকেশনের জন্য প্রকাশ করা হয়েছিল এবং এর ক্রয়পদ্ধতি ছিল ICT Open Tendering Method।
সংশ্লিষ্টদের দাবি, পরবর্তী সময়ে দরপত্রের কার্যক্রম একাধিকবার পিছিয়েছে এবং নির্ধারিত সময়েও নিষ্পত্তি হয়নি। এতে তালিকাভুক্ত সরবরাহকারীদের মাধ্যমে নিয়মিত স্পেয়ার্স সংগ্রহের প্রক্রিয়াও অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।
এখানেই দেখা দিয়েছে মূল প্রশ্ন—রেলের কাছে যখন প্রতিযোগিতামূলক সরবরাহ ব্যবস্থা চালুর প্রক্রিয়া চলমান, তখন একই সময়ে নির্দিষ্ট নির্মাতার সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি সার্ভিস কন্ট্রাক্টের প্রয়োজন কেন?
সরবরাহকারীদের অভিযোগ, প্রতিযোগিতা না থাকলে নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠান যন্ত্রাংশ ও সার্ভিস চার্জ নির্ধারণে তুলনামূলক বেশি ক্ষমতা পাবে। ফলে দর-কষাকষির সুযোগ কমবে রেলের।
তাদের মতে, একই যন্ত্রাংশ যদি একাধিক যোগ্য উৎস থেকে সংগ্রহের সুযোগ থাকে, তাহলে মূল্য, মান এবং সরবরাহ সময়—তিন ক্ষেত্রেই প্রতিযোগিতা তৈরি হয়। কিন্তু কোনো একটি প্রতিষ্ঠানের ওপর দীর্ঘমেয়াদি নির্ভরতা তৈরি হলে বিকল্প উৎস হারিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি ভবিষ্যতে দরপত্রে সরকারের দর-কষাকষির সক্ষমতাও দুর্বল হতে পারে।
এতে শুধু সরকারের ব্যয় বাড়ার ঝুঁকিই নয়, স্থানীয় এজেন্ট, তালিকাভুক্ত ব্যবসায়ী ও সরবরাহকারীদের ব্যবসার সুযোগও সংকুচিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
সার্ভিস কন্ট্রাক্ট নিয়ে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উঠেছে রেলের নিজস্ব প্রকৌশলীদের দক্ষতা নিয়ে।
সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলী ও সরবরাহকারীদের একটি অংশের মতে, প্রতিটি নতুন সিরিজের লোকোমোটিভের রক্ষণাবেক্ষণ ও মেরামতের প্রযুক্তিগত জ্ঞান রেলের নিজস্ব প্রকৌশলীদের মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়া জরুরি। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি মেইনটেন্যান্সের দায়িত্ব যদি নির্মাতা প্রতিষ্ঠানের হাতে চলে যায়, তাহলে রেলের নিজস্ব কারিগরি সক্ষমতা বিকাশ বাধাগ্রস্ত হতে পারে।
তাদের আশঙ্কা, একপর্যায়ে নির্দিষ্ট সিরিজের লোকোমোটিভের ছোট-বড় মেরামতের জন্যও বিদেশি নির্মাতার ওপর নির্ভরতা তৈরি হতে পারে। দীর্ঘমেয়াদে এটি রেলের জন্য আর্থিক ও প্রযুক্তিগত—দুই ধরনের ঝুঁকি তৈরি করবে।
অবশ্য রেলের সব যন্ত্রাংশ যে বিকল্প উৎস থেকে কেনা সম্ভব, এমনটিও নয়। বিশেষায়িত কিছু যন্ত্রাংশের ক্ষেত্রে প্রস্তুতকারকের অনুমোদিত উৎস বা নির্দিষ্ট প্রযুক্তিগত স্পেসিফিকেশন অনুসরণ করা প্রয়োজন হতে পারে। ফলে শুধু ‘উন্মুক্ত দরপত্র’ বনাম ‘সার্ভিস কন্ট্রাক্ট’—এই দ্বৈততার বাইরে প্রতিটি যন্ত্রাংশের প্রযুক্তিগত প্রয়োজনীয়তা আলাদাভাবে যাচাই করাও জরুরি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, কোনো যন্ত্রাংশের ক্ষেত্রে একক উৎস অপরিহার্য হলে তার সপক্ষে প্রযুক্তিগত যুক্তি, বাজার যাচাই, মূল্য বিশ্লেষণ এবং বিকল্প উৎস না থাকার প্রমাণ থাকা উচিত। অন্যদিকে যেসব যন্ত্রাংশ একাধিক যোগ্য উৎস থেকে সংগ্রহ করা সম্ভব, সেগুলো প্রতিযোগিতামূলক পদ্ধতিতে কেনাই সরকারি অর্থের সাশ্রয়ী ব্যবহারের সঙ্গে বেশি সামঞ্জস্যপূর্ণ।
সংশ্লিষ্ট কয়েকজন সরবরাহকারী দাবি করেছেন, ৩০০০ ও ৬৬০০ সিরিজের লোকোমোটিভের প্রায় ৭০ শতাংশ বর্তমানে অচল। তবে বাংলাদেশ রেলওয়ের প্রকাশিত কোনো সাম্প্রতিক সরকারি নথিতে এ সংখ্যার স্বাধীন নিশ্চিতকরণ এই অনুসন্ধানে পাওয়া যায়নি।
তাই দাবিটি সত্য হলে তা রেলের জন্য অত্যন্ত গুরুতর পরিস্থিতি—এবং মন্ত্রণালয় ও রেলওয়ের উচিত সিরিজভিত্তিক কর্মক্ষম ও অচল লোকোমোটিভের সর্বশেষ সংখ্যা প্রকাশ করা।
কারণ ৩০০০ ও ৬৬০০ সিরিজের ইঞ্জিনের সংখ্যা খুব বেশি নয়, কিন্তু এগুলো অপেক্ষাকৃত আধুনিক ও উচ্চক্ষমতার লোকোমোটিভ। Progress Rail-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০১৯ সালে বাংলাদেশ রেলওয়ে ৪০টি GT Series লোকোমোটিভের চুক্তি করেছিল।
রেলওয়ের কয়েকজন কর্মকর্তা ও সরবরাহকারী নাম প্রকাশ না করার শর্তে দাবি করেছেন, সার্ভিস কন্ট্রাক্টের সিদ্ধান্তের পেছনে রেলভবন ও মন্ত্রণালয়ের উচ্চপর্যায়ের সিদ্ধান্ত রয়েছে। তবে তারা কোনো নির্দিষ্ট কর্মকর্তা বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে দুর্নীতির প্রমাণ উপস্থাপন করেননি।
অন্যদিকে অভিযোগকারীদের একটি অংশের দাবি, প্রতিযোগিতামূলক দরপত্রের পরিবর্তে নির্দিষ্ট নির্মাতা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি হলে একটি সীমিত গোষ্ঠী সুবিধা পেতে পারে।
তবে অভিযোগটি সত্য কি না, সেটি নির্ধারণের জন্য প্রয়োজন চুক্তির পূর্ণাঙ্গ শর্ত, সম্ভাব্য ব্যয়, বাজারদর যাচাই, প্রযুক্তিগত মূল্যায়ন এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের নথি প্রকাশ করা।
পুরো বিষয়টি পর্যালোচনা করলে রেলওয়ের সামনে অন্তত তিনটি মৌলিক প্রশ্ন দাঁড়ায়—
প্রথমত, যেসব যন্ত্রাংশ একাধিক আন্তর্জাতিক প্রস্তুতকারক বা অনুমোদিত উৎস থেকে সংগ্রহ করা সম্ভব, সেগুলো কেন প্রতিযোগিতামূলক দরপত্রের বাইরে যাবে?
দ্বিতীয়ত, সার্ভিস কন্ট্রাক্টে নির্ধারিত সার্ভিস চার্জ ও স্পেয়ার পার্টসের মূল্য কীভাবে বাজারদরের সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে?
তৃতীয়ত, ৩০০০ ও ৬৬০০ সিরিজের লোকোমোটিভের ড্রয়িং, পার্ট নম্বর, মেইনটেন্যান্স ম্যানুয়াল ও প্রযুক্তিগত তথ্য রেলের নিজস্ব প্রকৌশলীদের কাছে কতটা সম্পূর্ণভাবে হস্তান্তর করা হয়েছে?
এসব প্রশ্নের উত্তর ছাড়া শুধু ‘নির্মাতার কাছ থেকে সেবা নিলে মান নিশ্চিত হবে’—এমন যুক্তি দিয়ে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি করা হলে ভবিষ্যতে রেলের প্রযুক্তিগত নির্ভরতা ও পরিচালন ব্যয়—দুইই বাড়তে পারে।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ রেলওয়ের মহাপরিচালক আফজাল হোসেনের বক্তব্য জানতে মোবাইল ফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও কথা বলা সম্ভব হয়নি।
তবে বিষয়টির গুরুত্ব বিবেচনায় রেলওয়ের পক্ষ থেকে স্পষ্ট করা প্রয়োজন—সার্ভিস কন্ট্রাক্টের সিদ্ধান্তের ভিত্তি কী, সম্ভাব্য ব্যয় কত, কত বছরের জন্য চুক্তি হবে, যন্ত্রাংশ সরবরাহে সর্বোচ্চ সময়সীমা কত এবং কেন প্রচলিত তালিকাভুক্ত সরবরাহকারী ব্যবস্থার পরিবর্তে নির্মাতা প্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভরতা প্রয়োজন হচ্ছে।
কারণ সরকারি ক্রয়ের ক্ষেত্রে শুধু দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া নয়, প্রতিযোগিতা, মূল্যসাশ্রয়, স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থ—সবগুলো বিষয় সমানভাবে বিবেচনা করা জরুরি।
রেলওয়ের নিজস্ব ওয়েবসাইটে প্রকাশিত সাম্প্রতিক দরপত্রগুলোতেও দেখা যায়, বিভিন্ন পণ্য ও সেবায় প্রতিযোগিতামূলক ক্রয়পদ্ধতি এখনো চালু রয়েছে।
তাই ৩০০০ ও ৬৬০০ সিরিজের লোকোমোটিভের ক্ষেত্রে ব্যতিক্রমী কোনো পদ্ধতি নেওয়া হলে তার প্রযুক্তিগত ও আর্থিক যৌক্তিকতা জনসমক্ষে আনা এখন সময়ের দাবি।
সচল ইঞ্জিনই যদি রেলের প্রাণ হয়, তবে যন্ত্রাংশ কেনার পদ্ধতিও হতে হবে স্বচ্ছ, প্রতিযোগিতামূল
ক ও সময়োপযোগী। নইলে আধুনিক লোকোমোটিভ কিনেও সেগুলো অচল পড়ে থাকার দায় শেষ পর্যন্ত বহন করতে হবে রাষ্ট্রকেই।

























